রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে বেসরকারি খাতকে জ্বালানি আমদানির দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন একটাই—এটি কি প্রতিযোগিতার সংস্কার, নাকি রাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পদ নতুন কোনো করপোরেট শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার আয়োজন?
মাত্র চার দিন।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার মতো একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য কি চার দিন যথেষ্ট?
রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদগুলোর একটি—পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি, সংরক্ষণ, বিতরণ ও বিপণনের কাঠামো বদলানোর আগে যেখানে মাসের পর মাস বিশেষজ্ঞ মতামত, বাজার বিশ্লেষণ, জাতীয় নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা, সেখানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (BPC) চার দিনের মধ্যে খসড়া নীতি তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আর ঠিক সেই সময়েই BPC চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এটি নিছক প্রশাসনিক রদবদল—এমন দাবি করা যেতেই পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঘটনাগুলো একই সময়ে কেন ঘটল?
আরও বড় প্রশ্ন—কে লাভবান হবে?
একজন চেয়ারম্যান ‘না’ বললেন, চার দিন পর রাষ্ট্রের নীতি বদলাবে?
প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে, বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ও বাজারজাতকরণের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের মধ্যেই BPC চেয়ারম্যানকে OSD করা হয়।
যদি তার সঙ্গে নীতিগত মতপার্থক্য না-ও থাকে, তাহলেও সরকারের উচিত বিষয়টি পরিষ্কার করা।
কারণ এখানে প্রশ্ন কোনো ব্যক্তির চাকরি নিয়ে নয়।
প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের জ্বালানি নীতি কি কোনো একজন কর্মকর্তার সম্মতি-অসম্মতির সঙ্গে এতটাই যুক্ত হয়ে পড়েছিল যে তাকে সরানোর পর চার দিনের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে হবে?
যদি না হয়ে থাকে, সরকার প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা দিক।
আর যদি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন আরও গুরুতর।
কার জন্য খুলছে দরজা?
এই মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানির বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির প্রস্তাব।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবে রয়েছে—
১৫–২০ লাখ টন ডিজেল,
২ লাখ টন অকটেন,
১.৫ লাখ টন পেট্রল
এবং ৮–১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল।
অর্থাৎ সম্ভাব্য পরিমাণ প্রায় ৩৩.৫ লাখ টন।
এখন একটু হিসাব করুন।
বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে এত বিশাল পরিমাণ পণ্য আমদানির সক্ষমতা যদি একটি বা অল্প কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়, তাহলে সেটিকে কি নিছক “বাজার উন্মুক্তকরণ” বলা যাবে?
নাকি এটি হবে বাজারের ক্ষমতার পুনর্বণ্টন?
রাষ্ট্রের BPC যাবে কোথায়?
দশকের পর দশক BPC দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান।
আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ হলো—BPC।
দাম বাড়ল—BPC।
জাহাজ আটকে গেল—BPC।
দেশে সংকট দেখা দিল—BPC।
কৃষকের ডিজেল দরকার—রাষ্ট্র।
পরিবহন খাতের জ্বালানি দরকার—রাষ্ট্র।
অর্থাৎ লাভের সময় বাজার, আর সংকটের সময় রাষ্ট্র—এমন ব্যবস্থা হলে সেটি কোনো সংস্কার নয়।
এটি হবে লাভ বেসরকারির, দায় রাষ্ট্রের।
এমন মডেল জনগণের জন্য কতটা নিরাপদ?
LPG-এর অভিজ্ঞতা কি আমরা ভুলে গেছি?
বাংলাদেশে LPG বাজার বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করার পর আমরা দেখেছি, কাগজে-কলমে বহু কোম্পানি থাকলেও বাস্তব বাজারে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কতটা শক্তিশালী হতে পারে।
BERC দাম নির্ধারণ করে।
কিন্তু বাজারে সেই দাম কতটা কার্যকরভাবে মানা হয়—সেটি নিয়ে বছরের পর বছর অভিযোগ রয়েছে।
তাহলে ডিজেল-পেট্রল-অকটেনের মতো জাতীয় অর্থনীতির প্রাণরস যদি একই ধরনের বাজার কাঠামোর দিকে যায়, তখন কী হবে?
একটি ট্রাকের ভাড়া বাড়বে।
তারপর বাড়বে সবজির দাম।
বাড়বে কৃষকের সেচ খরচ।
বাড়বে কারখানার উৎপাদন ব্যয়।
বাড়বে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ।
জ্বালানি বাজারের ভুল সিদ্ধান্তের বিল শেষ পর্যন্ত দেয় সাধারণ মানুষ।
বসুন্ধরার ইতিহাসও কি খতিয়ে দেখা হবে?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।
কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করেছে—এটি নিজেই অপরাধ নয়।
বরং বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
কিন্তু যখন কোনো প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে বিটুমিন, জ্বালানি উৎপাদন, petroleum products এবং এখন বিপুল পরিমাণ refined fuel import-এর দিকে এগোয়, তখন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রশ্ন করা—
বাজারে তার মোট নিয়ন্ত্রণ কতটা হবে?
প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো কি সমান সুযোগ পাবে?
নাকি এক খাত থেকে আরেক খাতে বিস্তৃত হয়ে একটি vertically integrated corporate power তৈরি হবে?
আর যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে মূল্য নির্ধারণে তার প্রভাব কতটা হবে?
এই প্রশ্নগুলো করা কোনো কোম্পানিবিরোধী অবস্থান নয়।
এটাই জনস্বার্থের সাংবাদিকতা।
‘প্রতিযোগিতা’ শব্দটি সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত হতে পারে
সরকার বলছে—বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো হবে।
চমৎকার।
কিন্তু প্রতিযোগিতা মানে শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া নয়।
প্রতিযোগিতা মানে—
সমান সুযোগ।
স্বচ্ছ লাইসেন্সিং।
একচেটিয়া বাজার ঠেকানো।
মূল্য কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।
কৌশলগত মজুত বাধ্যতামূলক করা।
সংকটকালে সরবরাহ অব্যাহত রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে এত বড় হতে না দেওয়া, যাতে রাষ্ট্রকেই তার সঙ্গে বসে দর-কষাকষি করতে হয়।
যুদ্ধ হলে তেল দেবে কে?
এই প্রশ্নটির উত্তর সরকারের কাছে এখনই চাই।
ধরা যাক—
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ হলো।
তেলের দাম আকাশচুম্বী।
আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে গেল।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিপুল লোকসানের আশঙ্কায় আমদানি কমিয়ে দিল।
তখন কী হবে?
সরকার কি তাকে বাধ্য করতে পারবে?
আর যদি বাধ্য করে, ক্ষতিপূরণ দেবে কে?
আর যদি সে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়?
তখন BPC কি এক রাতের মধ্যে আগের কাঠামো ফিরিয়ে আনতে পারবে?
জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো PowerPoint presentation নয়।
এটি সংকটের সময় পরীক্ষিত হয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন: ‘কার জন্য’ এই তাড়াহুড়া?
সরকার যদি মনে করে বেসরকারি আমদানি বাংলাদেশের জন্য ভালো—আমরা বলি, করুন।
কিন্তু তাড়াহুড়া করবেন না।
প্রথমে নীতিটি প্রকাশ করুন।
সব প্রতিষ্ঠানের আবেদন প্রকাশ করুন।
যোগ্যতার মানদণ্ড প্রকাশ করুন।
আমদানি সক্ষমতা প্রকাশ করুন।
মজুত সক্ষমতা প্রকাশ করুন।
প্রস্তাবিত বাজার অংশীদারিত্ব প্রকাশ করুন।
মূল্য নির্ধারণের কাঠামো প্রকাশ করুন।
সংকটকালীন সরবরাহের বাধ্যবাধকতা প্রকাশ করুন।
তারপর জনগণকে বলুন—
কেন এই প্রতিষ্ঠান? কেন এই পরিমাণ? কেন এখন?
আর যদি চার দিনেই সব ঠিক হয়ে যায়?
তাহলে সন্দেহ আরও বাড়বে।
কারণ রাষ্ট্রের একটি কৌশলগত খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে যদি চার দিনই যথেষ্ট হয়, তাহলে গত কয়েক দশক ধরে আমরা কী করছিলাম?
আর যদি চার দিন যথেষ্ট না হয়, তাহলে চার দিনের সময়সীমা কেন?
এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আমরা বেসরকারি বিনিয়োগের বিরুদ্ধে নই
এই জায়গাটিও স্পষ্ট থাকা দরকার।
TODAY TV BD কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার পক্ষে নয়।
আমরা বরং চাই—
আরও প্রতিষ্ঠান আসুক।
আরও বিনিয়োগ আসুক।
আরও প্রতিযোগিতা হোক।
BPC আরও দক্ষ হোক।
কিন্তু আমরা চাই না—
রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার জায়গায় করপোরেট একচেটিয়া বসুক।
কারণ একজন রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রকের জবাবদিহি অন্তত সংসদ, আদালত ও জনগণের কাছে আছে।
কিন্তু একটি শক্তিশালী বেসরকারি গোষ্ঠী যদি বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে, তখন তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা আরও কঠিন হতে পারে।
শেষ কথা: তেলের চাবি কার হাতে থাকবে?
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত নিয়ে এখন যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেটি কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়।
এটি আগামী দিনের অর্থনীতি নির্ধারণ করতে পারে।
কৃষকের খরচ নির্ধারণ করতে পারে।
পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ করতে পারে।
শিল্পের উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করতে পারে।
এমনকি জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই প্রশ্নটি সরল—
রাষ্ট্র কি জ্বালানি বাজারে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা রাখবে, নাকি ধীরে ধীরে নিজেই বাজারের প্রান্তিক খেলোয়াড়ে পরিণত হবে?
আর যদি উত্তর হয়—বাজার বেসরকারি খাতে যাবে, তাহলে আরেকটি প্রশ্নের উত্তরও এখনই দিতে হবে—
বাজার কি সত্যিই সবার জন্য উন্মুক্ত হবে, নাকি কয়েকটি শক্তিশালী করপোরেট গোষ্ঠীর জন্য?
চার দিনে একটি নীতির খসড়া হতে পারে।
কিন্তু চার দিনে একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না।
রাষ্ট্রের তেলের চাবি কার হাতে উঠছে—এই প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার আছে।
কারণ তেল কোনো ব্যক্তির সম্পদ নয়।
তেল বাংলাদেশের অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন।
এবং সেই রক্তসঞ্চালনের নিয়ন্ত্রণ যদি বদলাতেই হয়—
তা হতে হবে প্রকাশ্যে, প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে এবং জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে।




