Homeটুডে হেলথডেঙ্গুতে এক দিনে রেকর্ড ৯ মৃত্যু, ১ হাজার ৫৭১ হাসপাতালে

ডেঙ্গুতে এক দিনে রেকর্ড ৯ মৃত্যু, ১ হাজার ৫৭১ হাসপাতালে

এ বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক মৃত্যু ও রোগী; মোট মৃত্যু ১৩০, আক্রান্ত ৪৫ হাজার ৪৭৫—শনিবার থেকে তিন মাসের বিশেষ অভিযান

ঢাকা | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত রোগটিতে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১ হাজার ৫৭১ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এটাই এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা। নতুন মৃত্যুর পর ১ জানুয়ারি থেকে দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩০ এবং আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ হাজার ৪৭৫।

একই সময়ে দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ৩ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী।

এক দিনে নয়জনের মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া নয়জনের মধ্যে তিনজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়, দুজন খুলনা বিভাগে, দুজন ঢাকা বিভাগের অন্যান্য এলাকায় এবং বরিশাল ও ময়মনসিংহে একজন করে মারা গেছেন।

অর্থাৎ সংক্রমণ এখন শুধু রাজধানী বা ঢাকা মহানগরীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই রোগীর চাপ বাড়ছে।

হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৫৭১

নতুন ১ হাজার ৫৭১ রোগীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে।

ঢাকা বিভাগে ৪০৮ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৩৪ জন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৯৬ জন ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ১৭৭, বরিশালে ১৫৭, খুলনায় ২৪২, ময়মনসিংহে ৭৭, রাজশাহীতে ১১৬, রংপুরে ৭১ এবং সিলেটে আটজন ভর্তি হয়েছেন।

এই বিস্তৃতি দেখাচ্ছে, ডেঙ্গু এখন জাতীয় পর্যায়ের জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, বৃষ্টি ও তাপমাত্রার বর্তমান পরিস্থিতি এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল।

ফলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও রোগীর সংখ্যা বেশি থাকতে পারে।

এর অর্থ হলো, শুধু এক দিনের রেকর্ড দেখেই পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছে বলা যাবে না। সামনে আরও কয়েক সপ্তাহ সংক্রমণ বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এবার ডেঙ্গুর চিত্র কেন আলাদা?

গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের একটি বড় পরিবর্তন হলো—সংক্রমণ রাজধানীর বাইরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

ঢাকায় হাসপাতালে শয্যা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘদিন ধরেই চাপ রয়েছে। এখন জেলা শহর ও আঞ্চলিক হাসপাতালগুলোতেও রোগী বাড়তে থাকায় দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর দ্বৈত চাপ তৈরি হয়েছে।

তার সঙ্গে চলছে হাম প্রাদুর্ভাব।

একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গু

বাংলাদেশ এখন একই সময়ে দুইটি বড় সংক্রামক রোগ মোকাবিলা করছে।

হাম মূলত শিশুদের বড় অংশকে আক্রান্ত করছে। অন্যদিকে ডেঙ্গুতে সব বয়সের মানুষ আক্রান্ত হলেও গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।

একই হাসপাতালে যদি দুই রোগের রোগী একসঙ্গে বাড়তে থাকে, তাহলে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ এবং জরুরি সেবার ওপর চাপ দ্রুত বাড়তে পারে।

সরকারের তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচি

ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে সরকার আগামী তিন মাস দেশব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শনিবার এই বিশেষ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

কর্মসূচির লক্ষ্য হলো এডিস মশার বংশবিস্তারস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং মানুষকে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণে উৎসাহিত করা।

শুধু ফগিং দিয়ে কি কাজ হবে?

বিশেষজ্ঞরা বারবার বলে আসছেন, শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

এডিস মশা মানুষের ঘরবাড়ির ভেতর ও আশপাশে ছোট ছোট পানির পাত্রে ডিম পাড়তে পারে।

ফলে বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত বোতল, নির্মাণস্থলের পানি, ড্রেন ও বিভিন্ন পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার না করলে মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা কঠিন।

📊 ডেঙ্গুর সর্বশেষ চিত্র

  • গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু:
  • গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন হাসপাতালে ভর্তি: ১,৫৭১
  • ২০২৬ সালে মোট মৃত্যু: ১৩০
  • মোট আক্রান্ত: ৪৫,৪৭৫
  • বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন: ৩,২১৮
  • বিশেষ দেশব্যাপী কর্মসূচি: ৩ মাস

পরিবারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরও বিপদ কেটে যায় না। অনেক গুরুতর জটিলতা জ্বর কমার পর দেখা দিতে পারে।

তাই জ্বরের সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা, বমি, রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

এখন আসল পরীক্ষা কোথায়?

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের নতুন কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে শুধু প্রচারণায় নয়, বাস্তবে মশার প্রজননস্থল কতটা ধ্বংস করা হচ্ছে তার ওপর।

সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে যদি রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করে, তাহলে অভিযান কার্যকর হচ্ছে বলা যাবে। আর যদি সংখ্যা বাড়তেই থাকে, তাহলে প্রচলিত মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে আরও কঠোর পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন হবে।

তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), BSS, The Daily Star, Reuters

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments