Homeটুডে ক্যারিয়ারভিসি নিয়োগে ‘আয়নাবাজি’: ২৩ দিন দায়িত্ব পালনের পর জানলেন তিনি ‘ভুল ভিসি’

ভিসি নিয়োগে ‘আয়নাবাজি’: ২৩ দিন দায়িত্ব পালনের পর জানলেন তিনি ‘ভুল ভিসি’

নাম একই, বিশ্ববিদ্যালয় ভিন্ন; শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘টাইপিং মিসটেক’ ব্যাখ্যায় নতুন বিতর্ক

ঢাকা | ৬ জুন ২০২৬ | Today TV BD Report

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রশাসনের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনা ঘটেছে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে। নিয়োগের ২৩ দিন পর একজন ভিসি জানতে পারলেন, যাকে সরকার নিয়োগ দিয়েছিল বলে তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন, প্রকৃতপক্ষে তিনি সেই ব্যক্তি নন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটি ঘটেছে একটি ‘টাইপিং মিসটেক’-এর কারণে।

তবে এই ব্যাখ্যা ঘিরে শিক্ষাঙ্গন, প্রশাসনিক মহল এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।


কী ঘটেছে?

গত ১৪ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে।

প্রজ্ঞাপন পাওয়ার দুই দিন পর, ১৬ মে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণ এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নসহ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

কিন্তু নিয়োগের মাত্র ২৩ দিন পর নাটকীয়ভাবে পরিস্থিতি বদলে যায়।

৬ জুন নতুন এক প্রজ্ঞাপনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, পূর্ববর্তী নিয়োগে ভুল হয়েছিল এবং প্রকৃতপক্ষে ভিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেনের।

এরপর প্রথমজনকে অব্যাহতি দিয়ে দ্বিতীয়জনকে নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।


দুই আমির, এক পদ

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রায় একই নামের দুই অধ্যাপক।

ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠান
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেনবাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, একই ধরনের নাম থাকার কারণে প্রজ্ঞাপন তৈরির সময় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এবং ভুল ব্যক্তির তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।


মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা: ‘টাইপিং মিসটেক’

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক দাবি করেছেন, এটি মূলত একটি প্রশাসনিক ভুল।

তার ভাষায়,

“প্রজ্ঞাপন জারির সময় টাইপিং মিসটেকের কারণে এমন বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, ভুল শনাক্ত হওয়ার পর সংশোধনের চেষ্টা করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে যোগদান না করার জন্য যোগাযোগও করা হয়েছিল।


অব্যাহতি পাওয়া ভিসির পাল্টা প্রশ্ন

তবে এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ সদ্য অপসারিত ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া।

তার প্রশ্ন,

“নাম একই হতে পারে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও কি ভুল হবে? এটা কীভাবে সম্ভব?”

তিনি দাবি করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং নিয়ম মেনে যোগদানের সকল কাগজপত্রও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।

তার ভাষায়,

“আমি ২৩ দিন দায়িত্ব পালন করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছি, প্রশাসনিক কাজ করেছি। এখন বলা হচ্ছে আমি ভুল ব্যক্তি। এটা শুধু প্রশাসনিক ভুল বলে মনে হয় না।”


নিয়োগ বাতিলের পেছনে কি অন্য কারণ?

ঘটনাটিকে ঘিরে আরও একটি বিতর্ক সামনে এসেছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, অধ্যাপক ড. আমির হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে পূর্বে ওঠা কিছু অভিযোগ নিয়োগ বাতিলের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • যৌন হয়রানির অভিযোগ;
  • গবেষণাপত্রে জালিয়াতির অভিযোগ;
  • প্রশাসনিক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন।

জানা গেছে, এসব অভিযোগ তদন্তে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছিল।

তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।


সার্চ কমিটি নিয়েও প্রশ্ন

ফেব্রুয়ারি-পরবর্তী সময়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি নিয়োগে নতুন সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

সেই কমিটির মাধ্যমে প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই করে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়।

প্রশ্ন উঠেছে—

  • একই নামের দুই ব্যক্তিকে আলাদা করতে কমিটি ব্যর্থ হলো কেন?
  • নিয়োগপত্র জারির আগে চূড়ান্ত যাচাই করা হয়েছিল কি না?
  • রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন ভুল হলে দায় কার?

শিক্ষা প্রশাসনের জন্য সতর্কবার্তা

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একজন ভিসির নিয়োগ ও অপসারণের ঘটনা নয়।

বরং এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রশাসনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

একজন শিক্ষা বিশ্লেষকের ভাষায়,

“যদি সত্যিই এটি টাইপিং মিসটেক হয়, তাহলে এটি ভয়াবহ প্রশাসনিক ব্যর্থতা। আর যদি অন্য কোনো কারণে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও সমান উদ্বেগজনক।”


📊 ঘটনাক্রম

১৪ মে ২০২৬
➡️ ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া

১৬ মে ২০২৬
➡️ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ

১৭ মে ২০২৬
➡️ অভিযোগ তদন্তে ইউজিসিকে চিঠি

২৫ মে ২০২৬
➡️ ইউজিসির তদন্ত কমিটি গঠন

৬ জুন ২০২৬
➡️ নতুন প্রজ্ঞাপন; আগের ভিসিকে অব্যাহতি

৬ জুন ২০২৬
➡️ নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান ড. মো. আমির হোসেন


Today TV BD Analysis

জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগকে ঘিরে সৃষ্ট এই ঘটনা বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসনের জন্য একটি অস্বস্তিকর নজির হয়ে থাকবে। কারণ এখানে শুধু একজন কর্মকর্তার নিয়োগ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহি—সবকিছুই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এটি কি সত্যিই একটি ‘টাইপিং মিসটেক’, নাকি এর আড়ালে রয়েছে আরও জটিল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা? সেই উত্তর খুঁজছে দেশের শিক্ষা অঙ্গন।

তথ্যসূত্র : দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments