টিকাদানে ঘাটতির ধাক্কায় রেকর্ড প্রাদুর্ভাব; ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহজনক কেস, হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে শিশু রোগীর চাপ
ঢাকা | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একসময় হাম নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে লড়ছে। মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হাম ও হামসদৃশ অসুস্থতায় ৯৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহজনক কেস শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা। টিকাদানের ঘাটতি, হাসপাতালের ওপর বাড়তি চাপ এবং ডেঙ্গুর সমান্তরাল প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত ঘটে। এর সঙ্গে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যাও যুক্ত হয়। ফলে বেশ কিছু এলাকায় শিশুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে
স্বাস্থ্যকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এই বয়সী শিশুদের অনেকেরই নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কোনো একটি বা একাধিক ডোজ বাদ পড়েছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একটি জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ রাখতে সাধারণত প্রায় ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে এই মাত্রার কাছাকাছি কভারেজ ধরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যাঘাতে সেই সুরক্ষা দুর্বল হয়েছে।
কোথায় ভাঙল টিকাদানের ধারাবাহিকতা?
কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বজুড়েই নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় আরও সমস্যা তৈরি হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা সংগ্রহেও কিছু সমস্যা দেখা দেয়। ফলে কিছু এলাকায় প্রয়োজনীয় টিকা সময়মতো পৌঁছায়নি।
এর ফল এখন দেখা যাচ্ছে।
যেসব শিশু সময়মতো টিকা পায়নি, তাদের একটি বড় অংশ এখন হাম ভাইরাসের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হচ্ছে।
জরুরি টিকাদান কর্মসূচি কতটা সফল?
সরকার এপ্রিল থেকে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরুরি ক্যাম্পেইন চালালেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না।
পুরোনো টিকাদান ঘাটতি পূরণ, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করা এবং নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি।
কারণ বর্তমান প্রাদুর্ভাব কমলেও টিকাবঞ্চিত শিশুর একটি বড় জনগোষ্ঠী থাকলে ভবিষ্যতে আবারও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হাসপাতালগুলোও চাপে
হাম সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে হাসপাতালগুলোতে।
ঢাকা ও বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ বাড়ছে। অনেক স্বাস্থ্যকর্মী একই সময়ে হাম ও ডেঙ্গু—দুই ধরনের রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছেন।
হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা এবং মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
টিকার ঘাটতির সঙ্গে তথ্যের ঘাটতিও আছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোন এলাকায় কত শিশু টিকার বাইরে রয়েছে তার নির্ভুল তথ্য ছাড়া কার্যকর ‘catch-up vaccination’ চালানো কঠিন।
একটি এলাকার সামগ্রিক টিকাদান হার ৯০ শতাংশের বেশি হলেও যদি নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কভারেজ অনেক কম থাকে, তাহলে সেখান থেকেই নতুন সংক্রমণের ক্লাস্টার তৈরি হতে পারে।
এই কারণে জাতীয় গড়ের পাশাপাশি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সব ৯৯৯ মৃত্যু কি নিশ্চিত হাম?
না।
৯৯৯ সংখ্যাটি নিশ্চিত ও সন্দেহজনক হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সম্মিলিত হিসাব। ফলে এই সংখ্যার প্রতিটি মৃত্যুকে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু হিসেবে বলা যাবে না।
একইভাবে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহজনক কেসের সবগুলোও নিশ্চিত হাম কেস নয়।
সংবাদ প্রকাশে এই পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি, যাতে জনমনে রোগটির প্রকৃত বিস্তার নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।
📊 হাম পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- হাম ও হামসদৃশ রোগে মোট মৃত্যু: ৯৯৯
- সন্দেহজনক কেস: ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি
- আক্রান্তদের প্রায়: ৮০% পাঁচ বছরের কম বয়সী
- জরুরি টিকাদানে টিকা পেয়েছে: ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশু
- জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু: এপ্রিল ২০২৬
- বড় সমস্যা: নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি ও হাসপাতালের চাপ
সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ
এখন সবচেয়ে বড় কাজ শুধু নতুন রোগী চিকিৎসা করা নয়; বরং রোগের সংক্রমণ চক্র ভাঙা।
টিকাদানে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা, নিয়মিত টিকাদান পুরোপুরি সচল রাখা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ অতীতে হাম নিয়ন্ত্রণে বড় সাফল্য দেখিয়েছে। বর্তমান প্রাদুর্ভাব সেই অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিয়েছে। এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত—জরুরি অভিযান শেষ হওয়ার পরও টিকাদানের ধারাবাহিকতা যেন আর কখনো ভেঙে না পড়ে।
তথ্যসূত্র: Reuters, Associated Press, WHO, UNICEF, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর




