ঢাকা ওয়াসা ও Drinkwell-এর উদ্যোগে বাড়ছে ওয়াটার এটিএমের ব্যবহার। ২০২৬ সালে Drinkwell-এর বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩৭০টির বেশি Water ATM স্থাপন করা হয়েছে এবং বছরে ৩০ লাখের বেশি মানুষ এ সেবা ব্যবহার করছেন। রাজধানীর কোথায় এই বুথ, কীভাবে পানি কিনবেন এবং পানির মান কীভাবে নিশ্চিত করা হয়—জেনে নিন বিস্তারিত।
ঢাকা | ২৯ আগস্ট ২০২৬
রাজধানীতে নিরাপদ পানযোগ্য পানি পাওয়া অনেক পরিবারের জন্য এখনো সহজ নয়। কোথাও লাইনের পানির মান নিয়ে অভিযোগ, কোথাও পানি ফুটিয়ে পান করার বাড়তি খরচ, আবার কোথাও বোতলজাত পানি কিনতে হয় নিয়মিত। এই বাস্তবতায় গত কয়েক বছরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে Water ATM।
নামটি ATM হলেও এখানে টাকা তোলার বদলে কার্ড ব্যবহার করে সংগ্রহ করা যায় পরিশোধিত পানীয় জল। ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে অংশীদারত্বে Drinkwell এই বিকেন্দ্রীভূত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালনা করছে। Drinkwell-এর বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তাদের ৩৭০টির বেশি Water ATM স্থাপন করা হয়েছে এবং বছরে ৩০ লাখের বেশি মানুষ এ সেবা গ্রহণ করছেন।
ঢাকা ওয়াসার ওয়েবসাইটেও “ওয়াটার এটিএম বুথের তালিকা” নামে পৃথক একটি সরকারি পেজ রয়েছে, যা সর্বশেষ ৪ জুন ২০২৫ হালনাগাদ করা হয়েছিল।
ফকিরাপুল থেকে শুরু, এখন ছড়িয়ে পড়েছে শহরজুড়ে
ঢাকায় Water ATM-এর পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু হয়েছিল ফকিরাপুলে, ২০১৬ সালে। সে সময় ডেনমার্কভিত্তিক Grundfos-এর সহযোগিতায় প্রথম বুথ স্থাপন করা হয়। পরে Drinkwell-এর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটি বড় আকারে বিস্তৃত হয়।
প্রথম দিকে কয়েকটি বুথ থাকলেও ধীরে ধীরে এর ব্যবহার বাড়তে থাকে। ঢাকা ওয়াসার প্রকাশিত তথ্যেও বলা হয়েছে, মানুষের চাহিদা বাড়ার কারণে বুথ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ৩০০ থেকে ৫০০ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল।
Drinkwell-এর বর্তমান বাংলাদেশ পেজ অবশ্য এখন ৩৭০+ Water ATM deployed বলছে। ফলে পুরোনো ঢাকা ওয়াসা তালিকা এবং বর্তমান Drinkwell deployment-এর সংখ্যার মধ্যে সময়ের পার্থক্য রয়েছে।
পানি কেন এত সস্তা?
Water ATM ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো বোতলজাত পানির চেয়ে কম খরচে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা।
আপনার দেওয়া সাম্প্রতিক ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি লিটার পানির মূল্য ১ টাকা। তবে Drinkwell-এর কিছু বর্তমান অনলাইন উপকরণে ভিন্ন মূল্যও দেখা যাচ্ছে। তাই নির্দিষ্ট বুথে যাওয়ার আগে বর্তমান কার্যকর মূল্য যাচাই করা সবচেয়ে নিরাপদ।
পুরোনো ঢাকা ওয়াসা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, RFID কার্ডে টাকা জমা রেখে পরে মেশিনে কার্ড ব্যবহার করে পানি নেওয়া যায়।
কীভাবে কাজ করে এই ‘পানির ATM’?
ব্যবস্থাটি মূলত তিনটি অংশে কাজ করে—
পানির উৎস → পরিশোধন ব্যবস্থা → স্বয়ংক্রিয় বিতরণ।
Drinkwell বলছে, তাদের সিস্টেম source-water condition অনুযায়ী treatment technology ব্যবহার করে এবং নিয়মিত water quality monitoring করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি একই সঙ্গে preventive maintenance, system monitoring ও customer service পরিচালনা করে।
ঢাকা ওয়াসার পুরোনো প্রযুক্তিগত বর্ণনায় RFID-enabled smart card এবং GSM/Ethernet connectivity-এর মাধ্যমে Water ATM-কে cloud-based monitoring ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ এটি কেবল একটি ফিল্টার নয়; পানি পরিশোধন, মেশিন পরিচালনা, গ্রাহকের হিসাব ও অপারেশন পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা।
কোথায় পাওয়া যেতে পারে?
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় Water ATM স্থাপনের তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সময় ঢাকা ওয়াসা, Drinkwell এবং সংশ্লিষ্ট প্রকাশিত তালিকা বা লোকেশন তথ্যে ফকিরাপুল, বাসাবো, মুগদা, বাড্ডা, ভাটারা, মিরপুর, উত্তরা, দয়াগঞ্জ, কমলাপুর, গাবতলী, মোহাম্মদপুর, আজিমপুর, আগারগাঁও, শেওড়াপাড়া, বসুন্ধরা, মহাখালী ও মগবাজারসহ একাধিক এলাকার উল্লেখ রয়েছে। পুরোনো প্রতিবেদনে ফকিরাপুল, বাসাবো, মুগদা, বানশ্রী, মাতুয়াইল ও রামপুরার মতো এলাকার নামও এসেছে।
তবে বুথের অবস্থান ও সচল থাকার অবস্থা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই একটি পুরোনো তালিকাকে বর্তমান ২০২৬ সালের পূর্ণ লোকেশন তালিকা হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
📍 আপনার কাছের Water ATM খুঁজে নিন
Drinkwell-এর বাংলাদেশ ওয়েবসাইটে “Deployments / Where we work” অংশে তাদের Water ATM network-এর তথ্য দেওয়া আছে।
Drinkwell Bangladesh:
ঢাকা ওয়াসার সরকারি Water ATM বুথের তালিকা:
Drinkwell-এর বর্তমান ওয়েবসাইটে দেখানো তথ্য: ৩৭০+ Water ATM, বছরে ৩০ লাখ+ মানুষ এবং ১.৮ বিলিয়নের বেশি লিটার পানি বিক্রির দাবি। এগুলো Drinkwell-এর নিজস্ব প্রকাশিত পরিসংখ্যান।
পানির মান কীভাবে নিশ্চিত করা হয়?
এখানেই Water ATM ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
Drinkwell জানিয়েছে, তারা নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা ও monitoring করে এবং স্থানীয় সরকারি কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত standards-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে day-to-day operation, preventive maintenance এবং service disruption মোকাবিলার ব্যবস্থাও তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে।
পুরোনো Drinkwell-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, underground water থেকে iron ও manganese অপসারণ এবং ultraviolet treatment-এর মতো ধাপ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল। তবে সব বুথে একই treatment process ব্যবহার হয়—এমন দাবি বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে করা যাচ্ছে না; source-water condition অনুযায়ী প্রযুক্তি পরিবর্তিত হতে পারে।
প্রকল্পে ঢাকা ওয়াসা আর Drinkwell-এর কাজ কী?
এই মডেলটি একটি public-private partnership ধরনের ব্যবস্থায় পরিচালিত।
Drinkwell-এর বর্তমান ব্যাখ্যা অনুযায়ী, utility public oversight, regulatory supervision ও tariff authority ধরে রাখে, আর Drinkwell day-to-day operation, maintenance, water-quality monitoring ও customer service পরিচালনা করে।
বাংলাদেশের ঢাকা ওয়াসার পুরোনো প্রকল্প কাঠামোতে পানি, জমি, বিদ্যুৎ ও প্রয়োজনীয় utility infrastructure দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল; অন্যদিকে Drinkwell পানি পরিশোধন প্রযুক্তি, ATM dispenser, RFID card ও প্রযুক্তিগত support দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল।
কেন বাড়ছে ব্যবহার?
