স্বজনের অভিযোগ—মৃত শিশুকে দেখে চিকিৎসক পাওয়া যায়নি; চিকিৎসার নথি, PICU ব্যবস্থাপনা ও বিল নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
হেলথ ডেস্ক | TODAY TV BD
ঢাকা | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীর পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নয় মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু ঘিরে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শিশুটির স্বজন আসিফ হাসান ১৩ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ফেসবুক লাইভে এসে দাবি করেন, শিশুটি পিআইসিইউতে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকলেও সেখানে ডাকাডাকি করে কোনো চিকিৎসককে পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে তিনি জানান, শিশুটির চিকিৎসার জন্য দুই লাখ টাকার বেশি বিল করা হয়েছে।
আসিফের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ভাগ্নির ছেলেকে গত ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বীর উত্তম সি আর দত্ত রোডের পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শুরুতে চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, শিশুটির রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গেছে। এরপর কয়েক দিন চিকিৎসা চলার পর ১৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে পরিবারকে বলা হয়, শিশুটির লাইফ সাপোর্ট প্রয়োজন।
এরপরই পরিস্থিতি নিয়ে পরিবারের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়।
লাইফ সাপোর্টের কথা, তারপর মৃত শিশুকে দেখতে পাওয়ার দাবি
আসিফের অভিযোগ, শিশুটিকে দেখতে চাইলে প্রথমে তাদের পিআইসিইউতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে কোনোভাবে ভেতরে গিয়ে তিনি শিশুটিকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান বলে দাবি করেন।
তাঁর আরও অভিযোগ, সেখানে উপস্থিত চিকিৎসকের খোঁজ করতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। এরপর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে পুরো ঘটনা তুলে ধরেন।
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—লাইভের ভিডিও বা স্বজনের বক্তব্য একা শিশুটির মৃত্যুর কারণ কিংবা চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছিল কি না, তা প্রমাণ করে না। সেজন্য প্রয়োজন হাসপাতালের চিকিৎসা নথি ও স্বাধীন তদন্ত।
শিশুটি কেন হাসপাতালে ছিল?
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভর্তি করার সময় শিশুটির রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার কী রোগ নির্ণয় করা হয়েছিল, কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল, এবং কোন পর্যায়ে অবস্থার অবনতি ঘটে—এসব তথ্য এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি।
বিশেষ করে জানা প্রয়োজন, শিশুটির চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. আতিকুর রহমান কী diagnosis করেছিলেন এবং চিকিৎসার পুরো সময়ে কী ধরনের পর্যবেক্ষণ চলেছে।
দুই লাখ টাকার বেশি বিল—কিসের জন্য?
শিশুটির চিকিৎসায় দুই লাখ টাকার বেশি বিল হয়েছে বলে স্বজনের অভিযোগ। কিন্তু এই অর্থের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
শিশুটি ১ সেপ্টেম্বর থেকে হাসপাতালে থাকলে পিআইসিইউ বেড, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসকের ফি, অক্সিজেন বা ভেন্টিলেশনের মতো সেবায় উল্লেখযোগ্য ব্যয় হতে পারে। তাই শুধু মোট অঙ্ক দেখে বিলটি অন্যায্য বলা যায় না।
তবে স্বচ্ছতার জন্য পরিবারের হাতে itemised bill বা প্রতিটি সেবার আলাদা খরচের হিসাব থাকা উচিত। এতে কোন সেবায় কত টাকা নেওয়া হয়েছে, তা যাচাই করা সম্ভব হবে।
PICU-তে চিকিৎসক থাকার প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা করা হয়। সেখানে রোগীর vital signs নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং অবস্থার পরিবর্তনে দ্রুত চিকিৎসা-সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তাই আসিফের অভিযোগ সত্য হলে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠবে—সেই সময় পিআইসিইউতে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স কারা ছিলেন এবং শিশুটিকে শেষবার কখন চিকিৎসক পরীক্ষা করেছিলেন?
