নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের অবিশ্বাস্য ফলাফল, টেস্ট পরীক্ষার পর শিক্ষার্থী বাদ দেওয়ার অভিযোগ এবং ‘সাফল্যের মডেল’ নিয়ে বড় প্রশ্ন
টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান
একটি স্কুল।
একটি এসএসসি ব্যাচ।
৩৮২ জন পরীক্ষার্থী।
আর ৩৮২ জনেরই জিপিএ-৫।
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের ৩৮২ জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে—প্রতিষ্ঠানটির ২০২৬ সালের ফলাফল সম্পর্কে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী। অর্থাৎ শুধু শতভাগ পাস নয়, শতভাগ জিপিএ-৫।
এমন ফল নিঃসন্দেহে অসাধারণ।
কিন্তু এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পাশাপাশি উঠে এসেছে আরও একটি গল্প—একদল শিক্ষার্থীর বাদ পড়ে যাওয়ার গল্প।
অভিভাবকদের অভিযোগ, নির্বাচনী বা টেস্ট পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল করতে না পারা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে এসএসসি পরীক্ষার কয়েক মাস আগে প্রতিষ্ঠান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, ১০৭ জন শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং তাদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
অভিযোগটি সত্য হলে, বিষয়টি আর কেবল একটি স্কুলের ভালো ফলাফলের গল্প থাকে না। তখন সামনে আসে বাংলাদেশের শিক্ষা-ব্যবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্ন—
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কি শুধু পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দিয়ে মাপা হবে, নাকি দুর্বল শিক্ষার্থীকে ধরে রেখে তাকে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার হলে পৌঁছে দেওয়াও সেই সাফল্যের অংশ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই প্রয়োজন পুরো ছবিটি দেখা।
২০২৬: ৩৮২ জন পরীক্ষার্থী, ৩৮২ জনই জিপিএ-৫
২০২৬ সালের ফলাফল সম্পর্কে সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে ৩৮২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং ৩৮২ জনই জিপিএ-৫ অর্জন করে।
অর্থাৎ—
মোট পরীক্ষার্থী: ৩৮২
জিপিএ-৫: ৩৮২
জিপিএ-৫ হার: ১০০ শতাংশ
এই ফলাফল এককভাবে দেখলে এটি অসাধারণ এক একাডেমিক সাফল্য।
প্রতিষ্ঠানটির সরকারি শিক্ষা বোর্ড পোর্টালেও স্কুলটির EIIN ১৩৪০২০ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে এবং সেখানে পাবলিক পরীক্ষা, টিউটোরিয়াল, কুইজ টেস্ট ও অন্যান্য একাডেমিক রেকর্ডের আলাদা বিভাগ রয়েছে। যদিও সাইটটির কিছু অংশ বর্তমানে নির্মাণাধীন।
অর্থাৎ, এই ফলাফলের পেছনে থাকা শিক্ষার্থীসংখ্যা, পরীক্ষার রেকর্ড ও একাডেমিক অগ্রগতির তথ্য যাচাই করার জন্য প্রাসঙ্গিক নথি থাকার কথা।
সেখানেই অনুসন্ধানের মূল জায়গা।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সাফল্য নয়
নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের ফলাফল কয়েক বছর ধরেই নজরকাড়া।
স্কুলের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ২০২৪ সালের এসএসসি ফলাফল সম্পর্কে বলা হয়েছে—২৯৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৯৪ জন জিপিএ-৫ এবং একজন ৪.৯৪ পেয়েছেন।
২০২৫ সালেও প্রতিষ্ঠানটির ৩২০ জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছিল বলে বাংলাদেশ পোস্টসহ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
ফলে ধারাবাহিক চিত্রটি দাঁড়ায়—
| বছর | মোট পরীক্ষার্থী | জিপিএ-৫ | জিপিএ-৫ হার |
|---|---|---|---|
| ২০২৬ | ৩৮২ | ৩৮২ | ১০০% |
| ২০২৫ | ৩২০ | ৩২০ | ১০০% |
| ২০২৪ | ২৯৫ | ২৯৪ | ৯৯.৬% |
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির ফলাফল নিঃসন্দেহে একটি ধারাবাহিক সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে।
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—
এই ফলাফল কি পুরো ব্যাচের একাডেমিক পারফরম্যান্সের প্রতিফলন, নাকি পরীক্ষার আগে বাছাই করা শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স?
