এফডিআই বাড়াতে নতুন প্রণোদনা; স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বাস্তবায়ন নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন
ঢাকা | ১৩ জুন ২০২৬
দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন আর্থিক প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে সক্ষম ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মোট বিনিয়োগের ১.৫ শতাংশ ‘কনসালটেন্সি ফি’ বা কমিশন প্রদান করবে সরকার।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য জোহরাত আদিব চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি বাস্তব সমস্যা ছিল—বিনিয়োগ আনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকর কোনো প্রণোদনা কাঠামো ছিল না। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই সরকার নতুন ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তার ভাষায়, “বিদেশ থেকে কোনো বাংলাদেশি হোক বা বিদেশি হোক, ইনভেস্টমেন্ট দেশে নিয়ে আসতে পারলে আমরা সেটা থেকে দেড় শতাংশ কনসালটেন্সি ফি বা কমিশন দেবো।”
তিনি জানান, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রক্রিয়ায় আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
📊 এক নজরে ঘোষণাটি
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| প্রণোদনার ধরন | কনসালটেন্সি ফি/কমিশন |
| কমিশনের হার | মোট বিনিয়োগের ১.৫% |
| সুবিধাভোগী | বাংলাদেশি বা বিদেশি ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান |
| লক্ষ্য | সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি |
| প্রত্যাশিত ফল | বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান |
🌍 কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ঘোষণা
বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাবনার তুলনায় কম বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ এখনও সীমিত।
সরকারের ধারণা, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব। কমিশনভিত্তিক এই প্রণোদনা সেই প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এমন অনেক যোগ্য ও মেধাবী বাংলাদেশি বিদেশে আছেন, যারা বিদেশি বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে আনতে সক্ষম হবেন।”
💬 সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলনের প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন কমিশনভিত্তিক এই উদ্যোগের কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, যদি বিদেশি বিনিয়োগ কমিশন চাওয়ার কারণে বা অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের কারণে ফিরে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাদের কীভাবে চিহ্নিত করা হবে—সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও দাবি করেন, ব্রিটিশ কনসোর্টিয়াম IM Power দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে আগ্রহী। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে পায়রা-ঢাকা এবং ঢাকা-মাতারবাড়ী করিডোরে বিদ্যুৎচালিত রেলপথ, যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনা এবং নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন সুবিধা।
মাহবুব কবির মিলনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তার মতে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে শুধু কমিশন নয়, প্রশাসনিক জটিলতা, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং নীতিগত প্রতিবন্ধকতাও বড় চ্যালেঞ্জ।
🔎 কমিশন কি বিনিয়োগ বাড়াবে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য মধ্যস্থতাকারী, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি বা কনসালট্যান্টদের মাধ্যমে কমিশনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে সাধারণত কঠোর যাচাই-বাছাই, বিনিয়োগের উৎস নিশ্চিতকরণ এবং স্বচ্ছ অডিট ব্যবস্থাও থাকে।
বাংলাদেশের নতুন উদ্যোগ সফল করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে—
উত্তর প্রয়োজন যেসব প্রশ্নের
- কে কমিশনের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে?
- বিনিয়োগ বাস্তবে দেশে আসার পর নাকি চুক্তির ভিত্তিতে কমিশন দেওয়া হবে?
- একই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একাধিক দাবিদার থাকলে কী হবে?
- ভুয়া বা কাগুজে বিনিয়োগ দেখিয়ে কমিশন নেওয়ার ঝুঁকি কীভাবে ঠেকানো হবে?
- বিনিয়োগ পরবর্তীতে প্রত্যাহার হলে কমিশনের বিষয়ে কী নীতি অনুসরণ করা হবে?
- কমিশনের অর্থ কোন তহবিল থেকে দেওয়া হবে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর এবং কার্যকর নীতিমালা ছাড়া উদ্যোগটির পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
📈 অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্যোগটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এর কয়েকটি ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে—
| সম্ভাব্য সুবিধা | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|
| বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি | নতুন শিল্প স্থাপন |
| বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ | রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ |
| কর্মসংস্থান | নতুন চাকরি সৃষ্টি |
| প্রযুক্তি স্থানান্তর | উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি |
| অবকাঠামো উন্নয়ন | দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা |
তবে বাস্তবায়নে দুর্বলতা থাকলে কমিশনভিত্তিক ব্যবস্থার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি বা অস্বচ্ছ লেনদেনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
🇧🇩 বাংলাদেশের জন্য গুরুত্ব
বাংলাদেশ আগামী দশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ করে জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, উৎপাদন শিল্প এবং রপ্তানিমুখী খাতে বড় আকারের বিদেশি বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারে।
তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য শুধু আর্থিক প্রণোদনা নয়, নীতিগত স্থিতিশীলতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জমি ও অবকাঠামো সুবিধা, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
📊 সাফল্য নির্ভর করবে যেসব বিষয়ের ওপর
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নীতিমালা প্রকাশ। কমিশন প্রদানের শর্ত, যোগ্যতা, যাচাই পদ্ধতি, অর্থায়নের উৎস এবং জবাবদিহি কাঠামো স্পষ্ট হলে উদ্যোগটির কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
একই সঙ্গে মাহবুব কবির মিলনের মতো প্রশাসনিক অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের উত্থাপিত প্রশ্নগুলোরও নীতিগত ব্যাখ্যা দেওয়া হলে উদ্যোগটির গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, সরকারি তথ্য, মাহবুব কবির মিলনের ফেসবুক পোস্ট।




