অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীনের অব্যাহতি নিয়ে প্রশ্ন; অনিয়মের ফাইলে স্বাক্ষর না করার অভিযোগকে ঘিরে নতুন আলোচনা
ঢাকা | ১৩ জুন ২০২৬
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীনকে মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় আড়াই বছর আগেই পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনায় উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলামকে নতুন প্রো-ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ড. নাজনীন ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর চার বছরের মেয়াদে প্রো-ভিসি পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তবে ২০২৬ সালের ১১ জুন জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তার দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটে। পরবর্তীতে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে নিজ কর্মস্থলে ফিরে যেতে বলা হয়েছে।
অব্যাহতির পেছনে কী কারণ?
সরকারি প্রজ্ঞাপনে অব্যাহতির নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। ফলে সিদ্ধান্তটির পেছনের কারণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও জল্পনা তৈরি হয়েছে।
একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ক্রয়সংক্রান্ত ফাইল নিয়ে ড. নাজনীনের সঙ্গে প্রশাসনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি ফাইলে অনিয়মের আশঙ্কা থাকায় তিনি স্বাক্ষর করতে অনীহা প্রকাশ করেন এবং কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের পরামর্শ দেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রশাসনিক মতবিরোধের ইঙ্গিত
বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় এক বছর ধরে বাউবির শীর্ষ প্রশাসনে মতবিরোধ ও সমন্বয়হীনতার বিষয়টি আলোচনায় ছিল।
তবে এই মতবিরোধ সরাসরি অব্যাহতির কারণ কি না, সে বিষয়ে কোনো সরকারি বা আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই প্রশাসনিক, নীতিগত এবং সাংগঠনিক বিভিন্ন বিবেচনার সমন্বয়ে নেওয়া হয়। ফলে একটি সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
কী বলছেন অধ্যাপক নাজনীন?
অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই সিদ্ধান্তে তিনি বিস্মিত হয়েছেন।
তার ভাষ্য, কেন তাকে সরানো হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেই ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। তিনি দাবি করেন, দায়িত্ব পালনকালে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, বিভিন্ন বিষয়ে তার অবস্থানের কারণে কোনো মহল অসন্তুষ্ট হয়ে থাকতে পারে।
উচ্চশিক্ষা প্রশাসনের জন্য কী বার্তা?
এই ঘটনাটি উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকলে জল্পনা-কল্পনার সুযোগ কমে এবং প্রতিষ্ঠানিক আস্থা আরও শক্তিশালী হয়।
সামনে যেসব প্রশ্ন
ড. নাজনীনের অব্যাহতির পর কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—
- তার দায়িত্বকাল হঠাৎ সংক্ষিপ্ত করার প্রয়োজন কেন দেখা দিল?
- প্রশাসনিক বা নীতিগত কোনো মূল্যায়ন কি এ সিদ্ধান্তের ভিত্তি ছিল?
- গণমাধ্যমে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়েছে কি?
- নতুন প্রশাসনের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হলে সিদ্ধান্তটির প্রকৃত প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
উল্লেখ্য, অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদের কন্যা।
ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, গবেষক ও লেখক হিসেবে তিনি দেশে-বিদেশে সুপরিচিত ছিলেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গণতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থা বিষয়ে তার রচিত একাধিক গ্রন্থ বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের পাঠ্যতালিকায় স্থান পেয়েছে।
তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং বিভিন্ন সময়ে দলটির নীতিগত বিষয়ে মতামত ও পরামর্শ দিয়েছেন। ২০২০ সালের ১৭ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
পারিবারিকভাবে শিক্ষা ও গবেষণার ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীনও দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও একাডেমিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ফলে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) প্রো-ভিসি পদ থেকে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই তার অব্যাহতির ঘটনা শিক্ষা অঙ্গনে বিশেষ আগ্রহ ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।