এই দুই প্রশ্নের উত্তর এক নয়।
১০৭ শিক্ষার্থী—তারা কোথায় গেল?
অভিভাবকদের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার আগে ১০৭ জন শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা করছিল। কারও কারও শিক্ষাজীবনের বড় অংশ কেটেছে একই স্কুলে।
কিন্তু নির্বাচনী বা টেস্ট পরীক্ষার পর তাঁদের জানানো হয়, তারা আর প্রতিষ্ঠানটির হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না।
এক অভিভাবকের অভিযোগ—
“আমাদের বাচ্চাদেরকে বের করে দিসে। তাহলে উনারা ১০০% পাসটা দেখাইলে তাহলে উনার কৃতিত্বটা কোথায়?”
অন্য আরেকজন বলেন—
“বুক ভরা আশা নিয়ে দিসি বাচ্চাডা ভালো পড়ালেখা করে এসএসসি পাস করে এখান থেকে বের হবে। এই মুহূর্তে আমাদের বাচ্চাগুলোকে বের করে দেওয়া হইসে।”
অভিভাবকদের আরও অভিযোগ, টেস্ট পরীক্ষায় এ-প্লাস না পাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকেই বাদ দেওয়া হয়েছিল।
তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাটি প্রয়োজন—
১০৭ শিক্ষার্থীকে শুধু জিপিএ-৫ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বাদ দেওয়া হয়েছিল—এই অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ নথি এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকে আপাতত অভিভাবকদের অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
‘ফল বাছাই’—অভিযোগটির প্রকৃতি কী?
অভিভাবকদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে অভিযোগটির কাঠামো দাঁড়ায় এমন—
প্রথমে একটি বড় ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিল।
তারপর নির্বাচনী বা টেস্ট পরীক্ষা হলো।
যারা কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারেনি, তাদের একটি অংশ বাদ পড়ল।
এরপর তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী শিক্ষার্থীদের নিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিল প্রতিষ্ঠানটি।
অবশেষে—
১০০ শতাংশ পাস + ১০০ শতাংশ জিপিএ-৫।
এটি সত্য হলে শিক্ষাবিজ্ঞানের ভাষায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—এটি কি শিক্ষার্থীদের শেখানোর সাফল্য, নাকি পরীক্ষার্থী নির্বাচনের কৌশল?
তবে আবারও বলা জরুরি—এই বিশ্লেষণটি অভিযোগের সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে; নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস এমন কোনো কৌশল নিয়েছে—এটি এখনো প্রমাণিত নয়।
একটি স্কুলের ফলাফল যাচাইয়ের আসল সংখ্যা কোনটি?
সাধারণত আমরা দেখি—
কতজন পরীক্ষা দিয়েছে?
কতজন পাস করেছে?
কতজন জিপিএ-৫ পেয়েছে?
কিন্তু অনুসন্ধানের জন্য আরও কয়েকটি সংখ্যা দরকার—
দশম শ্রেণিতে মোট কতজন শিক্ষার্থী ছিল?
নির্বাচনী পরীক্ষায় কতজন অংশ নিয়েছিল?
কতজন অকৃতকার্য হয়েছিল?
ফরম পূরণ করেছে কতজন?
শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষার হলে পৌঁছেছে কতজন?
যারা আর পরীক্ষায় অংশ নেয়নি, তারা কোথায় গেল?
