Homeনাগরিক দর্পণএআই হোক চিন্তার সহায়ক, প্রতিস্থাপক নয়

এআই হোক চিন্তার সহায়ক, প্রতিস্থাপক নয়

জুয়েল হাছান, ফ্রিল্যান্সার

একটি সময় ছিল যখন কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা বই ঘাঁটতাম, মাথা খাটাতাম কিংবা একজন অন্যজনের সাথে বিস্তৃত আলোচনা করতাম। আজকাল ছোট থেকে বড় প্রায় প্রতিটা বিষয় এবং জানার জিজ্ঞাসায় আমরা সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারে গিয়ে হাজির হই। এই অভ্যাস আমাদের দৈনন্দিন জীবনের মূল্যবান সময় বাঁচাচ্ছ ঠিকই, কিন্তু বিশ্বজুড়ে গবেষকরা এখন এক বড় প্রশ্ন তুলছেন—এর বিনিময়ে আমরা কি আমাদের সহজাত ও নিজস্ব চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলছি? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন কেবল আমাদের চিন্তার সহায়ক না হয়ে ধীরে ধীরে তার বিকল্প বা প্রতিস্থাপক হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাশীলতার জন্য এক নীরব হুমকি।

গবেষণা বলছে, যারা তথ্য সংগ্রহ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অতি মাত্রায় প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেন, তাদের নিজস্ব প্রতিফলনমূলক সমস্যা সমাধান ও স্বাধীন বিশ্লেষণের ক্ষমতা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। ইউরোপীয় গবেষকদের সাম্প্রতিক জরিপ ও তথ্যে দেখা গেছে, প্রতিনিয়ত এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের সাথে মানুষের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির নিবিড় নেতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষভাবে ১৭ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণরা প্রযুক্তির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং তাদের গভীর চিন্তা করার সূচকও উদ্বেগজনকভাবে কম। গবেষকরা এই প্রবণতাকে মানসিক অলসতা বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে গভীর ও বিশ্লেষণাত্মক চিন্তায় সময় ও মনোযোগ দেওয়ার আগ্রহ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে স্বাধীনভাবে যুক্তি তৈরি ও জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সার্বিক ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।

মানসিক পরিশ্রম বাইরের কোনো যন্ত্র বা মাধ্যমের হাতে সঁপে দেওয়ার এই যে প্রবণতা, বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় মানসিক ভর স্থানান্তর। আগে কোনো সাধারণ তথ্য মনে রাখার বদলে খাতায় বা মুঠোফোনে লিখে রাখার চর্চা ছিল, কিন্তু বর্তমান যুগে তা আরও তীব্র ও জটিল রূপ নিয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ, সংক্ষেপ তৈরি কিংবা জটিল সমস্যা সমাধানের কাজগুলো একের পর এক যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেওয়ায় মানুষ নিজে এই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সুযোগ হারিয়ে ফেলছে। প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত আস্থা জন্মানোর ফলে ব্যবহারকারীরা বিনা প্রশ্নে ও বিনাবিচারে সব তথ্য মেনে নিচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের কৌতূহল, সন্দেহ প্রকাশ এবং তথ্য যাচাই করার সহজাত মানসিকতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থী ও তরুণদের মস্তিষ্কের কার্যকারিতার ওপর এর এক বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক প্রভাব ধরা পড়েছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে নিবন্ধ লেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল—একদল কোনো সাহায্য ছাড়া নিজস্ব বুদ্ধি দিয়ে, একদল সাধারণ তথ্য খোঁজার মাধ্যম ব্যবহার করে এবং অন্যদল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরাসরি সহায়তায় লিখেছে। মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরিমাপ করে দেখা গেছে, যারা সম্পূর্ণ নিজস্ব চিন্তায় লিখেছেন তাদের মস্তিষ্কের মধ্যকার স্নায়বিক সংযোগ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিস্তৃত। অন্যদিকে যারা যন্ত্রের সরাসরি সহায়তা নিয়েছেন, তাদের মস্তিষ্কের সংযোগ ছিল সবচেয়ে দুর্বল। এমনকি যন্ত্রের সহায়তা নেওয়া বন্ধ করার পরও তাদের মস্তিষ্ক সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক সক্রিয় অবস্থায় ফিরে আসেনি, যা প্রমাণ করে এই প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

কেবল শিক্ষার্থী নয়, পেশাদার কর্মক্ষেত্রেও এই মানসিক অভ্যাসের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপ অনুযায়ী, প্রযুক্তি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত আস্থা মানুষের নিজস্ব সূক্ষ্ম যাচাইয়ের প্রবণতা কমিয়ে দেয়। কর্মীরা অনেক সময় ধরে নেন যে যন্ত্রের দেওয়া উত্তরই চূড়ান্ত ও নির্ভুল, যার ফলে তারা নিজের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করা বন্ধ করে দেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এমনকি চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবার মতো সংবেদনশীল পেশায় যুক্ত ব্যক্তিরা যখন দীর্ঘদিন স্বয়ংসক্রিয় রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল থাকেন, তখন মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তাদের স্বাধীনভাবে রোগ নির্ণয়ের দক্ষতায় অবনতি ঘটে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় যন্ত্রভিত্তিক মানসিক একমুখী আচরণ বলা হয়, যেখানে মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে ভুলে যায়।

পাশাপাশি মানুষের স্মৃতিশক্তি এবং যেকোনো তথ্য মনে রাখার সাধারণ সক্ষমতাও দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। বহু বছর আগেই বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছিলেন যে কোনো তথ্য পরবর্তীতে সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে জানলে মানুষ তা স্মৃতিতে ধরে রাখার চেষ্টা বাদ দিয়ে শুধু খোঁজার স্থানটি মনে রাখে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই ভুলে যাওয়ার প্রবণতা মহামারী আকার ধারণ করেছে। সহজলভ্য তথ্যের কারণে মানুষের বানানের দক্ষতা, হাতে লেখার অভ্যাস, মৌলিক গণিত এবং নতুন ভাষা শেখার ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এমনকি দিকনির্দেশনা ব্যবস্থার ওপর অতিনির্ভরতার কারণে মানুষের চারপাশের পরিবেশ মনে রাখার ভৌগোলিক স্মৃতিশক্তিও ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।

এই ক্রমবর্ধমান সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়েই জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রযুক্তিকে উত্তর তৈরির কারখানা বানিয়ে নিষ্ক্রিয়ভাবে গ্রহণ না করে, তাকে কেবল নিজের চিন্তার একজন সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। যে ব্যক্তির নিজস্ব বিষ্যে জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস যত বেশি, তিনি তত দক্ষতার সাথে প্রযুক্তি থেকে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করতে পারেন। পাশাপাশি মৌলিক ও প্রাথমিক তথ্যের উৎসের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকা এবং জটিল বা সৃষ্টিশীল কাজে সচেতনভাবে সরাসরি প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত রাখা প্রয়োজন, যাতে নিজের মস্তিষ্কের নিয়মিত চর্চা অব্যাহত থাকে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদেরও এই বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় এমন প্রযুক্তি নকশা করা উচিত যা শিক্ষার্থীকে সরাসরি উত্তর না দিয়ে ধাপে ধাপে চিন্তা করতে এবং পাল্টা প্রশ্ন তুলতে শেখাবে। ভবিষ্যতের প্রযুক্তির প্রধান কাজ হওয়া উচিত মানুষকে ঝটপট উত্তর সরবরাহ করা নয়, বরং তাকে আরও ভালো ও গভীর প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা। যন্ত্রের সুবিধা গ্রহণ এবং মানুষের প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তা রক্ষার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে বের করাই এখনকার সবচেয়ে বড় সময়োপযোগী চ্যালেঞ্জ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments