ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে হরমুজে জাহাজ চলাচল এক অঙ্কে নেমেছে; ইয়েমেনের হুথিদের কৌশলগত অগ্রযাত্রায় দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও অনিশ্চিত
দুবাই/সানা | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবার বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথকে একই সঙ্গে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার পর ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিরা বাব আল-মান্দাবের কাছে কৌশলগত অবস্থান শক্ত করেছে। এতে বিশ্ব তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচল কতটা কমেছে
রয়টার্সের জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ৭টি জাহাজ চলাচল করেছে। এর আগের ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১৫টি জাহাজ। যুদ্ধের আগে এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত।
১০ সেপ্টেম্বর হরমুজ দিয়ে কোনো LNG tanker চলাচল করেনি। এই তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর LNG সরবরাহের জন্য হরমুজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু জাহাজ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে চলাচল করতে পারে। ফলে প্রকৃত সংখ্যা ট্র্যাকিং ডেটার চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে।
এবার বাব আল-মান্দাবের দিকেও অগ্রগতি
হরমুজের পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মান্দাবের কাছে কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে বলে ইয়েমেনি সরকারি সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে রয়টার্স।
হুথিদের হাতে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ শহর ধুবাব এবং কৌশলগত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ যাওয়ার খবর এসেছে।
বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব হরমুজের মতোই বাণিজ্যিক। এ পথটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করে এবং সুয়েজ খাল ব্যবহারকারী জাহাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রুট।
দুই জলপথ একসঙ্গে ঝুঁকিতে কেন?
হরমুজ প্রণালি মূলত উপসাগরীয় তেল ও LNG আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর প্রধান পথ।
অন্যদিকে বাব আল-মান্দাব হলো ইউরোপ-এশিয়া সমুদ্রবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।
এই দুই জায়গায় একসঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে জাহাজ কোম্পানিগুলোর বিকল্প রুট বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। তাতে যাত্রার সময়, জ্বালানি খরচ ও বিমা ব্যয় একসঙ্গে বাড়ে।
তেলের দাম কেন ১০০ ডলার ছাড়াল
রয়টার্সের হিসাবে শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড প্রায় ১০৪ দশমিক ৫৩ ডলারে এবং WTI প্রায় ১০০ দশমিক ২৫ ডলারে ছিল।
সপ্তাহের হিসাবে দুই ধরনের তেলের দামই ৮ শতাংশের বেশি বাড়ার পথে ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পাশাপাশি ইউক্রেনীয় হামলায় রাশিয়ার কিছু শোধনাগারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবও চাপের মধ্যে
হুথি হামলার কারণে সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় জ্বালানি পরিবহনও ঝুঁকিতে পড়েছে।
দেশটির ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট লোডিং আগস্টে ছয় মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছিল। সেপ্টেম্বরে তা কিছুটা বেড়েছে।
ইয়ানবু গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি হরমুজ এড়িয়ে সৌদি তেল রপ্তানির একটি বিকল্প পথ।
ওয়াশিংটন কী করছে
হুথিদের অগ্রযাত্রা নিয়ে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে মার্কিন সূত্রের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স।
তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি মার্কিন হামলা চালানোর বদলে গোয়েন্দা তথ্য ও targeting support দেওয়ার পথে এগিয়েছেন।
এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন একদিকে হরমুজে ইরানকে মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে ইয়েমেনে সরাসরি নতুন সামরিক ফ্রন্ট খুলতে সতর্ক রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
জ্বালানি সরবরাহের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ থাকলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
এতে পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিল্প উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহের খরচ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বড় অর্থনীতিগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর বিষয়ে আরও সতর্ক হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানি করে। তেলের দাম ১০০ ডলারের আশপাশে দীর্ঘদিন থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে।
সমুদ্রপথের বিমা ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়লে শিল্পের কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্য আমদানিতেও চাপ আসতে পারে।
বিশেষ করে জ্বালানি ও শিপিং ব্যয়ের সমন্বিত বৃদ্ধি বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
📊 সংকটের বর্তমান চিত্র
- হরমুজে ১০ সেপ্টেম্বর জাহাজ চলাচল: ৭টি
- হরমুজে ১০ দিনের গড়: প্রায় ১৫টি
- যুদ্ধের আগে দৈনিক চলাচল: প্রায় ১২৫টি
- ব্রেন্ট ক্রুড: প্রায় $104.53
- WTI: প্রায় $100.25
- হরমুজে ১০ সেপ্টেম্বর LNG tanker: ০টি
- ঝুঁকিতে দ্বিতীয় নৌপথ: বাব আল-মান্দাব
🧭 সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ কতদিন চলে এবং হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব কতটা অচল থাকে—এই দুই প্রশ্নের উত্তরেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারের পরবর্তী দিক নির্ধারিত হবে।
দুটি জলপথ দীর্ঘ সময় ঝুঁকিতে থাকলে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি একটি সাধারণ তেলদাম-সংকটের চেয়ে বড় supply-chain সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: Reuters, Associated Press, Al Jazeera, Bloomberg




