Homeটুডে নেশনমেট্রোরেলের খরচ কেন আকাশছোঁয়া? জাইকার ঋণ, সীমিত প্রতিযোগিতা ও দুর্বল তদারকির জটিল...

মেট্রোরেলের খরচ কেন আকাশছোঁয়া? জাইকার ঋণ, সীমিত প্রতিযোগিতা ও দুর্বল তদারকির জটিল ফাঁদ

একই ধরনের মেট্রো ভারতে যেখানে কয়েকশ কোটি টাকা কিলোমিটারে, ঢাকায় সেখানে ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ কোটি; নতুন দুই লাইনের ব্যয় দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়ানোর পথে—এত বেশি খরচের টাকা আসলে কোথায় যাচ্ছে?

টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান

ঢাকার যানজট কমাতে মেট্রোরেল প্রয়োজন—এ নিয়ে বড় কোনো বিতর্ক নেই। প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: এই মেট্রোরেল বানাতে বাংলাদেশকে এত বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে কেন?

প্রথম মেট্রোরেল MRT Line-6-এর ২১.২৬ কিলোমিটার প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি প্রায় ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। অথচ DMTCL-এর তুলনামূলক বিশ্লেষণে ভারতের বিভিন্ন মেট্রো প্রকল্পের ব্যয় এর তুলনায় অনেক কম। নতুন MRT Line-1 ও MRT Line-5-এর কয়েকটি প্যাকেজে দরপত্রের দর আরও ভয়াবহ। কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক প্রাক্কলনের দ্বিগুণেরও বেশি দর এসেছে।

ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু “মেট্রোরেল ব্যয়বহুল কেন”—এতটুকুতে আটকে নেই। বরং প্রশ্ন হলো, ব্যয়ের এই অস্বাভাবিক পার্থক্য তৈরি করছে কোন কাঠামো, কারা সেই কাঠামো থেকে সুবিধা পাচ্ছে এবং কেন এতদিন বাংলাদেশ সেটি ঠেকাতে পারেনি?

তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি। উচ্চ ব্যয় মানেই দুর্নীতি প্রমাণিত নয়। কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি, কর্মকর্তা বা ব্যক্তির পকেটে অতিরিক্ত টাকা গেছে—এমন প্রমাণ ছাড়া তা বলা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে দায়িত্বশীল হবে না। কিন্তু দুর্বল প্রতিযোগিতা, অতিমূল্যায়িত দর, ব্যয়বহুল পরামর্শক, নকশা ও প্রযুক্তিগত শর্ত এবং দুর্বল স্থানীয় দরকষাকষির কারণে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হচ্ছে কি না—এই প্রশ্নের যথেষ্ট ভিত্তি এখন তৈরি হয়েছে।


প্রথম ধাক্কা: একই মেট্রো, কিন্তু ঢাকার দাম কয়েক গুণ

DMTCL-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাটনায় মেট্রোর কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় প্রায় ৪০.৭৭ মিলিয়ন ডলার; রিয়াদে ১৬৬ মিলিয়ন এবং দুবাইয়ে ১৮৮ মিলিয়ন ডলার। ঢাকার বিভিন্ন নতুন মেট্রো প্রকল্পে একই হিসাব দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২২৬.৭৪ থেকে ২৫৩.৬৩ মিলিয়ন ডলার প্রতি কিলোমিটার। অর্থাৎ পাটনার তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ।

আরও বিস্তৃত তুলনায় DMTCL-এর তথ্য অনুযায়ী, সিডনি, ইস্তাম্বুল, আবিদজান, সিউল, ব্যাংকক ও হো চি মিন সিটির সাম্প্রতিক মেট্রো প্রকল্পগুলোর কিলোমিটারপ্রতি ব্যয়ও ঢাকার নতুন প্রকল্পগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

তবে এই তুলনা সরাসরি “ঢাকার প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে” প্রমাণ করে না। মেট্রোর ধরন, underground অংশ, জমি অধিগ্রহণ, স্টেশন সংখ্যা, utility relocation, পরিবেশগত শর্ত, কর, স্থানীয় শ্রমের দাম এবং rolling stock—সবকিছু ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।