পরিসংখ্যানই এর একটি উত্তর দেয়।
ঢাকা ওয়াসার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে Water ATM থেকে প্রায় ২১ লাখ লিটার পানি সরবরাহ হয়েছিল। আপনার দেওয়া ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সরবরাহ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ কোটি ৪৮ লাখ লিটারের বেশি এবং ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই সরবরাহ হয়েছে প্রায় ২৭ কোটি ৫০ লাখ লিটার।
অর্থাৎ ব্যবহার ধীরে ধীরে বেড়েছে এবং Water ATM এখন অনেক পরিবারের নিয়মিত পানির উৎসে পরিণত হয়েছে।
৮ লাখের বেশি কার্ড—এটিই বড় সাফল্যের ইঙ্গিত
আপনার দেওয়া সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৮ লাখ ৫০ হাজার ৬৯টি Water ATM card বিক্রি হয়েছে।
এই সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি কেবল কত লিটার পানি বিক্রি হয়েছে তা নয়; কত মানুষ এই সেবার সঙ্গে বাস্তবে যুক্ত হয়েছে, তার একটি ধারণা দেয়।
তবে cardholders-এর সংখ্যা সরাসরি সক্রিয় দৈনিক গ্রাহকের সংখ্যা বোঝায় না।
শুধু ঢাকাতেই নয়
Drinkwell বর্তমানে বাংলাদেশে শুধু ঢাকা নয়, Chattogram WASA, Rajshahi City Corporation, Narayanganj City Corporation এবং Khulna WASA-এর সঙ্গেও কাজ করার কথা জানিয়েছে।
এতে বোঝা যায়, Water ATM model-টি কেবল ঢাকার একটি প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং শহরাঞ্চলে decentralized safe-water service হিসেবে বিস্তৃত করার চেষ্টা চলছে।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা কী?
কম দাম: বোতলজাত পানির তুলনায় ব্যয় কম হতে পারে।
সহজ ব্যবহার: RFID বা prepaid ব্যবস্থা থাকায় প্রতিবার নগদ টাকা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
বাড়ির কাছাকাছি সেবা: বড় বোতল বা জার দূর থেকে কিনে আনার প্রয়োজন কমতে পারে।
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা: automated dispensing ও operational monitoring করা যায়।
কমিউনিটি ভিত্তিক সরবরাহ: একটি বুথ একই এলাকার বহু পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারে।
সীমাবদ্ধতা কোথায়?
সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো সব বুথ সবসময় সচল থাকে না।
এ ছাড়া একটি এলাকায় বুথ থাকা মানেই সেটি ব্যবহারকারীর জন্য সুবিধাজনক দূরত্বে আছে—এমন নয়।
আর পানির মানের ক্ষেত্রে শুধু “filtered” বা “purified” লেখা যথেষ্ট নয়। ব্যবহারকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সাম্প্রতিক পরীক্ষার ফল, মানদণ্ড ও monitoring-এর তথ্য আরও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হলে এই ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়তে পারে।
সবশেষে, Water ATM শহরের নিরাপদ পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ব্যবস্থা হলেও এটি ঢাকার সামগ্রিক পানি সরবরাহ সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়।
সামনে কী হতে পারে?
এই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে একই সঙ্গে দেখা যাবে—
নিকটতম বুথ কোথায় → বুথটি সচল কি না → পানি কত দামে পাওয়া যাচ্ছে → খোলার সময় → সর্বশেষ quality test-এর তথ্য → card recharge-এর পদ্ধতি।
বর্তমানে Drinkwell-এর ওয়েবসাইটে deployment ও সেবা সম্পর্কে তথ্য আছে, আর ঢাকা ওয়াসার সাইটে Water ATM-এর সরকারি তালিকা রয়েছে। এই দুই উৎসকে নিয়মিতভাবে synchronized করে একটি live public map তৈরি করা গেলে গ্রাহকের জন্য সেবাটি আরও ব্যবহারযোগ্য হবে।
শেষ কথা
২০১৬ সালে ফকিরাপুলে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া Water ATM এখন বাংলাদেশের নগর নিরাপদ পানি সরবরাহের একটি পরিচিত মডেল। Drinkwell-এর বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩৭০টির বেশি Water ATM স্থাপন করা হয়েছে এবং বছরে ৩০ লাখের বেশি মানুষ এ সেবা ব্যবহার করছেন।
এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো প্রযুক্তিতে নয়—মানুষের দৈনন্দিন জীবনে একটি বিকল্প তৈরি করতে পারায়।
তবে পরবর্তী পর্যায়ে এই সেবার সাফল্য শুধু বুথের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং তিনটি প্রশ্ন দিয়ে মাপা উচিত—
পানি কতটা নিরাপদ?
বুথ কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে চালু থাকে?
আর একজন নাগরিক তার কাছের বুথটি কত সহজে খুঁজে পান?
এই তিনটির উত্তর যত পরিষ্কার হবে, ঢাকার পানির সংকটে Water ATM তত বেশি কার্যকর নাগরিকসেবায় পরিণত হতে পারবে।
তথ্যসূত্র
ঢাকা ওয়াসা, Drinkwell Bangladesh, ঢাকা ওয়াসার Water ATM তালিকা, JICA-সংক্রান্ত ঢাকা ওয়াসা কেস স্টাডি এবং Water ATM নিয়ে প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন।