হাসপাতালের duty roster, nursing chart, observation sheet এবং চিকিৎসকের নোট পর্যালোচনা করলেই এর উত্তর পাওয়া সম্ভব।
মৃত্যুর কারণ জানতে যে নথিগুলো জরুরি
শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে—
ভর্তির সময়ের চিকিৎসা-নথি, রক্তের শর্করাসহ পরীক্ষার ফল, ওষুধের তালিকা, vital-sign chart, পিআইসিইউ নথি, অ্যানেস্থেশিয়া বা ভেন্টিলেশন-সংক্রান্ত তথ্য, চিকিৎসকের progress note এবং মৃত্যুসনদ।
প্রয়োজনে ময়নাতদন্ত বা ফরেনসিক মূল্যায়নও করা যেতে পারে।
এসব তথ্য ছাড়া এটি চিকিৎসা অবহেলা, রোগের জটিলতা নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
শুধু অভিযোগ নয়, হাসপাতালের বক্তব্যও প্রকাশ্যে আসা দরকার
এই ঘটনায় স্বজনের অভিযোগ জনসমক্ষে এসেছে। এখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
হাসপাতালের উচিত জানানো—
শিশুটির চিকিৎসাগত diagnosis কী ছিল,
কখন তার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়,
কখন লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়,
শেষবার কখন চিকিৎসক শিশুটিকে পরীক্ষা করেন,
মৃত্যুর সময় কী চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল,
এবং বিলের কোন খাতে কত টাকা নেওয়া হয়েছে।
এগুলো প্রকাশ হলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই সহজ হবে।
ঘটনাটি বড় একটি রোগী-নিরাপত্তার প্রশ্নও তুলেছে
এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ যাই হোক, ঘটনাটি বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় patient monitoring, চিকিৎসা নথি, PICU staffing এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কতটা স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক—সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবারকে রোগের অবস্থা, চিকিৎসার পরিকল্পনা, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং অবস্থার পরিবর্তন সম্পর্কে যথাসম্ভব পরিষ্কার তথ্য দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এখন কী হওয়া উচিত
ঘটনাটি নিয়ে দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। তদন্তে হাসপাতালের চিকিৎসা নথি, দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক-নার্সের তালিকা, পিআইসিইউর পর্যবেক্ষণ রেকর্ড এবং বিলের কাগজপত্র পর্যালোচনা করা উচিত।
অভিযোগ সত্য হলে দায় নির্ধারণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে হাসপাতালকেও পরিষ্কার তথ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ দিতে হবে।
একটি শিশুর মৃত্যু নিয়ে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় হলো সত্য উদ্ঘাটন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার নয়।
শেষ কথা
নয় মাসের একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; এটি হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা নিরাপত্তার ওপর মানুষের আস্থার সঙ্গেও জড়িত।
পদ্মা জেনারেল হাসপাতালের এই ঘটনায় এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। শিশুটির মৃত্যুর কারণ কী ছিল, পিআইসিইউতে তখন কারা দায়িত্বে ছিলেন, লাইফ সাপোর্টের সিদ্ধান্ত কখন নেওয়া হয়েছিল এবং দুই লাখ টাকার বেশি বিল কীভাবে তৈরি হলো—এসবের উত্তর পাওয়া যাবে নথি ও তদন্তে।
তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত।
তথ্যসূত্র: কালবেলা; বাংলাদেশ সরকারের DGHS Facility Registry; প্রকাশ্যে পাওয়া সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন ও স্বজনের বক্তব্য।
সম্পাদকীয় নোট: এই প্রতিবেদনে শিশুটির মৃত্যুর জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী ঘোষণা করা হয়নি। প্রকাশ্যে থাকা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে; মৃত্যুর কারণ ও চিকিৎসাগত দায় নির্ধারণ তদন্তসাপেক্ষ।