কিন্তু পার্থক্য যখন কয়েক গুণ হয়, তখন স্বাধীন cost benchmarking অপরিহার্য হয়ে পড়ে।


MRT-6: ব্যয়ের প্রথম বড় সতর্কসংকেত

MRT Line-6 শুরুতে প্রায় ২১ কিলোমিটার elevated metro হিসেবে পরিকল্পিত ছিল। সরকারি নথিতে প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল প্রায় ২৩,২২৩ কোটি টাকা। পরে বিভিন্ন ধাপে ব্যয় বেড়ে প্রায় ৩৩,৪৭২ কোটি টাকায় পৌঁছায়।

অর্থাৎ প্রকল্পটি শুধু নির্মাণ ব্যয়ের দিক থেকেই বড় নয়; প্রকল্প পরিকল্পনা, নকশা, বাস্তবায়নকাল এবং বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে ব্যয়ের কাঠামোও বড় হয়েছে।

তবে MRT-6-এর সঙ্গে নতুন MRT-1 ও MRT-5-এর একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। MRT-6-এর কাজ প্রায় শেষ হওয়ায় এখন আর তার মূল ব্যয় কমানোর সুযোগ সীমিত। বরং নতুন দুই প্রকল্পে দরপত্র পর্যায়েই অস্বাভাবিক ব্যয় ধরা পড়েছে।

এখানেই পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ ছিল।


নতুন দুই লাইনে বিপদ আরও বড়

MRT Line-1-এর প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ৫২,৫৬১ কোটি টাকা। MRT Line-5 Northern-এর অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ৪১,২৬১ কোটি। দুই প্রকল্প মিলিয়ে প্রাথমিক হিসাব প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু দরপত্রের বাস্তব চিত্র সেই হিসাবকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছে।

MRT-1-এর তিনটি underground package-এর সম্মিলিত দরই প্রায় ৩০,৮৬৪ কোটি টাকা এসেছে। DMTCL-এর বিশ্লেষণে পুরো প্রকল্পের ব্যয় ৯৪ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।

MRT-5 Northern-এর একটি ৫.৫ কিলোমিটার underground অংশের প্রাথমিক প্রাক্কলন ছিল প্রায় ৩,৯৬৮ কোটি টাকা। সেখানে সর্বনিম্ন দর এসেছে প্রায় ১৫,৫২৭ কোটি টাকা—অর্থাৎ প্রাথমিক হিসাবের প্রায় চার গুণ।

আর ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, MRT-5 Northern-এর সংশোধিত মোট ব্যয় প্রায় ৯৩,১৯১ কোটি টাকা করার প্রস্তাব উঠেছে—২০১৯ সালের অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১২৬ শতাংশ বেশি।

এখানে আর শুধু মূল্যস্ফীতিকে দায়ী করে বিষয়টি শেষ করা যায় না।


তাহলে দায়ী কে? শুধু জাইকা?

এখানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে Japan International Cooperation Agency বা JICA

JICA বাংলাদেশের মেট্রোরেলের প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। MRT-6, MRT-1 ও MRT-5 Northern-এর বিভিন্ন ধাপে জাপানি ঋণ রয়েছে। JICA-এর নিজস্ব নথিতে MRT-6-এর বিভিন্ন ঋণচুক্তির পরিমাণ এবং ০.৭ শতাংশের মতো সুদের হার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধকাল দেখা যায়।

অর্থাৎ এটি সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণ নয়। তুলনামূলক নরম শর্তের উন্নয়ন ঋণ।

কিন্তু সস্তা ঋণ মানেই সস্তা প্রকল্প নয়।

ঋণের সুদ কম হলেও যদি প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য মোট দায় শেষ পর্যন্ত বড়ই থাকে।

এখানেই JICA-এর অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।


ঋণ দিচ্ছে যারা, প্রকল্পের দরপত্রে তাদের প্রভাব কতটা?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা আছে।

JICA-এর সাম্প্রতিক MRT loan agreements-এ “general untied” procurement উল্লেখ আছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে ঋণ শুধু জাপানি কোম্পানির জন্য সংরক্ষিত—এমন সরল দাবি সঠিক নয়।

কিন্তু বাস্তব দরপত্রে প্রতিযোগিতা কতটা উন্মুক্ত ছিল, সেটিই বড় প্রশ্ন।

DMTCL-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক রিপোর্টগুলোতে বলা হয়েছে, কিছু tender specification এমনভাবে তৈরি হয়েছিল যাতে অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান যোগ্য হয়। ফলে আন্তর্জাতিক দরপত্র হলেও বাস্তবে জাপানি কোম্পানি বা জাপানি নেতৃত্বাধীন consortium-এর আধিপত্য তৈরি হয়েছে।

এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

“জাপানি কোম্পানির জন্য সরাসরি দরপত্র বন্ধ” এবং “শর্ত এমন যে অন্য কোম্পানির পক্ষে প্রতিযোগিতা কঠিন”—দুটো এক জিনিস নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান সমস্যাটি মূলত দ্বিতীয় প্রশ্নে।


প্রতিযোগিতা কমলে দাম বাড়ে—MRT-1 ও MRT-5 তার বাস্তব উদাহরণ?

MRT-1 ও MRT-5-এর সাম্প্রতিক দরপত্রে অস্বাভাবিক দর পাওয়ার পর DMTCL procurement process থামিয়ে নতুন করে tender এবং প্রকল্প ব্যয় পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু package-এ দর অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ৯০–১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ছিল।

আরও চমকপ্রদ তথ্য এসেছে MRT-5 Northern-এর একটি package-এ। প্রাথমিক estimate ছিল প্রায় ৫,২১২ কোটি টাকা; consultant-এর revised estimate দাঁড়ায় প্রায় ৫,২১৩ কোটি, কিন্তু সর্বনিম্ন দর আসে প্রায় ১১,১৭৮ কোটি টাকা—প্রাথমিক হিসাবের দ্বিগুণেরও বেশি। অন্য একটি package-এ প্রাথমিক হিসাব ৪,৩৬৫ কোটি থেকে consultant estimate ৬,১২৬ কোটিতে ওঠার পর সর্বনিম্ন দর আসে প্রায় ১৫,৫২৭ কোটি টাকা।

এখানে দুটি আলাদা সমস্যা রয়েছে:

প্রথমত, consultant estimate কেন বাড়ল?

দ্বিতীয়ত, tender-এর বাজারদর estimate-এর চেয়ে এত বেশি হলো কেন?

দুটোর উত্তর একই নয়।


সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: estimate তৈরি করে কে?

একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সরকার সাধারণত নিজের প্রকৌশলীদের দিয়ে বসে পুরো cost estimate বানিয়ে দরপত্রে যায় না। feasibility study, detailed design, tender document এবং supervision-এর জন্য consultant নিয়োগ করা হয়।

মেট্রোরেলেও একই ব্যবস্থা।

MRT-6-এর ক্ষেত্রে consultant consortium-এর নেতৃত্বে ছিল জাপানের Nippon Koei; সঙ্গে ভারতীয়, ব্রিটিশ ও বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানও ছিল।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন যে consultant design ও specification তৈরি করছেন, তাঁর তৈরি specification-এর সঙ্গে বাজারে থাকা contractor-দের যোগ্যতা এবং technology requirement-এর বড় সম্পর্ক তৈরি হয়।

যদি specification অত্যন্ত নির্দিষ্ট হয়, তাহলে bidder কমে যায়।

bidder কমলে competitive price discovery দুর্বল হয়।

আর competitive pressure কমলে contractor-এর দর কমানোর চাপও কমে যায়।

এটি কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়; public procurement-এর একটি স্বীকৃত অর্থনৈতিক ঝুঁকি।


জাপানি consultant, জাপানি contractor: সংঘাতের সম্ভাবনা কোথায়?

সাম্প্রতিক তদন্ত ও সংবাদ বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি উঠেছে তা হলো—একই donor ecosystem-এর মধ্যে financier, consultant এবং contractor-এর মধ্যে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হচ্ছে কি না।

BUET-এর পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক TBS-কে বলেছেন, JICA প্রকল্পে donor-side consultant এবং contractor ecosystem-এর ঘনিষ্ঠতা competition দুর্বল করতে পারে।

তবে এটিকে “জাইকা দুর্নীতি করছে” হিসেবে লেখা যাবে না। এমন প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই।

বরং সঠিক প্রশ্ন হলো—

একটি প্রকল্পের cost estimate কে যাচাই করছে?

consultant-এর estimate স্বাধীনভাবে benchmark করা হচ্ছে কি?

technical specification অন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিও পূরণ করতে পারবে কি না, তা কে পরীক্ষা করছে?

consultant-এর কোনো affiliated বা একই দেশের contractor bid করলে conflict-of-interest review হচ্ছে কি?

এগুলোই আসল governance প্রশ্ন।


“কার পকেটে যাচ্ছে?”—প্রমাণ ছাড়া উত্তর দেওয়া যাবে না

এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আবার সবচেয়ে সংবেদনশীল।

একটি প্রকল্পের ব্যয় ১ লাখ কোটি টাকা হলে তার অর্থ পুরোটা কারও পকেটে যায় না। বড় অংশ যায় steel, cement, rail systems, signalling, rolling stock, tunnelling, civil works, land acquisition, labour, taxes, consultancy, financing cost ও অন্যান্য বৈধ ব্যয়ে।

তাই “অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি টাকা অমুকের পকেটে গেছে”—এমন হিসাব শুধু cost overrun দেখে করা সম্ভব নয়।

তবে অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্ভাব্য beneficiaries-এর জায়গাগুলো শনাক্ত করা যায়:

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—উচ্চ দর পেলে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান—বেশি consultancy fee পেলে।

equipment ও technology supplier—নির্দিষ্ট প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক হলে।

স্থানীয় subcontractor—contract-এর অংশ পেলে।

মধ্যস্বত্বভোগী বা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা/রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি—যদি কমিশন, ঘুষ, kickback বা অবৈধ সুবিধার প্রমাণ পাওয়া যায়।

শেষের বিষয়টি প্রমাণ করতে প্রয়োজন ব্যাংকিং লেনদেন, beneficial ownership, subcontract, commission agreement, offshore transaction, asset trail এবং procurement communication। শুধু প্রকল্পের বেশি দাম সেটি প্রমাণ করে না।


বাংলাদেশের পুরোনো মেগাপ্রকল্পগুলো কী বলছে?

মেট্রোরেলের সমস্যাটি একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত টাস্কফোর্স আটটি বড় প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির কারণ বিশ্লেষণ করে। তাদের হিসাবে প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক সম্মিলিত ব্যয় ছিল প্রায় ১১.১২ বিলিয়ন ডলার; পরে তা বেড়ে ১৮.৬৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়—প্রায় ৭.৫২ বিলিয়ন ডলার বা ৬৮ শতাংশ বেশি। তালিকায় MRT-6-ও ছিল।

টাস্কফোর্স শুধু দুর্নীতির কথা বলেনি। তারা আটটি কাঠামোগত কারণ চিহ্নিত করেছে—দুর্বল বা ভুল feasibility study, feasibility প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলার অভাব, land acquisition, অন্য প্রকল্পের সঙ্গে সংঘাত, sequential implementation, ঘন ঘন project director পরিবর্তন, institutional weakness এবং financing সমস্যা।

অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যয়ের রোগটি অনেক গভীরে।

দুর্নীতি তার একটি অংশ হতে পারে; কিন্তু পুরো রোগের নাম শুধু দুর্নীতি নয়।


ভুল feasibility study: সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভুল

একটি প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় নির্মাণ শুরু হওয়ার আগের সময়।

কোথায় station হবে?

কত মানুষ ব্যবহার করবে?

কত জমি লাগবে?

কত utility সরাতে হবে?

কত underground tunnel হবে?

কোন technology ব্যবহার করা হবে?

কত train লাগবে?

কত depot দরকার?

এসব প্রশ্নের উত্তর feasibility ও detailed design পর্যায়েই যতটা সম্ভব নির্ভুল হওয়া দরকার।

কিন্তু feasibility দুর্বল হলে নির্মাণ শুরুর পর design change আসে। তারপর variation order। তারপর নতুন package। তারপর সময় বাড়ে। সময় বাড়লে consultant fee, supervision cost, inflation, financing cost—সব বাড়ে।

এই কারণে প্রকল্পের সবচেয়ে সস্তা অংশ হলো ভালো পরিকল্পনা; সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভুল হলো নির্মাণ শুরুর পর পরিকল্পনা বদলানো।

সরকারি টাস্কফোর্সও faulty feasibility ও planning discipline-এর অভাবকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।


টাকার আরেকটি অদৃশ্য খরচ: সময়

বাংলাদেশে প্রকল্পের সময় বাড়া যেন প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা।

কিন্তু একটি মেট্রোরেল প্রকল্পে এক বছর delay মানে শুধু contractor-এর construction period বাড়া নয়।

এর সঙ্গে বাড়ে:

  • consultancy cost
  • project management cost
  • staff cost
  • imported equipment-এর দাম
  • currency risk
  • loan commitment
  • inflation
  • land/utility management cost

অর্থাৎ সময় নিজেই টাকা।

তাই “প্রকল্প ৩০ শতাংশ বেশি সময়ে শেষ হয়েছে”—এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি অর্থনৈতিক ক্ষতি।


টাকার মূল্য কমে গেলে কি সব ব্যয় দ্বিগুণ হতে পারে?

না।

এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভ্রান্তি আছে।

বাংলাদেশি টাকা ২০১৯ সালের তুলনায় ডলারের বিপরীতে বড়ভাবে দুর্বল হয়েছে। MRT-1 ও MRT-5-এর revised cost-এর একটি কারণ হিসেবে DMTCL exchange-rate change-এর কথা বলেছে। MRT-5-এর ক্ষেত্রে পুরোনো DPP-তে ডলারপ্রতি ৮৪.৫০ টাকা ধরা হয়েছিল, আর ২০২৬ সালের সংশোধিত হিসাবের জন্য ১২৩.৮২ টাকা ব্যবহার করা হয়েছে।

এটি বড় প্রভাব ফেলতে পারে—বিশেষ করে imported equipment, machinery ও foreign consultancy-তে।

কিন্তু currency depreciation দিয়ে tender bid-এর তিন-চার গুণ হয়ে যাওয়া পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।

এ কারণেই procurement structure-এর প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।


তাহলে JICA কি শর্ত শিথিল করতে পারে?

এখন সরকার সেই চেষ্টা করছে।

২০২৫ সাল থেকেই DMTCL এবং সরকার JICA-funded প্রকল্পের ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন ও loan conditions নিয়ে আলোচনা শুরু করে। ২০২৬ সালের মার্চে MRT-1-এর অচলাবস্থা কাটাতে ERD-তে JICA-এর সঙ্গে আলোচনা হয়।

আর MRT-5 Northern-এর কিছু tender বাতিল করে নতুন করে দরপত্র দেওয়ার প্রস্তাবও JICA-এর সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে JICA দুটি package-এর bidding বাতিলের অনুরোধে সম্মতি দেয়নি।

এখানে বোঝা যায়, সমস্যা শুধু বাংলাদেশের procurement office-এর নয়। ঋণের সঙ্গে যুক্ত procurement framework এবং donor approval structure-ও বাস্তব সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলে।


বাংলাদেশ এতদিন প্রতিকার করল না কেন?

