আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। টানা ষষ্ঠ রাতের মতো ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পাল্টা জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে আবারও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন।
এই নতুন সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও নতুন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
টানা ষষ্ঠ রাতের মার্কিন হামলা
মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা আরও দুর্বল করার লক্ষ্যে নতুন করে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্য ছিল—
- কেশম দ্বীপের সামরিক স্থাপনা
- বন্দর আব্বাসের আশপাশের নৌঘাঁটি
- ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-এর বিভিন্ন অবকাঠামো
- উপকূলীয় রাডার ও নজরদারি কেন্দ্র
- আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
- সামরিক লজিস্টিক ও নৌ সক্ষমতা
মার্কিন বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও যুদ্ধজাহাজ থেকে পরিচালিত এই অভিযানে ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
পাল্টা জবাবে উপসাগরে ইরানের হামলা
মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় তেহরান।
ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবি—
- বাহরাইনে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা
- কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- জর্ডানের একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করা
- সিরিয়ায় প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ অপারেশন কমান্ড সেন্টারে হামলা
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও দাবি করেছে, ওমান উপকূলের একটি মার্কিন রাডার ব্যবস্থা এবং সালামেহ রকস এলাকার নৌ-রাডারও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
অন্যদিকে কাতারের রাজধানী দোহায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিস্ফোরণে উড়ে আসা ধাতব টুকরোতে এক শিশু আহত হয়েছে।
ইরানের ভেতরে হতাহত ও অবকাঠামো ক্ষতি
ইরানি গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন হামলায়—
- পাঁচটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
- বন্দর খামিরের রেলস্টেশন লক্ষ্যবস্তু হয়েছে
- ইরানশাহর বিমানবন্দরেও হামলা হয়েছে
- দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর খামিরে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন
তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে আবারও কার্যত অচল নৌপরিবহন
সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালিতে।
ইরান আবারও প্রণালিতে কার্যত অবরোধ আরোপ করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর সামরিক চাপ বাড়িয়েছে।
ফলে—
- আন্তর্জাতিক তেলবাহী জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে
- বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে
- অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে দীর্ঘমেয়াদি সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাব আল-মান্দেবেও উত্তেজনার আশঙ্কা
রয়টার্সের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অবকাঠামোতে আরও বড় ধরনের হামলা চালায়, তবে ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুতি গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও নৌ চলাচল ব্যাহত করার পদক্ষেপ নিতে পারে তেহরান।
এটি বাস্তবায়িত হলে লোহিত সাগর হয়ে ইউরোপ-এশিয়ার বাণিজ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ওয়াশিংটনের অবস্থান
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন,
“প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলতে দেবেন না এবং ইরানকে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে।”
তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ
পর্যবেক্ষকদের মতে, গত মাসের যুদ্ধবিরতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। নতুন এই পাল্টাপাল্টি হামলা সেই সমঝোতাকে কার্যত অকার্যকর করে দিয়েছে।
এখন সংঘাত সীমিত পর্যায়ে থাকবে, নাকি আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেবে—সেটিই বড় প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারও গভীর সংকটে পড়তে পারে।
সংক্ষেপে
- যুক্তরাষ্ট্র টানা ষষ্ঠ রাত ইরানে হামলা চালিয়েছে।
- পাল্টা বাহরাইন, কুয়েতসহ উপসাগরীয় মার্কিন স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে ইরান।
- হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল আবারও কার্যত স্থবির।
- তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে।
- বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
- যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় সংঘাতের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই প্রতিবেদনটি নিরপেক্ষ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মান বজায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। এতে যাচাইযোগ্য তথ্যকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং যেসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, সেগুলো স্পষ্টভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।



