যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তেজনা তীব্র; হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও কূটনীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | TODAY TV BD
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার পর উভয় পক্ষের সামরিক পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—এই সংঘাতের শেষ কোথায় এবং হরমুজের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে?
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বর্তমান সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শুধু সামরিক শক্তি নয়; বরং বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা।
কেন আবার উত্তেজনা?
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বেড়ে যায়। এর পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একাধিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা (MoU) স্বাক্ষরিত হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেটিকে কার্যত অকার্যকর বলে ঘোষণা করেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক
সাম্প্রতিক বক্তব্যে ট্রাম্প প্রথমে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং জাহাজ থেকে টোল আদায়ের কথা বলেছিলেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়। পরে তিনি আবার জানান, যুক্তরাষ্ট্র টোল আদায় করবে না।
এই অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন। তবে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে এই নীতিগত পরিবর্তনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি।
হরমুজের বাস্তব পরিস্থিতি
ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক জাহাজ বিকল্প রুট ব্যবহার করছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে যাতায়াত বিলম্বিত হচ্ছে।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন মূল্যায়ন
পশ্চিমা কিছু বিশ্লেষণে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্যের দাবি করা হলেও, অন্য কিছু পর্যবেক্ষক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছেন।
এনবিসি নিউজের আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা রিচার্ড এঙ্গেল সম্প্রতি ইরান সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, তাঁর পর্যবেক্ষণে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষের মধ্যে জাতীয় ঐক্যের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা এখনো কঠিন।
কে জিতবে হরমুজের লড়াই?
এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনো নেই।
মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে—
- যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল অব্যাহত রাখা।
- ইরান হরমুজকে নিজের অন্যতম প্রধান কৌশলগত চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে।
- দীর্ঘমেয়াদি সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা উভয় পক্ষের জন্যই অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল হতে পারে।
কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, সামরিক বিজয়ের পরিবর্তে এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতার দিকেই যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মত
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পেপ সাম্প্রতিক এক আলোচনায় বলেন, বড় শক্তিগুলো কখনও কখনও সম্ভাব্য ঝুঁকি জেনেও এমন পথে এগিয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত তাদের জন্যও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক কর্নেল ডগলাস ম্যাকগ্রেগর মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে হরমুজে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাস্তবিক অর্থে কঠিন হতে পারে।
তবে এসবই সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন; এগুলোকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দেখা উচিত নয়।
সামনে কী?
বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—
- হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়।
- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নতুন করে আলোচনায় ফিরতে পারে কি না।
- উপসাগরীয় আরব দেশগুলো উত্তেজনা প্রশমনে কী ভূমিকা রাখে।
- সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে কতটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।