কারণটি একক নয়।

প্রথমত, বড় প্রকল্পকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে; ফলে “কত টাকা লাগছে” প্রশ্নটি অনেক সময় “কী পাওয়া যাচ্ছে” প্রশ্নের কাছে চাপা পড়েছে।

দ্বিতীয়ত, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার negotiating capacity দীর্ঘদিন বিদেশি consultant ও contractor-এর তুলনায় দুর্বল ছিল।

তৃতীয়ত, একেক প্রকল্পে একেক ধরনের procurement strategy ব্যবহৃত হয়েছে। DMTCL এখন unified tendering standard তৈরির চেষ্টা করছে।

চতুর্থত, Planning Commission, line ministry, implementing agency এবং development partner—সবাই আলাদা আলাদা জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারি টাস্কফোর্সও transport infrastructure-এ এই fragmentation-কে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

পঞ্চমত, দুর্বল feasibility-এর পরও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হলে পরে কেউ সহজে থামাতে চায় না। কারণ তখন ইতোমধ্যে বিপুল টাকা খরচ হয়ে গেছে।

এটিই sunk-cost trap


নতুন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কোথায়?

এবার অন্তত একটি পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে—দরপত্রের দামকে প্রশ্ন করা হচ্ছে।

DMTCL কিছু tender স্থগিত করেছে, নতুন tender-এর কথা বলেছে এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে cost benchmarking শুরু করেছে। একই সঙ্গে MRT-5 Southern Route-কে open competitive tender-এর মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য একটি বাস্তব cost benchmark তৈরির চেষ্টা চলছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ একটি প্রকল্পে consultant-এর estimate-এর সঙ্গে আরেক consultant-এর estimate তুলনা করলেই benchmarking হয় না।

একই ধরনের প্রকল্পে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত contract award price কত—সেটিই আসল benchmark।


তাহলে সমাধান কী?

সমাধান শুধু “JICA-কে বাদ দাও” নয়।

জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। JICA-এর ঋণও অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত কম সুদের এবং দীর্ঘমেয়াদি। তাই সমস্যাটি donor relationship নয়; value for money নিশ্চিত করার সক্ষমতা।

প্রথম কাজ হতে পারে প্রতিটি বড় প্রকল্পে স্বাধীন আন্তর্জাতিক cost audit।

দ্বিতীয়ত, feasibility study এবং detailed design-এর ওপর দ্বিতীয় পক্ষের independent peer review বাধ্যতামূলক করা।

তৃতীয়ত, tender specification এমন হতে হবে যাতে কোনো দেশের কোম্পানি অকারণে সুবিধা না পায়।

চতুর্থত, consultant, contractor ও financier-এর সম্ভাব্য conflict of interest প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে।

পঞ্চমত, প্রতিটি বড় contract-এর প্রকৃত beneficial owner প্রকাশ করতে হবে। বাংলাদেশে ২০২৫ সালের Public Procurement Rules এবং ২০২৬ সালের সংশোধিত procurement law-এ beneficial ownership disclosure ও e-GP-সহ transparency বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ষষ্ঠত, contract award-এর পর variation order, price adjustment, subcontract এবং final payment—সব তথ্য public dashboard-এ প্রকাশ করা উচিত।

সপ্তমত, কোনো package-এর দর সরকারি estimate-এর চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি হলে সেটি “অবশ্যই বেশি” বা “অবশ্যই দুর্নীতি”—কোনোটিই ধরে নেওয়া যাবে না। Independent re-estimation এবং open negotiation করতে হবে।


সবচেয়ে জরুরি তদন্ত: টাকা অনুসরণ করুন

বাংলাদেশে বড় প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানটি এখনো যথেষ্ট হয়নি।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—

একটি package-এ সরকার কত estimate করেছিল?

consultant কত estimate করেছিল?

কতজন bidder যোগ্য হয়েছিল?

কে bid করেছিল?

কে কত দর দিয়েছিল?

কেন lowest bidder নির্বাচিত হলো?

contract value কত?

variation order কত?

contractor কাকে subcontract দিয়েছে?

subcontract-এর মূল্য কত?

consultant কত পেয়েছে?

কোন কোম্পানির প্রকৃত মালিক কে?

কোন কর্মকর্তা procurement decision-এ ছিলেন?

তাদের সম্পদ ও financial interests কী?

এগুলো একসঙ্গে অনুসরণ করলে তবেই বোঝা যাবে “অতিরিক্ত টাকা কোথায় যাচ্ছে।”

শুধু newspaper report দিয়ে নয়, contract-by-contract forensic financial audit দিয়েই এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব।


মেট্রোরেল বন্ধ নয়, অপচয় বন্ধ

ঢাকার জন্য মেট্রোরেল দরকার। কিন্তু মেট্রোরেল দরকার বলে যে কোনো দামে মেট্রোরেল বানাতে হবে—এমন যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

একটি উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য শুধু তার দৈর্ঘ্য দিয়ে মাপা যায় না।

কত খরচে তৈরি হলো, কত মানুষ ব্যবহার করবে, ঋণ কত, ভাড়া কত হবে, কত বছরে ঋণ পরিশোধ হবে এবং একই টাকা অন্য কোথায় ব্যবহার করলে কত বেশি সামাজিক লাভ হতো—এসবও হিসাব করতে হবে।

DMTCL নিজেই এখন স্বীকার করছে যে অতিরিক্ত ব্যয় ভবিষ্যৎ ভাড়াকে অসহনীয় করে তুলতে পারে। সংস্থাটি design optimisation, shared infrastructure এবং local content বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করছে।

অর্থাৎ প্রশ্নটি মেট্রোরেলের পক্ষে না বিপক্ষে—এমন নয়।

প্রশ্ন হলো—

বাংলাদেশ কি বিশ্বমানের মেট্রোরেল বিশ্বমানের দক্ষতায় এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে বানাতে পারবে?


টুডে টিভি বিডির অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণ

বাংলাদেশে মেট্রোরেলের উচ্চ ব্যয়ের পেছনে একটি কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং কয়েকটি কারণ একে অন্যকে শক্তিশালী করছে—দুর্বল feasibility, অতিরিক্ত specification, সীমিত bidder, বিদেশি consultant-এর ওপর নির্ভরতা, দুর্বল local capacity, প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন, currency depreciation, দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্বল institutional oversight।

এর সঙ্গে দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগও তদন্তের যোগ্য। কিন্তু অভিযোগকে প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো—টাকা অনুসরণ করা।

কোন contract কত টাকায় হলো, estimate কী ছিল, bid কত ছিল, contractor কে, subcontractor কে, consultant কত নিয়েছে এবং প্রকৃত মালিক কারা—এই তথ্যগুলো জনসমক্ষে এলে অনেক প্রশ্নের উত্তর নিজেই বেরিয়ে আসবে।

আর যদি কোথাও ঘুষ, kickback, কমিশন বা রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে অর্থ সরানোর প্রমাণ পাওয়া যায়, তখন সেটি আলাদা দুর্নীতি তদন্তের বিষয় হবে।

কারণ উন্নয়ন প্রকল্পে সবচেয়ে বিপজ্জনক অপচয় হলো শুধু অতিরিক্ত টাকা খরচ নয়।

অতিরিক্ত টাকা খরচের কারণটি যদি কেউ জানতে না পারে, তাহলে একই পদ্ধতি পরের প্রকল্পেও ফিরে আসে।

আজ MRT-1 ও MRT-5।

আগামীকাল অন্য কোনো মেগাপ্রকল্প।

তাই বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন আরও বড় প্রকল্প নয়—আরও শক্তিশালী প্রকল্প ব্যবস্থাপনা।

প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো donor, consultant, contractor, মন্ত্রণালয় বা রাজনৈতিক প্রভাব—কেউই cost benchmark-এর ওপরে নিজের মতো করে দাম বসাতে না পারে।

মেট্রোরেল হবে। উন্নয়নও হবে। কিন্তু জনগণের টাকায় জনগণের জন্য—কতটা কম খরচে, কতটা স্বচ্ছভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে করা যায়, সেটিই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

**তথ্যসূত্র: JICA, DMTCL, BPPA, The Business Standard, প্রথম আলো, The Daily Star ও The Financial Express।**

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments