জন্ম: যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা ও দুর্বল এক শিশুর আগমন
১৬৪২ সালের ২৫ ডিসেম্বর (বর্তমান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৬৪৩ সালের ৪ জানুয়ারি), ইংল্যান্ডের লিংকনশায়ারের উলস্টর্প নামের ছোট্ট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আইজ্যাক নিউটন।
তাঁর জন্মের আগেই বাবা মারা যান।
তিনি এতটাই দুর্বল ও ক্ষীণকায় ছিলেন যে পরিবার মনে করেছিল শিশুটি হয়তো বেশিদিন বাঁচবে না।
মা হান্না আইসকাফ পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং ছোট নিউটনকে দাদা-দাদির কাছে রেখে যান।
এই বিচ্ছেদ তাঁর শৈশবের মানসিক জগতে গভীর প্রভাব ফেলে।
পরে নিউটন নিজের ব্যক্তিগত নোটে লিখেছিলেন যে তিনি কখনো কখনো মায়ের নতুন পরিবারকে ঘৃণা করতেন।
শৈশবের এই নিঃসঙ্গতা হয়তো তাঁকে আরও অন্তর্মুখী করে তুলেছিল।
শৈশব: খেলনা নয়, যন্ত্র বানাতেন
অন্য শিশুরা যখন খেলত, নিউটন তখন নিজের হাতে যন্ত্র বানাতেন।
তিনি তৈরি করেছিলেন—
• ছোট বায়ুচালিত কল
• সূর্যঘড়ি
• যান্ত্রিক খেলনা
• পানিচালিত মডেল
শুরু থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল জিনিসের ভেতরের নিয়ম বোঝার প্রবল কৌতূহল।
একজন প্রতিবেশী পরে বলেছিলেন—
“ও শুধু জিনিস দেখত না; ও বুঝতে চাইত, জিনিস কেন কাজ করে।”
শিক্ষা: নীরব ছাত্র থেকে অসাধারণ মেধা
নিউটন ভর্তি হন গ্রানথামের কিংস স্কুলে।
প্রথম দিকে তিনি খুব উজ্জ্বল ছাত্র ছিলেন না।
কিন্তু এক সহপাঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা তাঁর মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন আনে।
তিনি পড়াশোনায় এত মনোযোগ দেন যে দ্রুত শ্রেণির সেরা ছাত্র হয়ে ওঠেন।
১৬৬১ সালে তিনি ভর্তি হন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত Cambridge University-এর Trinity College-এ।
তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম এখনো অনেকটা প্রাচীন চিন্তায় আটকে ছিল।
কিন্তু নিউটন নিজে নিজে পড়তে শুরু করেন—
• ইউক্লিড
• গ্যালিলিও
• ডেকার্ত
• কেপলার
তিনি শুধু বই পড়তেন না; বইয়ের ধারণাকে চ্যালেঞ্জও করতেন।
প্লেগের বছর: নিঃসঙ্গতা থেকে জন্ম নেয় বিপ্লব
১৬৬৫ সালে ইংল্যান্ডে ভয়াবহ প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়।
নিউটন বাড়িতে ফিরে যান।
এই সময়টিকে বলা হয় তাঁর “Annus Mirabilis” বা অলৌকিক সময়।
মাত্র দুই বছরে তিনি এমন ধারণা নিয়ে কাজ করেন যা ভবিষ্যতের বিজ্ঞানকে বদলে দেয়।
এই সময়েই তিনি ভাবতে শুরু করেন—
• গতির নিয়ম
• মহাকর্ষ
• ক্যালকুলাস
• আলোর প্রকৃতি
অনেকেই বলেন, মানব ইতিহাসে কোনো ব্যক্তির সবচেয়ে উৎপাদনশীল একাকী সময়গুলোর একটি ছিল এটি।
আপেলের গল্প: কিংবদন্তি বনাম বাস্তবতা
বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্প—
নিউটনের মাথায় আপেল পড়েছিল এবং তিনি মহাকর্ষ আবিষ্কার করেছিলেন।
বাস্তব ঘটনা কিছুটা ভিন্ন।
নিউটন নিজেই পরে বলেছিলেন, তিনি একটি আপেল গাছ থেকে ফল পড়তে দেখে চিন্তা করেছিলেন—
“আপেল সবসময় সোজা নিচেই পড়ে কেন?”
এই সাধারণ প্রশ্ন থেকেই তাঁর মাথায় আসে পৃথিবীর আকর্ষণ শক্তির ধারণা।
পরে সেই চিন্তা বিস্তৃত হয়ে চাঁদ, গ্রহ এবং মহাবিশ্ব পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

মহাকর্ষ: মহাবিশ্বের অদৃশ্য বন্ধন
১৬৮৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত বই Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica।
এখানে তিনি মহাকর্ষের ধারণা ব্যাখ্যা করেন।
এই ধারণা মানুষের কাছে বিপ্লবের মতো ছিল।
তিনি দেখালেন—
যে শক্তি পৃথিবীতে আপেলকে নিচে টানে, সেই একই শক্তি চাঁদকে পৃথিবীর চারপাশে ঘোরায়।
প্রথমবারের মতো আকাশ ও পৃথিবীর নিয়ম একই সূত্রে ব্যাখ্যা করা হলো।
গতির তিন সূত্র: আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি
নিউটনের আরেকটি অসাধারণ অবদান ছিল গতির তিনটি সূত্র।
প্রথম সূত্র—
কোনো বস্তু স্থির থাকলে স্থির থাকবে, চললে চলতেই থাকবে।
দ্বিতীয় সূত্র—
তৃতীয় সূত্র—
প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
আজকের গাড়ি, বিমান, রকেট—সবকিছুর ভিত্তিতে এই ধারণাগুলো কাজ করছে।
আলো ও রঙ: সাদা আলো যে আসলে সাদা নয়
নিউটন একটি প্রিজম নিয়ে পরীক্ষা করেন।
তিনি দেখান—
সাদা আলো আসলে একক কিছু নয়।
এটি নানা রঙের সমষ্টি।
রংধনুর রঙগুলো আলোর মধ্যেই লুকানো থাকে।
তাঁর এই আবিষ্কার আধুনিক অপটিক্সের ভিত্তি তৈরি করে।
ক্যালকুলাস নিয়ে যুদ্ধ
নিউটন গণিতের নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন—
ক্যালকুলাস।
কিন্তু জার্মান গণিতবিদ গটফ্রিড লাইবনিজও প্রায় একই সময়ে একই ধারণা দেন।
এরপর শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম তিক্ত বৈজ্ঞানিক বিতর্ক।
দুই পক্ষই একে অন্যকে ধারণা চুরির অভিযোগ করে।
আজ ইতিহাসবিদদের বেশিরভাগের মত—
দুজনই স্বাধীনভাবে ক্যালকুলাস উদ্ভাবন করেছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবন: প্রতিভা, একাকীত্ব ও অদ্ভুত অভ্যাস
নিউটন কখনো বিয়ে করেননি।
তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিল খুব কম।
তিনি প্রায়ই দিনের পর দিন খাবার ভুলে যেতেন।
গবেষণায় ডুবে থাকলে বাইরের পৃথিবী যেন তাঁর কাছে অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলত।
তবে আরেকটি দিক ছিল অনেক কম পরিচিত।
তিনি ধর্মতত্ত্ব, বাইবেলের গোপন ব্যাখ্যা এবং আলকেমি নিয়েও বিপুল সময় ব্যয় করেছিলেন।
আধুনিক বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখেন—
নিউটনের লেখা কাগজের বিশাল অংশ পদার্থবিজ্ঞান নয়, ধর্ম ও গুপ্তবিদ্যা নিয়ে।
ক্ষমতা ও শেষ জীবন
১৭০৩ সালে তিনি হন Royal Society-এর সভাপতি।
পরে ইংল্যান্ডের Royal Mint-এর প্রধান হন।
তিনি জাল মুদ্রা নির্মাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন।
১৭০৫ সালে ব্রিটিশ রানি তাঁকে “Sir” উপাধি দেন।
বিজ্ঞানী হিসেবে নাইট উপাধি পাওয়া প্রথমদের মধ্যে ছিলেন তিনি।
১৭২৭ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁকে সমাহিত করা হয় ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে—যেখানে ইংল্যান্ডের রাজা ও জাতীয় বীরদের কবর দেওয়া হয়।

উত্তরাধিকার: যে মানুষ মহাবিশ্বকে যন্ত্রের মতো ব্যাখ্যা করেছিলেন
আইজ্যাক নিউটন শুধু নতুন সূত্র দেননি।
তিনি বিশ্বকে নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছেন।
তাঁর আগে মানুষ প্রকৃতিকে রহস্য হিসেবে দেখত।
নিউটনের পরে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে—
মহাবিশ্ব নিয়ম মেনে চলে, আর সেই নিয়মকে মানুষ আবিষ্কার করতে পারে।
তিনি একবার বলেছিলেন—
“আমি যদি অন্যদের চেয়ে বেশি দূর দেখতে পেয়ে থাকি, তবে তা দৈত্যদের কাঁধে দাঁড়িয়ে।”
কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস হলো—পরে অসংখ্য মানুষ আবার দাঁড়িয়েছে নিউটনের কাঁধের ওপর।



