লেখক: মোঃ ইউসুফ মিয়া রনি, সমাজকর্মী, শিবরামপুর, বুড়িচং, কুমিল্লা
নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। কিন্তু বর্তমান সমাজে ‘খাদ্য’ শব্দটির সাথে ‘ভেজাল’ শব্দটি এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে যে, এটি এখন আর কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং মানবসভ্যতার জন্য এক নীরব ও নির্মম মরণাস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাবার যেখানে মানুষের জীবন ধারণ ও সুস্থতার মূল অবলম্বন হওয়ার কথা, সেখানে আজ প্রতিনিয়ত বিষাক্ত কেমিক্যালের মিশ্রণে তৈরি খাবার খেয়ে মানুষ মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে। তরল দুধে দুধের উপাদান না থেকে মিলছে জেল আর কেমিক্যাল, ফলের জুসে আমের নামগন্ধ না থাকলেও মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে কৃত্রিম সুবাস ও মারাত্মক রঙ। আমরা আসলে খাবার খাচ্ছি না, আক্ষরিক অর্থেই বিষ খাচ্ছি। গত তিন দশকের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক গবেষণায় খাদ্যে ভেজালের কারণে মৃত্যুর যে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে শিউরে তোলার জন্য যথেষ্ট। এই তীব্র সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়বদ্ধতা কতটুকু এবং এই মহামারি থেকে মুক্তির উপায় কী, তা আজ গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।

ভেজাল খাবার খাওয়ার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বিষাক্ত কেমিক্যালযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে সমাজে এক দীর্ঘস্থায়ী মৃত্যুর মিছিল তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর; ভেজাল দুধ ও শিশুখাদ্যের কারণে শিশু মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সাথে গর্ভবতী মায়েরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন, যার ফলে বাড়ছে প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যুর হার। আমাদের পরিবারের প্রবীণ ও বৃদ্ধ মানুষরা দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে সহজেই এই বিষাক্ততার শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, সমাজের মূল চালিকাশক্তি বা কর্মক্ষম তরুণ ও মধ্যবয়সী মানুষরা দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ, বিশেষ করে ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অকালে ঝরে যাচ্ছেন। স্কুল-কলেজের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের অকাল প্রয়াণ জাতির মেধা শূন্যতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একই সাথে শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এই মৃত্যুর মিছিল সমাজকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এর ফলে দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে ডাক্তারদের হিমশিম খেতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। চিকিৎসা খাতে বিশাল ব্যয়ের কারণে জনগণের পকেট ফাঁকা হওয়ার পাশাপাশি সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ স্বাস্থ্যখাতে অপচয় হচ্ছে, যা প্রত্যক্ষভাবে দেশের জিডিপি (GDP) হ্রাসে ভূমিকা রাখছে।
মনোবিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল ভিত্তি। কিন্তু ভেজাল খাবার আজ মানুষের সব সুখ-শান্তি বিনষ্টের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শরীর ও মন একে অপরের পরিপূরক। মন ভালো থাকলে মানুষের কর্মক্ষমতা ও গবেষণার মান উন্নত হয়। মাদক গ্রহণ করলে মানুষ যেমন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং অপরাধে জড়ায়, ঠিক তেমনিভাবে ভেজাল খাবার মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে তোলে। বিষাক্ত উপাদান রক্তে মিশে যাওয়ার ফলে মানুষের শরীরে অস্থিরতা, অনিয়ন্ত্রিত কম্পন এবং উচ্চ রক্তচাপের সৃষ্টি হয়, যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অকেজো করে দেয়। প্রশ্ন জাগতে পারে, অসুস্থ হলে আমরা যে ওষুধ খাই, তা রোগব্যাধি নিরাময় করে না কেন? উত্তরটি অত্যন্ত পরিষ্কার—অর্গানাল বা খাঁটি খাবারের অভাব এবং ক্রমাগত বিষাক্ত খাবার গ্রহণের কারণে শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো এতটাই অকেজো হয়ে পড়ে যে, কোনো ওষুধ আর সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শরীর বিষাক্ত হলে মানুষের মস্তিষ্ক সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এই শারীরিক অসুস্থতা মানুষের চিন্তা-চেতনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যার ফলে মানুষের নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটে। এই মানসিক বিকৃতির কারণে মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে এবং খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, উগ্রতা ও দুর্নীতির মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, যারা খাদ্যে বিষাক্ত ভেজাল মেশাচ্ছে, সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নৈতিকভাবে এতটাই দেউলিয়া যে তারা সমাজের অন্যান্য ঘৃণ্য অপরাধের সাথেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলবে কীভাবে? হিসাবের সমীকরণ খুবই সোজা—অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তির কঠোর প্রয়োগ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাঈদ আহসান খালিদের মতে, আমাদের প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। যেমন, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ২৭২ ধারা অনুযায়ী বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে দূষিত খাবার ও পানীয় বিক্রি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আবার বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪–এর ধারা ২৫(গ) অনুসারে খাদ্যে ভেজাল দেওয়াকে মৃত্যুদণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এ একে ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্যক্রম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বর্তমান আইনের কার্যকারিতা ও প্রয়োগ নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে দেশে শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও প্রশাসনিক জরিমানার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে ধারণা জন্মেছে যে, জরিমানাই বুঝি এই অপরাধের একমাত্র শাস্তি। মূল আইন ও নিয়মিত বিচারিক আদালতকে পাশ কাটিয়ে কেবল সাময়িক জরিমানার মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের থামানো অসম্ভব। কারণ তারা প্রতারণা করে অর্জিত কালো টাকার সামান্য অংশ জরিমানা দিয়ে সহজেই পার পেয়ে যায়। নিয়মিত ও স্থায়ী আদালতে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর না করায় নিরাপদ খাদ্যের বাস্তবায়ন দুরূহ হয়ে পড়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এই উদাসীনতার দায় এড়াতে পারে না; কারণ আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়াও আইনের লঙ্ঘনের শামিল।
খাদ্যে ভেজাল রোধ করতে হলে অবিলম্বে রাষ্ট্র ও সংসদকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দল নির্বিশেষে জাতীয় স্বার্থে একসাথে আলোচনা করে যুগোপযোগী সংশোধিত আইন পাস করতে হবে। খাদ্যে ভেজালের অপরাধ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হওয়ামাত্রই যেন ‘মৃত্যুদণ্ডের বিধান’ কার্যকর করা হয়, সেই কঠোর আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। শুধু আইন করলেই হবে না, প্রতিটি প্যাকেটজাত খাবারের গায়ে “ভেজাল দিলে মৃত্যুদণ্ড” এই সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলকভাবে প্রচার করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাপক জনমত গঠন করতে হবে। সংবাদপত্র, প্রিন্ট মিডিয়া, বিটিভি এবং সকল বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে নিয়মিত সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করতে হবে। কবি আব্দুল হাকিমের “বঙ্গবাণী” কবিতার সুর ধরে বলা যায়—স্বদেশের উপকারে, দেশের মানুষের কল্যাণে যার মন কাঁদে না, তাকে মানুষ বলা চলে না; সে পশুর সমতুল্য। যারা খাবারে বিষ মিশিয়ে দেশের মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তারা সমাজের নিকৃষ্টতম শত্রু। দিনশেষে প্রশ্ন একটাই—খাবার যদি বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়, তবে আমরা কী খেয়ে বাঁচব? রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজ যদি আজ তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে এই বিষাক্ততার গ্রাস থেকে কেউ রেহাই পাবে না। আমরা অত্যন্ত আকুলতার সাথে এই ভেজাল ও বিষাক্ত খাবার থেকে মুক্তির এবং একটি সুস্থ-সুন্দর নিরাপদ আগামী প্রজন্মের প্রত্যাশায় পথ চেয়ে রইলাম।




Becarefull Adulterated food our country every where. Our conscious to save the people save the country and save the world children’s.
আপনার মূল্যবান মতামতের জন্য ধন্যবাদ। ভোক্তার সচেতনতাই আমাদের আসল শক্তি। ভেজাল আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে, এর বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে এক হয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে।