ভারতের আয়োজনে ১১ দেশের জোটের বৈঠক; বাণিজ্য, জ্বালানি, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা ও যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে বাড়ছে আলোচনা
নয়াদিল্লি | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া BRICS শীর্ষ সম্মেলনের আগে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এখন জোটটির আলোচনার কেন্দ্রে। ১১ সদস্যের BRICS প্রায় অর্ধেক বিশ্ব জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করায় এর অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের মধ্যেও বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে জোটটির গুরুত্ব বেড়েছে।
মোদি-পুতিন বৈঠকে কী হলো
রয়টার্স জানিয়েছে, মোদি ও পুতিন দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও শক্ত করার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন।
আলোচনায় প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো আন্তর্জাতিক ইস্যু উঠে এসেছে।
ভারত একই সঙ্গে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য
ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে।
দুই দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার।
রাশিয়ার জন্য ভারত এখন গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ভারতের জন্য রাশিয়ার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
পেজেশকিয়ানের সঙ্গে মোদির আলোচনায় হরমুজ
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে মোদি সামুদ্রিক বাণিজ্য ও নাবিকদের নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছেন।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার পর ভারতের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ ভারতীয় জাহাজ ও নাগরিকরাও সাম্প্রতিক সামুদ্রিক সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
BRICS কতটা ঐক্যবদ্ধ?
BRICS-এর সদস্য এখন ১১টি দেশ।
এর মধ্যে চীন, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক তীব্রভাবে টানাপোড়েনপূর্ণ। আবার ভারত ও ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে।
ফলে জোটটি রাজনৈতিকভাবে একক অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে সবসময় সহজে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে না।
ডলারের বিকল্প নিয়ে আলোচনা
BRICS দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের নির্ভরতা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করছে।
বিকল্প payment system, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং আর্থিক সহযোগিতা—এসব বিষয় জোটের এজেন্ডায় রয়েছে।
তবে সদস্যদের অর্থনৈতিক কাঠামো ও স্বার্থ ভিন্ন হওয়ায় একক বিকল্প মুদ্রা বা পূর্ণাঙ্গ বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থায় পৌঁছানো এখনো কঠিন।
যুদ্ধের ছায়ায় সম্মেলন
BRICS সম্মেলন এমন সময়ে হচ্ছে যখন একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ চলছে।
এই দুই সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও খাদ্য বাজারে প্রভাব ফেলছে।
ফলে অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞাও জোটের বাস্তব রাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে।
চীনের ভূমিকাও বড়
চীন BRICS-এর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি।
জোটকে আরও কার্যকর আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে বেইজিং আগ্রহী। তবে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং ব্রাজিলের ভিন্ন অগ্রাধিকার—সবকিছু মিলিয়ে BRICS-এর অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা সহজ নয়।
বাংলাদেশের জন্য কোথায় গুরুত্ব
বাংলাদেশ BRICS-এর সদস্য নয়, তবে উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে এই জোটের বাণিজ্য ও আর্থিক উদ্যোগ পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
BRICS-এর বিকল্প payment ব্যবস্থা বা স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়লে ভবিষ্যতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে বর্তমানে বাংলাদেশের ওপর এর কোনো তাৎক্ষণিক সরাসরি প্রভাব নেই।
📊 BRICS-এর বর্তমান চিত্র
- সদস্য: ১১ দেশ
- প্রতিনিধিত্ব: বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক
- ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য লক্ষ্য: ২০৩০ সালে $100 বিলিয়ন
- ২০২৪-২৫ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য: প্রায় $70 বিলিয়ন
- আলোচনার বিষয়: বাণিজ্য, জ্বালানি, পেমেন্ট ব্যবস্থা, যুদ্ধ
🧭 সামনে কী
এই সম্মেলনের সাফল্য নির্ভর করবে BRICS প্রতীকী বক্তব্যের বাইরে কতটা বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতা তৈরি করতে পারে তার ওপর।
যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক বাণিজ্য বিভাজনের এই সময়ে সদস্য দেশগুলো যদি নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে যৌথ ব্যবস্থা নিতে পারে, তাহলে BRICS-এর আন্তর্জাতিক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: Reuters, Associated Press, Bloomberg, Xinhua




