‘আমার দেশ’-এর প্রতিবেদনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি ডিভাইন আইটির; প্রতিষ্ঠাতা রাসেলের বক্তব্য—রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রযুক্তি ও গ্রাহকের আস্থাই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি
বিশেষ প্রতিবেদন | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের দেশীয় সফটওয়্যার শিল্পের অন্যতম পরিচিত প্রতিষ্ঠান ডিভাইন আইটি লিমিটেড-কে ঘিরে গত কয়েকদিনে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা যাচাই করে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—অভিযোগের ভাষা যতটা তীব্র, তার সমর্থনে যাচাইযোগ্য প্রমাণ ততটাই দুর্বল। ৮ সেপ্টেম্বর দৈনিক ‘আমার দেশ’-এ প্রকাশিত “রাষ্ট্রীয় সংস্থার আইটি সেবায় এখনো জয়ের বন্ধুর কোম্পানি” শিরোনামের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটি এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল আহমেদ ফখরুল হাসান (রাসেল) যে দীর্ঘ, বিন্দু বিন্দু লিখিত জবাব দিয়েছেন, তা পয়েন্ট বাই পয়েন্ট পরীক্ষা করলে অভিযোগগুলোর ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু: প্রমাণহীন ‘গোপন প্রতিবেদন’
‘আমার দেশ’-এর প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুতর দাবিটি হলো—সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গে ডিভাইন আইটির ঘনিষ্ঠতা ছিল, এবং এই দাবির ভিত্তি হিসেবে “গোয়েন্দা সংস্থার কথিত গোপন প্রতিবেদনের” কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই সাংবাদিকতার মৌলিক একটি মানদণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয়। প্রতিবেদনে সেই কথিত গোপন প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ নথি বা জনসমক্ষে যাচাইযোগ্য কোনো দলিল প্রকাশ করা হয়নি। একটি অনামা “গোপন প্রতিবেদন”-এর দোহাই দিয়ে একটি বৈধ, দুই দশক ধরে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা—অথচ সেই নথি পাঠকের সামনে হাজির না করা—এটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রাথমিক শর্তই পূরণ করে না।
রাসেল তাঁর লিখিত প্রতিবাদে এই অভিযোগ সরাসরি ও দ্ব্যর্থহীনভাবে অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষায়, “ডিভাইন আইটি লিমিটেডের সঙ্গে সজীব ওয়াজেদ জয় কিংবা তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের কোনো ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ ও অর্থায়নের সম্পৃক্ততা নেই। BASIS-সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিক প্রোগ্রাম ছাড়া পলকের সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ হয়নি। আমি কিংবা আমার পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য কখনো সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেনি।”
লক্ষণীয় বিষয়, খোদ ‘আমার দেশ’-এর প্রতিবেদনেই রাসেলের এই বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে—যেখানে তিনি বলেন, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পলকের সঙ্গে কয়েকবার সাক্ষাৎ হলেও তা নিছক আনুষ্ঠানিক ও পদাধিকারবলে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রমাণ নয়। একজন মন্ত্রীর সঙ্গে শিল্প সংগঠনের অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎ হওয়া এবং “ঘনিষ্ঠতা” থাকা—এই দুইয়ের মধ্যে সাংবাদিকতাগতভাবে বিশাল ফারাক রয়েছে, যা মূল প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।
‘আমার প্রবাসী’ প্রকল্প: সম্পূর্ণ অস্বীকৃত দাবি
প্রতিবেদনে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডিভাইন আইটির যৌথভাবে ‘আমার প্রবাসী’ প্রকল্পে কাজ করার দাবি করা হয়েছিল। ডিভাইন আইটি এই দাবি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, “‘আমার প্রবাসী’ নামের কোনো প্রকল্পের সঙ্গে ডিভাইন আইটি লিমিটেড কখনোই সম্পৃক্ত ছিল না।”
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নির্দিষ্ট দাবির সমর্থনে মূল প্রতিবেদনে কোনো চুক্তি, কার্যাদেশ বা প্রকল্প-সংক্রান্ত নথির উল্লেখ নেই। ডিভাইন আইটি নিজেই সংবাদমাধ্যমের কাছে এই দাবির “সুনির্দিষ্ট তথ্যসূত্র ও প্রমাণ” প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে—যা একটি সৎ ও স্বচ্ছ অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি সত্যিই এমন কোনো প্রকল্পে যুক্ত থাকত, তাহলে চুক্তিপত্র বা কার্যাদেশ প্রকাশ করা কঠিন কিছু হওয়ার কথা নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক, BMTF ও জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা সংস্থা: তিনটি সরাসরি অস্বীকৃতি
‘আমার দেশ’-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ISS ও MIS সেবা, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (BMTF)-এর ERP সেবা এবং জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা সংস্থাকে ডিভাইন আইটির গ্রাহক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ডিভাইন আইটি এই তিনটি দাবিই সরাসরি ও নিঃশর্তভাবে অস্বীকার করেছে:
তাদের লিখিত বক্তব্যে স্পষ্ট বলা হয়েছে—”বাংলাদেশ ব্যাংকের উল্লিখিত কাজের সঙ্গে ডিভাইন আইটি লিমিটেডের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।” “বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে ডিভাইন আইটি লিমিটেড কোনো ERP সার্ভিস প্রদান করেনি।” এবং “জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা সংস্থা ডিভাইন আইটি লিমিটেডের গ্রাহক নয়।”
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয়—BMTF-এর লোগো প্রসঙ্গে খোদ ‘আমার দেশ’-এর প্রতিবেদনেই আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে BMTF কী ধরনের সেবা নিয়েছে তা তাদের কাছেও স্পষ্ট নয়। অর্থাৎ, যে প্রতিষ্ঠানের নাম উদ্ধৃত করে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠান নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি—এটি অভিযোগের ভিত্তি কতটা দুর্বল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
NBR-এর ভ্যাট অটোমেশন: একটি মৌলিক বিভ্রান্তির উন্মোচন
সম্ভবত পুরো বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে সহজে যাচাইযোগ্য অংশ হলো NBR-সংক্রান্ত অভিযোগ। ‘আমার দেশ’ দাবি করেছে, ডিভাইন আইটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (NBR) ভ্যাট অটোমেশন সেবা দিয়েছে।
ডিভাইন আইটির ব্যাখ্যা এখানে প্রযুক্তিগতভাবে সুনির্দিষ্ট ও সহজবোধ্য। তাদের ভাষায়: “ডিভাইন আইটি লিমিটেড এনবিআরের নিজস্ব ভ্যাট অটোমেশন প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী বা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়। ডিভাইন আইটির নিজস্ব সফটওয়্যার PrismVAT এনবিআর কর্তৃক এনলিস্টেড ভ্যাট সফটওয়্যারগুলোর একটি।”
এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি। ২০১৮ সাল থেকে NBR ৫০টিরও বেশি বেসরকারি কোম্পানির ভ্যাট সফটওয়্যারকে বাজারে ব্যবহারের উপযোগী হিসেবে এনলিস্ট বা তালিকাভুক্ত করেছে—এর অর্থ এই নয় যে সেই কোম্পানিগুলো NBR-এর নিজস্ব সরকারি সিস্টেম তৈরি করেছে। ঠিক যেমন কোনো ব্যাংকের অনুমোদিত পেমেন্ট গেটওয়ে হওয়া আর সেই ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম তৈরি করা এক বিষয় নয়। এই মৌলিক প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক পার্থক্যটি গুলিয়ে ফেলে একটি সাধারণ, নিয়মমাফিক এনলিস্টমেন্টকে “রাষ্ট্রীয় সংস্থার সেবাদানকারী” হিসেবে উপস্থাপন করা—এটি প্রতিবেদনটির একটি স্পষ্ট তথ্যগত দুর্বলতা।
আরও উল্লেখযোগ্য, প্রতিবেদনেই NBR-এর একজন কর্মকর্তার (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বক্তব্য এসেছে যে ডিভাইন আইটি NBR-এর তালিকাভুক্ত একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান এবং তাদের কাজ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নেতিবাচক তথ্য পাওয়া যায়নি। এই বক্তব্য নিজেই ডিভাইন আইটির অবস্থানকে সমর্থন করে।
যেসব কাজ তারা স্বীকার করে, সেগুলোই আসল পরিচয়
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ডিভাইন আইটি সব অভিযোগ অন্ধভাবে অস্বীকার করছে না। বরং যেসব কাজ তারা প্রকৃতপক্ষে করেছে, তা তারা নিজেরাই স্পষ্টভাবে স্বীকার করছে এবং গর্বের সঙ্গে তুলে ধরছে—এটিই তাদের অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করে।
তাদের প্রকাশিত নথিতে স্পষ্ট রয়েছে: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)-এর জন্য PrismERP বাস্তবায়ন—অ্যাকাউন্টস, প্রকিউরমেন্ট, এইচআর ও পেরোল, ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট স্বয়ংক্রিয়করণ। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE)-এর জন্য PrismERP সরবরাহ, স্থাপন, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য একটি CCTV Command and Control Center তৈরি—যা প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম বড় বন্দর-নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছে, এবং যে বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তার ইতিবাচক প্রশংসাসূচক বক্তব্যও তাদের কোম্পানি প্রোফাইলে প্রকাশিত।
আর তিতাস গ্যাস-এর ক্ষেত্রে তো তাদের অবদান আরও সুনির্দিষ্ট ও ঐতিহাসিক। ২০১৫-১৬ সালে তিতাস গ্যাসের প্রায় ২৬ বছরের পুরোনো মেইনফ্রেম ডেটা মাইগ্রেশনসহ সম্পূর্ণ ERP বাস্তবায়নের বিশাল ও জটিল কাজ তারা সম্পন্ন করেছে—যা BASIS-এর ২০১৯ সালের সরকারি Software & IT Services Catalogue-এও নথিভুক্ত আছে, যেখানে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিজের প্রশংসাসূচক উক্তিও রয়েছে। তবে তারা এটাও স্পষ্ট করেছে যে ২০২৩ সালের পর থেকে তারা এই প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তায় যুক্ত নেই—এই স্বচ্ছতাই দেখায় তারা তথ্য লুকানোর চেষ্টা করছে না, বরং প্রতিটি দাবির সময়কাল ও পরিধি নিয়েও নির্ভুল থাকতে চাইছে।
কেন এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ
এখানে একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। ডিভাইন আইটি যেসব প্রকল্পে সত্যিই কাজ করেছে (BSEC, চট্টগ্রাম বন্দর, তিতাস গ্যাস, এবং বেসরকারি খাতে Tamim Group বা Buildtrade Foils Limited-এর মতো ৫০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠান), সেগুলো তারা প্রকাশ্যে, বিস্তারিতভাবে এবং গর্বের সঙ্গে তুলে ধরছে—সেখানে গ্রাহকের নিজস্ব প্রশংসাসূচক বক্তব্য পর্যন্ত রয়েছে। অথচ যেসব প্রকল্পের কথা ‘আমার দেশ’ দাবি করেছে কিন্তু আদতে ঘটেনি (আমার প্রবাসী, বাংলাদেশ ব্যাংক, BMTF, জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা সংস্থা, NBR-এর কোর সিস্টেম), সেগুলো তারা তাৎক্ষণিক ও সুনির্দিষ্টভাবে অস্বীকার করছে।
একটি প্রতিষ্ঠান যদি সত্যিই লুকানোর কিছু থাকত বা রাজনৈতিক সংযোগের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করত, তাহলে তারা সম্ভবত তাদের গ্রাহক-তালিকা এভাবে খোলাখুলি প্রকাশ করত না, বরং সামগ্রিকভাবে অস্পষ্টতা বজায় রাখার চেষ্টা করত। ডিভাইন আইটির আচরণ ঠিক তার বিপরীত—তারা প্রতিটি সত্য দাবিকে আলিঙ্গন করছে এবং প্রতিটি মিথ্যা দাবিকে চ্যালেঞ্জ করছে।
ডেটা সুরক্ষার প্রশ্নে তাদের অবস্থান যুক্তিসঙ্গত
ডিভাইন আইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো, ERP ও এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যারে গ্রাহকের আর্থিক তথ্য, ব্যবসায়িক লেনদেন ও পরিচালনাগত সংবেদনশীল তথ্য থাকে। তাই Non-Disclosure Agreement (NDA) ও চুক্তিগত গোপনীয়তার কারণে তারা প্রতিটি প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ বিবরণ প্রকাশ্যে দিতে পারে না। এটি কোনো অজুহাত নয়—বরং এটি বিশ্বব্যাপী এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার শিল্পের স্বীকৃত ও স্বাভাবিক পেশাগত মানদণ্ড। একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রাহকের গোপনীয়তা রক্ষা করাটাই বরং তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ, দুর্বলতা নয়।
রাসেলের প্রযুক্তিগত পটভূমি: অভিযোগের বিপরীতে বাস্তব অর্জন
যাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ, সেই ইকবাল আহমেদ ফখরুল হাসানের প্রযুক্তিগত পটভূমি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি রাজনৈতিক সংযোগ দিয়ে নয়, বরং প্রকৃত কারিগরি দক্ষতা দিয়েই নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছেন। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সিস্টেম ডিজাইন, এন্টারপ্রাইজ বিজনেস অপারেটিং সিস্টেম ও সাইবার সিকিউরিটির মতো জটিল প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। তাঁর প্রায় ২৭ বছরের আইটি অভিজ্ঞতা এবং ডেটা সেন্টার প্রযুক্তিতে CDCP, CDCS ও CTDC-এর মতো আন্তর্জাতিক পেশাগত সনদও রয়েছে।
২০০৫ সালে ডিভাইন আইটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি নিজস্ব প্রযুক্তি পণ্য তৈরির পথে হেঁটেছেন—যা ছিল সে সময়ের বাংলাদেশে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, যখন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাঁর হাতে তৈরি হওয়া PrismERP আজ ৫০০-এর বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ২০১৭ সালে APICTA International Awards, ২০২০ সালে WITSA Global Excellence ICT Awards এবং ২০২৩ সালে Brac Bank–The Daily Star ICT Awards-এ ICT Solution Provider of the Year স্বীকৃতিসহ একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে।
সময়ের কাকতালীয়তা নিয়ে প্রশ্ন
একটি বিষয় উপেক্ষা করা কঠিন—এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে ঠিক সেই সময়ে, যখন রাসেল BASIS-এর ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের নির্বাহী পরিষদ নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিমধ্যে এই সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে একজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে এ ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ সামনে আসাটা নিছক কাকতালীয় কি না, সেই প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়।
ডিভাইন আইটির পক্ষ থেকেও এই সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—এত বছর পর হঠাৎ কেন এই অভিযোগ। যদিও কোনো পক্ষ পরিকল্পিতভাবে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়েছে কি না, তার স্বাধীন প্রমাণ এখনো নেই, তবে সময়ের এই মিল অন্তত পাঠকদের সতর্ক দৃষ্টিতে বিষয়টি বিবেচনা করার একটি যৌক্তিক কারণ তৈরি করে।
দুই দশকের অর্জন বনাম প্রমাণহীন অভিযোগ
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আসা যাক—একটি প্রতিষ্ঠানকে বিচার করার প্রকৃত মানদণ্ড কী হওয়া উচিত?
২০০৫ সাল থেকে ডিভাইন আইটি নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে PrismERP-এর মতো একটি সম্পূর্ণ দেশীয় এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার তৈরি করেছে, যা আজ শত শত প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হচ্ছে। তারা LinesPay, PrismVAT, Centroid, PrismATS, PrismPOS, PrismDMS, PrismVMS-এর মতো একগুচ্ছ নিজস্ব সফটওয়্যার পণ্য তৈরি করেছে—১২টি কপিরাইটকৃত পণ্য এবং ২১৫-এর বেশি কর্মীর একটি দক্ষ প্রযুক্তি দল গড়ে তুলেছে। এই অর্জন প্রমাণ করে, বাংলাদেশে বসেই বিশ্বমানের এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার তৈরি সম্ভব—এবং এটি কোনো রাজনৈতিক সহায়তার ফসল নয়, বরং দুই দশকের কঠোর পরিশ্রম, কারিগরি দক্ষতা ও গ্রাহকের আস্থার ফল।
অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, তার একটিরও পক্ষে কোনো চুক্তিপত্র, কার্যাদেশ বা প্রাথমিক নথি প্রকাশিত হয়নি। বরং প্রতিটি নির্দিষ্ট, সুনির্দিষ্ট দাবির পাল্টা জবাবে ডিভাইন আইটি তাৎক্ষণিক ও স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, এবং যেখানে তারা প্রকৃতপক্ষে কাজ করেছে, সেখানে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে তথ্য দিয়েছে।
শেষ কথা
রাসেলের নিজের ভাষায়, “একটি দেশীয় সফটওয়্যার কোম্পানি দুই দশকের বেশি সময় ধরে নিজস্ব পণ্য তৈরি করে, দক্ষ প্রযুক্তি জনবল গড়ে তুলে এবং দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেবা দিয়ে যে অবস্থানে পৌঁছায়, তা রাতারাতি তৈরি হয় না। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে এমন প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করা হলে তার প্রভাব পুরো স্থানীয় সফটওয়্যার বাজারেও পড়তে পারে।”
এই বক্তব্যে যুক্তির জোর আছে। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত এখনো তুলনামূলকভাবে তরুণ একটি শিল্প, যেখানে ডিভাইন আইটির মতো হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি তৈরি করে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় টিকে আছে। প্রমাণবিহীন, অনামা সূত্র-নির্ভর অভিযোগের মাধ্যমে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করা হলে তার আঘাত শুধু একটি কোম্পানিতে সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি পুরো দেশীয় সফটওয়্যার শিল্পের প্রতি বিনিয়োগকারী, গ্রাহক ও নীতিনির্ধারকদের আস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ডিভাইন আইটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের মূল্যায়ন হওয়া উচিত রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়—বরং তাদের প্রযুক্তি, মেধাস্বত্ব, পেশাগত দক্ষতা এবং দুই দশকের বাস্তব কাজের ভিত্তিতে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সব তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করলে এই দাবিটিকেই সবচেয়ে বেশি সমর্থনযোগ্য বলে মনে হয়।
তথ্যসূত্র: ডিভাইন আইটি লিমিটেডের অফিসিয়াল লিখিত প্রতিবাদ ও বক্তব্য; প্রতিষ্ঠানটির Leadership, Products, Awards ও Company Profile সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য; BASIS-এর Software & IT Services Catalogue (২০১৯); দৈনিক ‘আমার দেশ’-এ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত মূল প্রতিবেদন ও তাতে উদ্ধৃত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য





ষড়যন্ত্রের থাবানল থেকে মুক্ত হয়ে ডিভাইন আইটির মতো দেশীয় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো আরো দীপ্ত পায়ে এগিয়ে চলুক।।