এই সংখ্যাগুলো না জানা পর্যন্ত একটি স্কুলের ‘শতভাগ জিপিএ-৫’ ফলাফল পুরো গল্প বলে না।
শিক্ষা বোর্ডের নথিতে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের স্কুল পোর্টালে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের জন্য পাবলিক পরীক্ষা, টিউটোরিয়াল, কুইজ টেস্ট ও একাডেমিক পারফরম্যান্সসহ পৃথক রেকর্ড সেকশন রয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন প্রকাশিত নোটিশে নির্বাচনী পরীক্ষায় দুর্বল ফল করা শিক্ষার্থীদের জন্য আবেদন, পুনরায় অংশগ্রহণ বা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় পরবর্তী ধাপে যাওয়ার নজির দেখা যায়।
তাই এই মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি হবে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব—
নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল, দশম শ্রেণির রেজিস্টার, ফরম পূরণের তালিকা এবং বোর্ডে পাঠানো পরীক্ষার্থী তালিকা।
এই চারটি ডেটাসেট একত্রে মিলিয়ে দেখা গেলেই বোঝা যাবে ১০৭ জন শিক্ষার্থীর অভিযোগ কতটা সত্য।
টেস্ট পরীক্ষার উদ্দেশ্য কী?
একটি নির্বাচনী বা টেস্ট পরীক্ষা সাধারণত শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি কতটুকু হয়েছে, কোথায় দুর্বলতা আছে এবং এসএসসি পরীক্ষার আগে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন—তা বোঝার একটি উপায়।
কিন্তু যদি টেস্ট পরীক্ষার ফলাফলই শিক্ষার্থী বাদ দেওয়ার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন তৈরি হয়।
একজন শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় খারাপ করতে পারে—
- কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে দুর্বলতার কারণে;
- পরীক্ষাভীতি বা মানসিক চাপের কারণে;
- অসুস্থতার কারণে;
- পারিবারিক সমস্যার কারণে;
- অথবা প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি উন্নয়ন হয়, তাহলে সেই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়াই হওয়ার কথা।
অভিভাবকদের বক্তব্য হলো—তাঁদের সন্তানরা সেই সুযোগ পায়নি।
‘দশ বছরের সম্পর্ক, অথচ শেষ মুহূর্তে বাদ’
একজন অভিভাবকের বক্তব্য—
“দশ বছর পর্যন্ত ভালো, কিন্তু এখন কেন তাকে হুট করে ছেড়ে দেবে? রেজিস্ট্রেশন করা একটা সন্তান…”
আরেকজন প্রশ্ন করেন—
“যদি অন্য স্কুলে বাচ্চারা পরীক্ষা দিতে পারে, তাহলে কাদির মোল্লা স্যারের এখানে দিতে পারবে না কেন?”
এই বক্তব্যগুলো থেকে শুধু ক্ষোভ নয়, আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে—
প্রতিষ্ঠান থেকে বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শিক্ষাজীবনের দায়িত্ব কে নেবে?
তারা কি অন্য স্কুলে ভর্তি হয়েছে?
কতজন ভর্তি হতে পেরেছে?
কতজন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরেছে?
কতজন পারেনি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগটির বাস্তব প্রভাব বোঝা সম্ভব হবে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্ন
অভিভাবকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের মানসিক ভেঙে পড়ার অভিযোগ।
এক অভিভাবক বলেন—
“আমাদের ছেলেমেয়েরা মাইন্যা নিতে পারতেছে না। সকল মেয়েরা বিষ খায়া কান্নাকাটি করে, স্কুল ভিইগা কান্নাকাটি করে, স্কুলের মায়াজাল তারা ছাড়তে পারতেছে না।”
এই বক্তব্যের প্রতিটি অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু যদি সত্যিই এসএসসি পরীক্ষার কয়েক মাস আগে কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিনের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান হারিয়ে ফেলে, তার মানসিক প্রভাবকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
কিশোর বয়সে স্কুল কেবল একটি ভবন নয়।
এটি বন্ধু, শিক্ষক, পরিচিত পরিবেশ, দৈনন্দিন রুটিন এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নের অংশ।
সুতরাং এমন সিদ্ধান্তের শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক প্রভাব কী হয়েছে, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।
স্কুলের একাডেমিক সাফল্যকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই
নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সক্ষমতার বাস্তব প্রমাণ রয়েছে।
২০২৪ সালে ২৯৫ জনের মধ্যে ২৯৪ জন জিপিএ-৫ পাওয়ার তথ্য স্কুল নিজেই প্রকাশ করেছে।
২০২৫ সালে ৩২০ জনের সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে বলে প্রকাশিত সংবাদে এসেছে।
শুধু পরীক্ষার ফল নয়, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা গণিত অলিম্পিয়াডেও সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের ২০২৬ সালের ফলাফলে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের একাধিক শিক্ষার্থী আঞ্চলিক পর্যায়ে সাফল্য পেয়েছে।
অর্থাৎ—
প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক সক্ষমতা আছে—এটি অস্বীকার করার কারণ নেই।
প্রশ্নটি বরং অন্য জায়গায়—
এই সক্ষমতার সুবিধা কি পুরো ব্যাচ পেয়েছে?
যদি ১০৭ জন বাদ দিয়ে থাকে, তাহলে প্রকৃত সাফল্যের হিসাব কী?
একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি সহজ করা যায়।
ধরা যাক, একটি ব্যাচে ৪৮৯ জন শিক্ষার্থী ছিল।
তাদের মধ্যে ১০৭ জনকে পরীক্ষার আগে বাদ দেওয়া হলো।
শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় বসলো ৩৮২ জন।
এবং ৩৮২ জনই জিপিএ-৫ পেল।
তাহলে পরীক্ষার ফল হবে—
১০০ শতাংশ জিপিএ-৫।
কিন্তু পুরো ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ভিত্তিতে সাফল্যের গল্পটি আর একই থাকবে না।
তখন প্রশ্ন হবে—
৪৮৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৮২ জনই কি সাফল্যের মাপকাঠি?
নাকি ৪৮৯ জনকেই পরীক্ষার উপযোগী করার চেষ্টা করা উচিত ছিল?
এই কারণেই ‘ফলাফল’ এবং ‘শিক্ষাগত সাফল্য’ একই বিষয় নয়।
যে ১০টি প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি
এই অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির জন্য নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস এবং শিক্ষা কর্তৃপক্ষের কাছে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর চাওয়া যেতে পারে:
১. ২০২৬ সালের এসএসসি ব্যাচে শিক্ষাবর্ষের শুরুতে মোট শিক্ষার্থী কতজন ছিল?
২. নির্বাচনী পরীক্ষায় মোট কতজন অংশ নিয়েছিল?
৩. কতজন শিক্ষার্থী নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিল?
৪. ১০৭ শিক্ষার্থীর তালিকা কী?
৫. তাদের কতজন এসএসসি ফরম পূরণের সুযোগ পেয়েছিল?
৬. যারা সুযোগ পায়নি, তাদের লিখিত কারণ কী?
৭. তাদের পুনঃপরীক্ষা বা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি?
৮. বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের কতজন অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে?
৯. স্কুলের দশম শ্রেণির রেজিস্টার এবং বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার্থী তালিকার মধ্যে পার্থক্য কত?
১০. গত পাঁচ বছরে দশম শ্রেণির মোট শিক্ষার্থী বনাম এসএসসি পরীক্ষার্থীর অনুপাত কী?
এই তথ্যগুলো প্রকাশিত হলে বিতর্কের বড় একটি অংশ আর অনুমাননির্ভর থাকবে না।
দাবি বনাম যাচাইযোগ্য তথ্য
| বিষয় | অবস্থান |
|---|---|
| ২০২৬ সালে ৩৮২ পরীক্ষার্থীর ৩৮২ জনের জিপিএ-৫ | ব্যবহারকারীর সরবরাহ করা ফলাফল-তথ্য; স্বাধীন প্রকাশ্য উৎসে এই নির্দিষ্ট সংখ্যা আমাদের অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি |
| ২০২৫ সালে ৩২০ জনের সবাই জিপিএ-৫ | প্রকাশিত সংবাদে নিশ্চিত |
| ২০২৪ সালে ২৯৫ জনের মধ্যে ২৯৪ জন জিপিএ-৫ | প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত |
| ১০৭ শিক্ষার্থী বাদ | অভিভাবকদের অভিযোগ; স্বাধীন নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি |
| শুধু জিপিএ-৫ নিশ্চিত করতে বাদ | অভিভাবকদের অভিযোগ; তদন্ত প্রয়োজন |
| প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক সক্ষমতা | ফলাফল ও অলিম্পিয়াডের সাফল্যে সমর্থিত |
| ১০৭ শিক্ষার্থীর বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না | এখনো পরিষ্কার নয়; নথি যাচাই প্রয়োজন |
শিক্ষা কি ফলাফল তৈরির কারখানা?
এই বিতর্কের গভীরে আসলে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন।
একটি স্কুলের কাজ কি বোর্ডের পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফল তৈরি করা?
অবশ্যই।
কিন্তু শুধু সেটাই কি তার কাজ?
একজন শিক্ষার্থী যদি দুর্বল হয়, তাহলে তাকে আরও ভালো ফল করার জন্য সময় দেওয়া, অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া, মনোযোগ দেওয়া, অভিভাবকের সঙ্গে কাজ করা—এসব কি শিক্ষার অংশ নয়?
একজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ না পেলেই যদি তাকে শেষ মুহূর্তে প্রতিষ্ঠান থেকে বাদ দিতে হয়, তাহলে শিক্ষা কোথায়?
আর যদি প্রতিষ্ঠানটির দাবি হয়—তারা কোনো শিক্ষার্থীকে জিপিএ-৫-এর জন্য বাদ দেয়নি, তাহলে সেটিও তাদের নথিপত্র দিয়ে সহজেই প্রমাণ করা সম্ভব।
তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—
অভিযোগ নয়, নথি।
বক্তব্য নয়, ডেটা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, যাচাইযোগ্য রেকর্ড।
টুডে টিভি বিডির অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণ
নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের ফলাফল নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
পরপর কয়েক বছর জিপিএ-৫-এর এত উচ্চ হার একটি অসাধারণ একাডেমিক সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।
কিন্তু একই সঙ্গে ১০৭ শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়ার অভিযোগও অত্যন্ত গুরুতর।
এই অভিযোগ সত্য হলে, এটি শুধু একটি স্কুলের নীতি নিয়ে প্রশ্ন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের শিক্ষা-ব্যবস্থায় ‘ফলাফল-নির্ভর সাফল্য’ বনাম ‘শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক সাফল্য’-এর মৌলিক দ্বন্দ্ব সামনে আনবে।
আর অভিযোগটি সত্য না হলে, সেটিও পরিষ্কারভাবে বলা দরকার—যাতে একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের অর্জন ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।
সুতরাং এই মুহূর্তে সবচেয়ে যৌক্তিক পথ হলো স্বাধীন তদন্ত।
দশম শ্রেণির রেজিস্টার বের করা হোক।
নির্বাচনী পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হোক।
ফরম পূরণের তালিকা প্রকাশ করা হোক।
বোর্ডের পরীক্ষার্থী তালিকার সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা হোক।
১০৭ শিক্ষার্থীর বর্তমান অবস্থাও খুঁজে দেখা হোক।
তারপর বেরিয়ে আসুক সত্য।
শেষ প্রশ্ন: ৩৮২-এর আগে কতজন?
আজ নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের নাম উচ্চারিত হচ্ছে ৩৮২টি জিপিএ-৫-এর কারণে।
এটি অবশ্যই গর্বের বিষয়।
কিন্তু অনুসন্ধানের প্রশ্নটি অন্য জায়গায়—
এই ৩৮২ জনের আগে একই ব্যাচে মোট কতজন শিক্ষার্থী ছিল?
১০৭ জনকে কি সত্যিই বাদ দেওয়া হয়েছিল?
যদি হয়ে থাকে, কেন?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কি শুধু যারা শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার হলে বসেছে তাদের ফলাফলে, নাকি যারা মাঝপথে পিছিয়ে পড়েছিল তাদেরও শেষ পর্যন্ত টেনে তোলার সক্ষমতায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ২০২৬ সালের শতভাগ জিপিএ-৫ নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ ফলাফল।
কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানেরও সূচনা।
কারণ—
সংখ্যার সামনে যখন ১০০ শতাংশ লেখা থাকে, সাংবাদিকতার কাজ শুধু সেই সংখ্যার প্রশংসা করা নয়; সংখ্যাটির পেছনে কী আছে, সেটিও খুঁজে দেখা।
টুডে টিভি বিডি এই অভিযোগের বিষয়ে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁদের লিখিত বা অন-রেকর্ড বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
—টুডে টিভি বিডি ইনভেস্টিগেশন ডেস্ক




