Homeনাগরিক দর্পণ১৪ বছর কারাগারে, শেষ পর্যন্ত প্রশ্নই রয়ে গেল: সাগর–রুনি মামলার ‘দারোয়ান’ হুমায়ুনের...

১৪ বছর কারাগারে, শেষ পর্যন্ত প্রশ্নই রয়ে গেল: সাগর–রুনি মামলার ‘দারোয়ান’ হুমায়ুনের দায় কে নেবে?

যাঁকে গ্রেপ্তারের পর দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ ও রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তে কী পাওয়া গেছে—আজও তার পরিষ্কার উত্তর নেই; নতুন টাস্কফোর্সও তাঁকে মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মতো প্রমাণ পায়নি বলে আদালতে জানিয়েছে

টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান

একটি আলোচিত হত্যামামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হলো। বছরের পর বছর তিনি কারাগারে থাকলেন। তদন্তকারী সংস্থা বদলাল, রিমান্ড হলো, জিজ্ঞাসাবাদ হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মিলল না। তাহলে প্রশ্ন থাকে—এত বছর একজন মানুষ কারাগারে থাকলেন কেন, আর সেই বন্দিজীবনের দায় নেবে কে?

সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবিরের ঘটনাটি এখন সেই প্রশ্নই সামনে আনছে।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম রাজাবাজারের যে ভাড়া বাসায় সাগর-রুনি খুন হন, সেই বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে হুমায়ুনকে পরবর্তীতে মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। মামলায় মোট আটজনকে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে সাতজন কারাগারে ছিলেন এবং দুজন জামিনে ছিলেন—তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আসামিদের বর্তমান অবস্থার কিছুটা তারতম্য দেখা যায়।

হুমায়ুনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে নতুন তদন্তপর্বে। উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স তাঁকে কারাগারে গিয়ে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আদালতের নথি ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

প্রথম দিন থেকেই সন্দেহের তালিকায়

সাগর-রুনি হত্যার পর বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীদের সন্দেহের তালিকায় আনা হয়েছিল। হুমায়ুন কবির এবং আরেক নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পালকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই মামলায় আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘদিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু বহু বছর পেরিয়েও তাঁদের কারও কাছ থেকে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পাওয়া যায়নি বলে প্রকাশ্য নথিতে এসেছে।

হুমায়ুনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি ছিল মূলত তিনি ঘটনাস্থলের নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন এবং বাড়ির চলাচল সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা থাকার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু কোনো ভবনের নিরাপত্তাকর্মী হওয়া নিজেই হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ নয়।

এখানেই মামলাটির দীর্ঘসূত্রতার একটি বড় সমস্যা দেখা যায়—সন্দেহ থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করা সহজ, কিন্তু সেই সন্দেহকে প্রমাণে রূপ দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

বারবার রিমান্ড, তবু মিলল না হত্যার সূত্র

পুরোনো তদন্তপর্বে হুমায়ুনকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ ও রিমান্ডে নেওয়া হয়। ২০১৯ সালেও প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর কারাগারে থাকার কথা পাওয়া যায়। ২০২৪ সালেও তিনি মামলার আসামি হিসেবে কারাগারে ছিলেন।

অর্থাৎ তিনি কোনো স্বল্পমেয়াদি সন্দেহভাজন ছিলেন না। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত বছরের পর বছর চলেছে।

তারপরও ২০২৬ সালে নতুন টাস্কফোর্সের সদস্যদের আবার তাঁকে কারাগারে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয়েছে। প্রথম আলো জানিয়েছে, আদালতের অনুমতি নিয়ে টাস্কফোর্স হুমায়ুন কবিরকে কাশিমপুর কারাগার-২-এর ফটকে প্রায় দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে।

এই ঘটনাটি নিজেই একটি প্রশ্ন তৈরি করে—

১২ বছরের বেশি তদন্তে একজন গুরুত্বপূর্ণ আসামির কাছ থেকে কী জানা গেল, আর নতুন টাস্কফোর্সকে আবার সেই একই ব্যক্তির কাছে কেন ফিরতে হলো?

নতুন টাস্কফোর্স কী পেল?

২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালত র‍্যাবকে তদন্ত থেকে সরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেয়। হোম মন্ত্রণালয় ওই বছরের অক্টোবরে চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে।

২০২৬ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রপক্ষ উচ্চ আদালতে জানায়, টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে তিনবার অগ্রগতি প্রতিবেদন দিয়েছে, কিন্তু তদন্তে এখনো হত্যার মূল উদ্দেশ্য বা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়নি। একই সময়ে অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, টাস্কফোর্স পুরোনো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও নথিতে পুরোপুরি প্রবেশাধিকারও পাচ্ছে না।

এই অগ্রগতি প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে হুমায়ুনের নামও আসে। আদালত-সংশ্লিষ্ট প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

এটি যদি তদন্তের শেষ অবস্থান হয়, তাহলে প্রশ্ন আরও কঠিন—

একজনকে এত বছর ধরে আসামি করে রাখার ভিত্তি ঠিক কী ছিল?

১৪ বছর কারাগার—আর তারপর?

এখানে একটি আইনি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। কোনো আসামি দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলেই তিনি নির্দোষ—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। আবার দীর্ঘ কারাবাসকে তাঁর অপরাধের প্রমাণও বলা যায় না। আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনগতভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তি।

কিন্তু হুমায়ুনের ক্ষেত্রে যদি নতুন তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর প্রমাণ না পাওয়া যায়, তাহলে তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতা এত দীর্ঘ সময় সীমাবদ্ধ থাকার বিষয়টি অবশ্যই আলাদা করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

কারাগারে থাকা মানে শুধু কয়েকটি বছর হারানো নয়। একজন নিম্নআয়ের নিরাপত্তাকর্মীর ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে চাকরি হারানো, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, আয় বন্ধ হওয়া এবং সামাজিকভাবে “খুনি” হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাওয়া।

আর যদি শেষ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ টেকসই না হয়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু তাঁর নয়।

তাঁর পরিবারও সেই শাস্তি বহন করেছে, যদিও আদালত তাকে কোনো অপরাধে দণ্ডিত করেনি।

নতুন টাস্কফোর্স তাঁকে ‘দোষী’ প্রমাণ করতে পারেনি—কিন্তু মুক্তিও হয়নি

২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথম আলো প্রতিবেদনে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য থেকে জানা যায়, তৎকালীন সময়ে মামলায় আটজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে হুমায়ুনও ছিলেন এবং টাস্কফোর্স তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, টাস্কফোর্স এখনো হত্যার মোটিভ বা গুরুত্বপূর্ণ ক্লু খুঁজে পায়নি।

কিন্তু প্রকাশ্য তথ্য থেকে একই সঙ্গে এটিও দেখা যায়, হুমায়ুন এখনো মামলার অভিযুক্ত তালিকার অংশ।

এখানেই একটি মানবিক এবং আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।

যদি তদন্ত তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করার মতো তথ্য পেয়ে থাকে, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি অবস্থান কী?

আর যদি তাঁকে এখনো অভিযুক্ত রাখা হয়, তাহলে—

কোন প্রমাণের ভিত্তিতে?

জনগণের জানা দরকার।

একজন নিরাপত্তাকর্মী কি তদন্তের সহজ লক্ষ্য হয়ে গিয়েছিলেন?

হুমায়ুনের মতো একজন নিরাপত্তাকর্মীকে সন্দেহের তালিকায় আনা তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে অস্বাভাবিক নয়। কারণ তিনি ঘটনাস্থলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সেই সন্দেহকে প্রমাণে রূপান্তর করতে হলে তাঁর চলাচল, দায়িত্ব পালনের সময়, ফোন যোগাযোগ, সাক্ষ্য, শারীরিক আলামত এবং অন্য প্রমাণের সঙ্গে মিল থাকতে হয়।

মামলার ১৪ বছরের ইতিহাসে এমন কোনো প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সামনে আসেনি, যা হুমায়ুনকে হত্যার সরাসরি অভিযুক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

বরং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদে দেখা গেছে, তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হলেও হত্যার রহস্যের নিষ্পত্তি হয়নি।

এ অবস্থায় একজন মানুষের কারাগারে থেকে যাওয়ার প্রশ্নটি নতুন করে উঠতেই পারে।

সাগর-রুনি মামলার আরও বড় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি

হুমায়ুনের ঘটনা আলাদা করে দেখলে এটি একজন আসামির দুর্ভাগ্যের গল্প। কিন্তু পুরো মামলার পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে বিষয়টি আরও গভীর।

২০১২ সালে হত্যাকাণ্ড।

প্রথমে থানা পুলিশ।

তারপর ডিবি।

এরপর র‍্যাব।

২০২৪ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে নতুন টাস্কফোর্স।

২০২৬ সালে পিবিআই-সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রক্রিয়া।

আর এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি। আগস্টে প্রতিবেদন না দেওয়ায় ২৭ আগস্ট আদালত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়িয়েছে।

এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া মানুষগুলোর জীবনও বদলে গেছে।

কারও জামিন হয়েছে।

কেউ কারাগারে আছেন।

কেউ পলাতক।

আর হুমায়ুনের মতো কেউ বছরের পর বছর কারাগারে থেকেও এখনো জানেন না—তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ পরিণতি কী।

ন্যায়বিচার শুধু খুনিকে শাস্তি দেওয়া নয়

সাগর ও রুনির হত্যার বিচার অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে যারা নির্দোষ, তাদের অন্যায়ভাবে বছরের পর বছর আটক রাখাও ন্যায়বিচারের অংশ নয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব দুটি ক্ষেত্রেই সমান।

অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা এবং নির্দোষ ব্যক্তিকে আইনের নামে শাস্তি না দেওয়া।

এই মামলায় যদি হুমায়ুনের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকে, তাহলে দ্রুত সেই প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপন করে বিচার এগিয়ে নেওয়া উচিত। আর যদি প্রমাণ না থাকে, তাহলে তাঁর মুক্তি ও তাঁর পরিবারের ক্ষতির বিষয়টি আইনগতভাবে কীভাবে বিবেচিত হবে, সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

কারণ একজন মানুষকে ১৪ বছর কারাগারে রেখে পরে শুধু “তিনি জড়িত নন” বললে সব প্রশ্নের উত্তর হয় না।

রাষ্ট্র কি তাঁর হারানো বছরগুলো ফিরিয়ে দিতে পারবে?

ফিরিয়ে দিতে পারবে না।

হারানো যৌবন ফিরবে না।

পরিবারের হারানো আয় ফিরবে না।

সামাজিক অপমানও এক ঘোষণায় মুছে যাবে না।

তবু রাষ্ট্র চাইলে অন্তত একটি কাজ করতে পারে—হুমায়ুনের বিরুদ্ধে কী ছিল, কী পাওয়া গেছে এবং এখন তাঁর বিরুদ্ধে কী আছে—তার পূর্ণ স্বচ্ছ হিসাব জনগণের সামনে আনতে পারে।

যদি তিনি নির্দোষ হন, তাহলে এই দীর্ঘ বন্দিজীবনের দায় কার, সেই প্রশ্নও উঠবে।

সাগর-রুনি হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের লড়াইয়ে যেন আরেকটি অন্যায় না ঘটে—একজন নির্দোষ মানুষকে রহস্যের বলি বানিয়ে।

টুডে টিভি বিডির অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণ: হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে ২০১২ সাল থেকে দীর্ঘ তদন্ত ও কারাবাসের ইতিহাস রয়েছে। ২০২৬ সালে নতুন টাস্কফোর্স তাঁকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। প্রকাশ্য সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত এখনো হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত মোটিভ বা নির্ভরযোগ্য ক্লু প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তাই হুমায়ুনকে হত্যাকারী বলা যেমন অনুচিত, তেমনি তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি নির্দোষ ঘোষণা করার ক্ষমতাও সংবাদমাধ্যমের নেই। এই সিদ্ধান্ত আদালত ও তদন্ত নথির ভিত্তিতেই হতে হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), এনটিভি ও প্রকাশ্য আদালত-সংশ্লিষ্ট নথি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments