Homeটুডে ক্যারিয়ারসদকায়ে জারিয়ার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: আলহাজ্জ নাজমুল হক ভূঁইয়া

সদকায়ে জারিয়ার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: আলহাজ্জ নাজমুল হক ভূঁইয়া

বীর মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগীর জীবনকথা; ব্যবসায়িক ভবনের স্বপ্ন বদলে যেভাবে গড়ে উঠেছিল মসজিদ-মাদ্রাসা

মানুষের জীবন শেষ হয়, কিন্তু কিছু মানুষের কর্ম শেষ হয় না। মৃত্যুর পরও তাঁদের রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান, মূল্যবোধ, শিক্ষা ও মানবকল্যাণের কাজ প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্জ নাজমুল হক ভূঁইয়া ছিলেন এমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব — যাঁর জীবনের পরিচয় শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী বা সমাজসেবকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষানুরাগী, দ্বীনের নিবেদিত খাদেম এবং মানুষের কল্যাণে সম্পদ ও শ্রম ব্যয় করা এক দানশীল সমাজকর্মী।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে আছে দ্বীনি শিক্ষা বিস্তার, মসজিদ প্রতিষ্ঠা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন। নিজের জন্য গড়ে তোলার কথা ছিল যে ব্যবসায়িক ভবন, এক সময় সেই জায়গাকেই তিনি মসজিদ ও মাদ্রাসার জন্য উৎসর্গ করেন। তাঁর মৃত্যুর দুই দশকেরও বেশি সময় পরও সেই প্রতিষ্ঠানগুলো চালু আছে, শিক্ষার্থীরা সেখানে পড়ছে, মসজিদে আজান হচ্ছে, কুরআন-হাদিসের পাঠ চলছে — আর সেখানেই বেঁচে আছে তাঁর কর্মের উত্তরাধিকার।

বাঘুন গ্রামের সন্তান, বড় হয়েছেন দৃঢ়চেতা মানসিকতায়

আলহাজ্জ নাজমুল হক ভূঁইয়া বর্তমান গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বাঘুন গ্রামের একটি ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম ভূঁইয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মরহুম বজলুল হক ভূঁইয়া। পারিবারিক স্নেহ, মমতা ও স্বচ্ছল পরিবেশে বেড়ে উঠলেও শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সাহসী, আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চেতা।

শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের গুণ, শৃঙ্খলাবোধ এবং দৃঢ় মনোবলের যে পরিচয় পাওয়া যায়, পরবর্তী জীবনের কর্মকাণ্ডে তারই প্রতিফলন ঘটে। লেখাপড়ার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি, দায়িত্ব নেওয়া এবং সিদ্ধান্তে অটল থাকার যে মানসিকতা তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তীতে ব্যবসা, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজসেবা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পড়াশোনা থেকে কর্মজীবনে

প্রাথমিক শিক্ষা তিনি নিজ গ্রামেই সম্পন্ন করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় যান। ছাত্রজীবনেই তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের গুণ, আত্মবিশ্বাস ও শৃঙ্খলার যে বিকাশ ঘটে, তা তাঁর পরবর্তী জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ব্যবসায় যুক্ত হন। কঠোর পরিশ্রম, সততা ও দক্ষতার মাধ্যমে ব্যবসায়িকভাবে প্রতিষ্ঠিত হন এবং আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জন করেন। কিন্তু অর্থনৈতিক সাফল্যকে কখনোই তাঁর জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে সম্পদের প্রকৃত মূল্য ছিল মানুষের কল্যাণ, শিক্ষা বিস্তার এবং দ্বীনি খেদমতে তা ব্যয় করার মধ্যে।

মুক্তিযুদ্ধে দেশপ্রেমের পরীক্ষা

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্বাধীনতার আহ্বানে সাড়া দেন নাজমুল হক ভূঁইয়া। তিনি সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যুদ্ধের নানা অভিজ্ঞতা তিনি পরবর্তী জীবনে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করতেন, যা তাঁর দেশপ্রেমের গভীরতার সাক্ষ্য বহন করে।

তাঁর এই পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ — কারণ পরবর্তী জীবনে ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলেও তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি শক্ত ভিত্তি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।

একটি ব্যবসায়িক ভবনের স্বপ্ন, আর সেখানেই বদলে গেল জীবনের লক্ষ্য

নাজমুল হক ভূঁইয়ার জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি শুরু হয় ঢাকার বর্তমান ৩৩৯, পূর্ব গোড়ান, খিলগাঁও এলাকার একটি জায়গাকে ঘিরে। সেখানে তিনি একটি বহুতল ব্যবসায়িক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। নিচের দুই তলায় মার্কেট, তৃতীয় তলায় সিনেমা হল এবং ওপরের তলাগুলোতে আবাসিক ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনাও ছিল। সেই ভবন নির্মাণের জন্য ইট সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্থানে জমা রাখা হয়েছিল।

কিন্তু পরে তাঁর জীবনে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গেলে সেখানে তাঁর সাক্ষাৎ হয় তৎকালীন বিশিষ্ট মুফাসসির ও ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রহ.)-এর সঙ্গে। হজের পবিত্র পরিবেশে একজন আলেমের সান্নিধ্য লাভ তাঁর চিন্তাভাবনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে।

সেই সফরেই তিনি তাঁর দেখা একটি স্বপ্নের কথা আল্লামা সাঈদী (রহ.)-এর কাছে বর্ণনা করেন এবং স্বপ্নটির ব্যাখ্যা জানতে চান। আল্লামা সাঈদী (রহ.) স্বপ্নটির ব্যাখ্যায় বলেন — যে স্থানে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সিনেমা হল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেখানে মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার জন্যই যেন স্বপ্নের মাধ্যমে ইশারা করা হয়েছে — পার্থিব বিনোদনের পরিবর্তে সেখানে গড়ে উঠুক আল্লাহর ঘর ও দ্বীনি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান।

এই কথাগুলো তাঁর অন্তরে গভীর রেখাপাত করে। দেশে ফিরে তিনি তাঁর পূর্বপরিকল্পনা বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যবসায়িক ভবন নির্মাণের পরিবর্তে সেই স্থানেই মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে একটি বৃহৎ ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়, যেখানে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রহ.)-এর উপস্থিতিতে মসজিদ ও মাদ্রাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।

যে ইটগুলো একটি ব্যবসায়িক ভবনের ভিত্তি হওয়ার অপেক্ষায় নীরবে পড়ে ছিল, সেই ইটগুলোই পরবর্তীতে মসজিদ ও মাদ্রাসার নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই পরিবর্তনকে তাঁর জীবনের একটি বড় মোড়বদল হিসেবে দেখা যায় — ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক সাফল্যের জায়গা থেকে মানুষের জন্য একটি স্থায়ী দ্বীনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দিকে তাঁর অগ্রযাত্রা।

হাজি মসজিদ ও নাজমুল হক মদিনাতুল উলুম: দুই প্রতিষ্ঠানের গল্প

প্রতিষ্ঠিত মসজিদের নামকরণের মধ্যেও তাঁর জীবনদর্শনের ছাপ রয়েছে। ‘হাজি মসজিদ’ নামটির সঙ্গে তাঁর পবিত্র হজযাত্রার স্মৃতি জড়িয়ে আছে — যে হজের সফরে তিনি স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, যে সফর তাঁর চিন্তার গতিপথ বদলে দিয়েছিল, সেই হজের স্মৃতিই যেন চিরদিনের জন্য মসজিদের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রইল।

আর মাদ্রাসার নাম দেওয়া হয় ‘নাজমুল হক মদিনাতুল উলুম কামিল মাদ্রাসা’ — যেখানে ‘মদিনাতুল উলুম’ বা জ্ঞাননগরীর ধারণার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় জ্ঞান, চরিত্র গঠন, ইবাদত, ভ্রাতৃত্ব ও মানবকল্যাণের সমন্বিত শিক্ষা দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে — যে ভাবধারা মদিনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর গড়া সমাজের মৌলিক সৌন্দর্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনি কেবল দুটি ভবন হিসেবে দেখেননি। তাঁর দৃষ্টিতে মসজিদ ও মাদ্রাসা ছিল এমন একটি যৌথ অবকাঠামো, যেখানে ইবাদত ও জ্ঞান, আমল ও নৈতিকতা, ধর্মীয় শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ পাশাপাশি বিকশিত হবে।

আজ মসজিদের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি এবং মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষে কুরআন-হাদিসের পাঠ সেই স্বপ্নের ধারাবাহিকতারই প্রতীক হয়ে আছে। উল্লেখযোগ্য যে, হাজী সাহেবের এই দ্বীনি কর্মকাণ্ডের একান্ত সঙ্গী ছিলেন নাজমুল হক মদিনাতুল উলুম কামিল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ মরহুম শামসুল হক কাসেমী সাহেব।

শুধু অর্থ দান নয়, প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রতিটি ধাপে ছিলেন সক্রিয়

নাজমুল হক ভূঁইয়ার সমাজসেবার একটি বিশেষ দিক ছিল — তিনি শুধু অর্থ দিয়ে দায় শেষ করেননি। প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা, নির্মাণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম — সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজে যুক্ত থাকতেন।

তিনি মনে করতেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান শুধু ভবনের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে আদর্শ, নেতৃত্ব ও শিক্ষকদের যোগ্যতার ওপর। তাই শিক্ষক নিয়োগে তিনি সততা, যোগ্যতা ও নৈতিক চরিত্রকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সুপারিশ বা আর্থিক প্রভাব যেন নিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে — এই নীতিতে তিনি সবসময় অটল থাকতেন।

মাদ্রাসাকে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা

সময়ের সঙ্গে মাদ্রাসাটি ধারাবাহিকভাবে বিকশিত হতে থাকে। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃতি পাওয়ার পর দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যন্ত শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি মানবিক ও বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয়। আধুনিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে কম্পিউটার শিক্ষাও যুক্ত করা হয়।

এ ছাড়া হিফজ বিভাগ, লিল্লাহ বোর্ডিং এবং এতিম শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা কাঠামোর রূপ নেয়।

নাজমুল হক ভূঁইয়ার কাছে শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যম ছিল না — বরং আদর্শ মানুষ গঠনের উপায়। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন মানুষ তৈরি করা, যাঁদের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিকতা, দেশপ্রেম এবং মানবসেবার চেতনা থাকবে। তাই একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি চরিত্র গঠন, শৃঙ্খলা, সততা ও সামাজিক দায়িত্ববোধকেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন অভিভাবকের মতো

মাদ্রাসার শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল কেবল প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নয়। তিনি তাঁদের অনেককে পরিবারের সদস্যের মতোই দেখতেন। কোনো শিক্ষক, ছাত্র বা কর্মচারী ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক সংকটে পড়লে তিনি আন্তরিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন।

তাঁর একটি বহুল স্মরণীয় বক্তব্য ছিল — “এই মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও কর্মচারীরাই আমার সন্তান।” এই কথাটি ছিল তাঁর জীবনের বাস্তব প্রতিফলন। তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি মানুষকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো ভালোবাসতেন এবং তাদের উন্নতি ও কল্যাণে সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন।

অন্যায়ের প্রশ্নে তিনি ছিলেন দৃঢ় ও আপসহীন, কিন্তু ন্যায্য প্রয়োজনের জায়গায় ছিলেন অত্যন্ত মানবিক ও সহানুভূতিশীল। তাঁর দৃঢ়তা মানুষের মনে ভয়ের নয়, বরং আস্থার জন্ম দিত।

সমাজসেবার পরিধি ছিল আরও বিস্তৃত

মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার বাইরে তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল সাধারণ মানুষের কল্যাণ। তাঁর বিশ্বাস ছিল, অর্থ তখনই মূল্যবান, যখন তা সমাজের উন্নয়ন ও মানবসেবায় ব্যয় করা হয়। এই দর্শনই তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যকে সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহু শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন। অর্থাৎ তিনি যে অবকাঠামো তৈরি করেছিলেন, তার কার্যকর ফল কেবল তাঁর জীবদ্দশায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; পরবর্তী প্রজন্মেও তা ছড়িয়ে পড়েছে।

নৈতিকতা ও ন্যায়পরায়ণতার ওপর ছিল বিশেষ জোর

ব্যক্তিত্বের দিক থেকেও নাজমুল হক ভূঁইয়ার একটি বিশেষ পরিচয় ছিল। তিনি ছিলেন নীতিতে অবিচল, আচরণে আন্তরিক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়। সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে তিনি কখনো আপস করতেন না। প্রশাসনিক দক্ষতা, দূরদর্শিতা ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে তিনি সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। তবে তাঁর দৃঢ়তার আড়ালে ছিল এক কোমল ও মানবিক হৃদয় — অসহায় মানুষের কষ্ট তাঁকে ব্যথিত করত।

তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মর্যাদা তার সম্পদে নয়; বরং তার চরিত্র, সততা এবং সমাজের জন্য রেখে যাওয়া কল্যাণকর কর্মে নিহিত। এই দর্শন তাঁর পারিবারিক জীবন, ব্যবসা পরিচালনা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা — সব ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয়েছে।

অসুস্থতার মধ্যেও প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেকে দূরে রাখেননি

জীবনের শেষ দিকে দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন নাজমুল হক ভূঁইয়া। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের খোঁজখবর নিয়েছেন। জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল আল্লাহর দ্বীন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ।

২০০৫ সালের আগস্টে তাঁর ইন্তিকাল হয়। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবার ছাড়াও অসংখ্য ছাত্র, শিক্ষক, আলেম, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোক নেমে আসে। একজন প্রতিষ্ঠাতা, অভিভাবক ও দানশীল সমাজসেবীকে হারানোর বেদনা তখন ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর পরিসরে।

মৃত্যুর পরও থামেনি তাঁর স্বপ্ন

নাজমুল হক ভূঁইয়ার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো — তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র কন্যা, বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ডা. নাইয়ার সুলতানা নাজ এবং জামাতা আলহাজ্জ আজাদ আহমেদ পাটোয়ারী তাঁর প্রতিষ্ঠিত মসজিদ-মাদ্রাসার দায়িত্বকে নিছক উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, বরং একটি পবিত্র আমানত হিসেবে হৃদয়ে ধারণ করেছেন।

তাঁদের তত্ত্বাবধানে মসজিদ-মাদ্রাসার কার্যক্রম, দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে অব্যাহত রয়েছে। মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন সকালের নাশতার সম্পূর্ণ খরচ তাঁরা বহন করেন। মসজিদের জন্য প্রতিদিন ১ হাজার টাকা হিসেবে, অর্থাৎ বছরে ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা দানসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁরা যাবতীয় সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।

বর্তমানে আলহাজ্জ আজাদ আহমেদ পাটোয়ারী মসজিদ ও মাদ্রাসার মুতাওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ডা. নাইয়ার সুলতানা নাজ মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সম্মানিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।

এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, কোনো মানুষ দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেও তাঁর নেক নিয়ত ও কল্যাণকর কর্মের ধারা থেমে যায় না। একজন পিতা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর উত্তরসূরিরা সেই স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন — আর তখন একটি ব্যক্তিগত স্বপ্ন পরিণত হয় প্রজন্মের কল্যাণের এক স্থায়ী আমানতে।

কেন তাঁকে সদকায়ে জারিয়ার মানুষ বলা হয়

একজন মানুষের জীবন কতটা দীর্ঘ ছিল — তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর কাজ কতদিন মানুষের উপকারে আসে। নাজমুল হক ভূঁইয়ার প্রতিষ্ঠিত মসজিদে নামাজ হচ্ছে, মাদ্রাসায় ছাত্ররা পড়ছে, আবাসিক শিক্ষার্থীরা সুবিধা পাচ্ছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে — অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর উদ্যোগের সামাজিক উপকার অব্যাহত রয়েছে।

এই কারণেই তাঁর ২১তম ইন্তেকাল বার্ষিকীর আলোচনা শুধু একজন প্রয়াত ব্যক্তিকে স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি এমন একটি জীবনদর্শনের কথাও মনে করিয়ে দেয়, যেখানে সম্পদ ব্যক্তিগত ভোগের বাইরে গিয়ে শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের কল্যাণে বিনিয়োগ করা হয়।

২১তম ইন্তেকাল বার্ষিকীতে সেই স্মৃতিই ফিরে এলো

মরহুম আলহাজ্জ নাজমুল হক ভূঁইয়ার ২১তম ইন্তেকাল বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ইসালে ছওয়াব, কুরআনখানি, আলোচনা ও দোয়া মাহফিলে তাঁর এই বহুমাত্রিক জীবন ও অবদানই নতুন করে স্মরণ করা হয়।

আলোচকরা বলেন, তাঁর রেখে যাওয়া মসজিদ-মাদ্রাসা ও শিক্ষা কার্যক্রম তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্মারক। মানুষ চলে যায়, কিন্তু যদি তার রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান মানুষের জীবন বদলায়, জ্ঞান ছড়ায় এবং কল্যাণ সৃষ্টি করে, তাহলে তাঁর কর্মধারা মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে।

অনুষ্ঠানের শেষে মরহুমের রুহের মাগফিরাত, কবরের আজাব থেকে নাজাত, গুনাহসমূহের ক্ষমা এবং জান্নাতুল ফেরদাউসে উচ্চ মর্যাদা কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।

এক জীবনের সারকথা

নাজমুল হক ভূঁইয়ার জীবনকে কয়েকটি পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় — বীর মুক্তিযোদ্ধা, সফল ব্যবসায়ী, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, দ্বীনের খাদেম এবং একজন দূরদর্শী প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তরাধিকার হয়তো অন্য জায়গায় — তিনি এমন কিছু রেখে গেছেন, যা তাঁর মৃত্যুর ২১ বছর পরও মানুষের কাজে লাগছে।

একসময় যে জায়গায় মার্কেট ও সিনেমা হল নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল, সেখানে আজ মসজিদে আজান হয় এবং মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে জ্ঞানচর্চার ধ্বনি শোনা যায়। সেই পরিবর্তনই যেন তাঁর জীবনদর্শনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি — নিজের জন্য যা নির্মাণ করা যায়, তার চেয়ে মানুষের জন্য যা রেখে যাওয়া যায়, তার মূল্য অনেক বেশি।

মহান আল্লাহ তাআলা মরহুম আলহাজ্জ নাজমুল হক ভূঁইয়ার সব নেক আমল কবুল করুন, তাঁর কবরকে জান্নাতের বাগিচাসমূহের একটি বাগিচায় পরিণত করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসে উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন।


এক নজরে নাজমুল হক ভূঁইয়া

তথ্যবিবরণ
নামমরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্জ নাজমুল হক ভূঁইয়া
জন্মস্থানবাঘুন গ্রাম, কালীগঞ্জ, গাজীপুর
পিতামরহুম বজলুল হক ভূঁইয়া
পরিচয়ব্যবসায়ী, মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী ও দ্বীনের খাদেম
মুক্তিযুদ্ধ১৯৭১ সালে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ
প্রধান অবদানহাজি মসজিদ ও নাজমুল হক মদিনাতুল উলুম কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা
মাদ্রাসার কার্যক্রমদাখিল, আলিম, ফাজিল, কামিল; মানবিক, বিজ্ঞান ও কম্পিউটার শিক্ষা; হিফজ, লিল্লাহ বোর্ডিং ও এতিম শিক্ষার্থীদের আবাসন
মৃত্যুআগস্ট ২০০৫
মৃত্যুবার্ষিকী২১তম
উত্তরসূরিকন্যা ডা. নাইয়ার সুলতানা নাজ (গভর্নিং বডির সভাপতি), জামাতা আলহাজ্জ আজাদ আহমেদ পাটোয়ারী (মুতাওয়াল্লি)

তথ্যসূত্র: মরহুম আলহাজ্জ নাজমুল হক ভূঁইয়ার জীবন ও কর্ম নিয়ে সংরক্ষিত স্মারকগ্রন্থ, পরিবার ও প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট তথ্য

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments