ডাটা সেন্টার চালাতে বিদ্যুৎ লাগে, সেই বিদ্যুতের তাপ সামলাতে কোথাও পানি ব্যবহার হয়। কিন্তু ‘প্রতি প্রশ্নে এক বোতল পানি’—এই ভাইরাল হিসাব আসলে কতটা সত্যি?
ঢাকা | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একটি বাক্য লিখে ছবি বানানো বা প্রশ্নের উত্তর নেওয়া—ব্যবহারকারীর কাছে এটি কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। কিন্তু পর্দার আড়ালে কাজ করে বিশাল এক কম্পিউটিং অবকাঠামো, যেখানে হাজার হাজার প্রসেসর বিদ্যুৎ খরচ করে প্রচুর তাপ তৈরি করে। সেই তাপ সরাতেই লাগে কুলিং সিস্টেম—আর কিছু কুলিং সিস্টেমে লাগে পানি। এখান থেকেই প্রশ্ন—এআই কি ক্রমেই মানুষের পানির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে? উত্তরটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সরল হিসাবের চেয়ে অনেক জটিল।
এআই সরাসরি ‘পানি খায়’ না—আসল গল্প তাপ নিয়ে
এআই মডেল কোনো পানি ব্যবহার করে না; ডাটা সেন্টারের GPU চিপ গণনা করার সময় বিদ্যুৎ থেকে তাপ তৈরি হয়, আর সেই তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেই কুলিং দরকার। International Energy Agency (IEA)-র হিসাবে, দক্ষ hyperscale ডাটা সেন্টারে কুলিং বিদ্যুৎ খরচের প্রায় ৭ শতাংশ নেয়, কম দক্ষ প্রতিষ্ঠানে তা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ পানির প্রশ্নটি আসলে তাপ-ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।
কুলিং প্রযুক্তিভেদে পানি লাগে কম-বেশি
কিছু ডাটা সেন্টারে evaporative cooling ব্যবহার হয়, যেখানে পানির একাংশ বাষ্পীভূত হয়ে তাপ সরায়। আবার air/dry cooling-এ পানি লাগে না; আর নতুন প্রজন্মের direct-to-chip liquid cooling-এ coolant একই সার্কিটে বারবার ঘোরে বলে পরিচালনগত পানি খরচ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি হতে পারে। Meta জানিয়েছে, তাদের কিছু নতুন ডাটা সেন্টারে এমন closed-loop ও dry-cooling নকশা ব্যবহৃত হচ্ছে যেখানে কুলিংয়ে কোনো অপারেশনাল পানি খরচই হয় না। ফলে “ডাটা সেন্টার মানেই অবিরাম পানি ঢালা”—এই সরল সমীকরণ ঠিক নয়।
এই পানির উৎসও সব জায়গায় এক নয়—কোথাও সুপেয় পানি, কোথাও পুনর্ব্যবহৃত (recycled/reclaimed) পানি ব্যবহৃত হয়। তাই “এআই খাবার পানির লাইন থেকেই সরাসরি পানি নিচ্ছে”—এমন সার্বজনীন দাবি অতিরঞ্জিত। তবে ঝুঁকি একেবারে অমূলকও নয়—কোনো ডাটা সেন্টার পানি-সংকটপূর্ণ এলাকায় বসে freshwater-নির্ভর evaporative cooling ব্যবহার করলে স্থানীয় পানিসম্পদে চাপ পড়তে পারে। এখানেই বৈশ্বিক সমস্যা আর স্থানীয় চাপ-এর পার্থক্যটা জরুরি।
‘প্রতি ২০-৫০ প্রশ্নে আধা লিটার’ কথাটা এলো কোথা থেকে
এই বিভ্রান্তির মূল উৎস UC Riverside-এর ২০২৩ সালের গবেষণা “Making AI Less Thirsty” (Li, Yang, Islam ও Ren)। গবেষণাটি দেখিয়েছে, Microsoft-এর মার্কিন ডাটা সেন্টারে GPT-3 প্রশিক্ষণে সরাসরি প্রায় ৭ লাখ লিটার পানি বাষ্পীভূত হতে পারে (সামগ্রিকভাবে ৫৪ লাখ লিটার), এবং একটি ৫০০ মিলিলিটার পানির বোতলের সমতুল্য পানি খরচ প্রায় ১০ থেকে ৫০টি মাঝারি-দৈর্ঘ্যের উত্তরের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে।
কিন্তু এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট মডেল, নির্দিষ্ট সময় ও অবকাঠামোর হিসাব—সব এআই মডেলের সার্বজনীন সংখ্যা নয়। প্রযুক্তি দ্রুত বদলেছে। Google তাদের ২০২৫ সালের প্রযুক্তিগত পরিমাপে জানিয়েছে, একটি median Gemini টেক্সট প্রম্পট মাত্র ০.২৬ মিলিলিটার (প্রায় পাঁচ ফোঁটা) পানি ব্যবহার করে। দুই সংখ্যায় এত ফারাক কেন? কারণ এগুলো ভিন্ন মডেল, ভিন্ন ডাটা সেন্টার ও ভিন্ন পদ্ধতিতে মাপা—তাই একটিমাত্র সংখ্যা দিয়ে পুরো শিল্পকে বিচার করা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল।
সব এআই কাজের খরচ সমান নয়
সাধারণ টেক্সট জেনারেশনের চেয়ে দীর্ঘ reasoning, জটিল agentic কাজ এবং বিশেষত ভিডিও জেনারেশনে অনেক বেশি গণনা লাগে। IEA-র ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ বলছে, কিছু নিবিড় এআই অ্যাপ্লিকেশন সাধারণ টেক্সট জেনারেশনের চেয়ে শত বা হাজার গুণ বেশি শক্তি ব্যবহার করতে পারে। ২০২৫ সালের আরেক গবেষণায় ১৭টি অত্যাধুনিক ইমেজ-জেনারেশন মডেল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মডেলভেদে শক্তি খরচে ৪৬ গুণ পর্যন্ত পার্থক্য থাকতে পারে, আর রেজল্যুশন দ্বিগুণ করলে খরচ ১.৩ থেকে ৪.৭ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তাই “একটি এআই ছবি = নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি”—এমন কোনো সার্বজনীন সংখ্যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
হিসাবটা আরও বড়: শুধু কুলিং টাওয়ারেই শেষ নয়
গবেষকরা এআইয়ের পানির পদচিহ্ন তিন স্তরে দেখেন—onsite operational water (ডাটা সেন্টারের ভেতরে সরাসরি ব্যবহৃত), offsite water (বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত পানি) এবং embodied water (চিপ ও হার্ডওয়্যার তৈরির সাপ্লাই চেইনে ব্যবহৃত পানি)। শুধু ডাটা সেন্টারের ভেতরের পানি দেখলে প্রকৃত পদচিহ্নের পুরো চিত্র বোঝা যায় না।
বৈশ্বিক মাত্রা কতটা বড়
একই গবেষণাপত্র অনুমান করেছে, বৈশ্বিক এআই চাহিদার কারণে ২০২৭ সালে water withdrawal প্রায় ৪.২ থেকে ৬.৬ বিলিয়ন ঘনমিটারে পৌঁছাতে পারে—যদিও প্রকৃত evaporative consumption এর চেয়ে অনেক কম, প্রায় ০.৩৮ থেকে ০.৬০ বিলিয়ন ঘনমিটার। এখানে withdrawal (কোনো উৎস থেকে তোলা পানি) আর consumption (যে অংশ আর ফিরে আসে না, যেমন বাষ্পীভূত হওয়া) এক জিনিস নয়—এই পার্থক্য না বুঝলে এআইয়ের পানি-ঝুঁকিকে ভুলভাবে অনেক বড় বা অনেক ছোট দেখানো সহজ। ২০২৫ সালের আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, সার্ভার দক্ষতা, কুলিং প্রযুক্তি, জলবায়ু ও বিদ্যুৎ উৎসভেদে ডাটা সেন্টারের পানি ব্যবহারে ১০ হাজার গুণের বেশি তারতম্য থাকতে পারে।
তাই বৈশ্বিকভাবে এআইয়ের পানির অংশ পুরো পানি-ব্যবস্থার তুলনায় ছোট থাকলেও, IEA সতর্ক করছে—ডাটা সেন্টারের প্রভাব নির্দিষ্ট কয়েকটি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে তা যথেষ্ট দৃশ্যমান হতে পারে। একটি পানি-সংকটপূর্ণ শহরে একটিমাত্র বড় ডাটা সেন্টারের প্রভাব তাই উপেক্ষা করার মতো নয়।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও সমস্যাটি বুঝছে
Google জানিয়েছে, ২০২৪ সালে তারা প্রায় ৪৫০ কোটি গ্যালন পানি replenish করেছিল (সে বছরের freshwater consumption-এর ৬৪ শতাংশ), আর তাদের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ৭৭০ কোটি গ্যালনে পৌঁছেছে—যা ওই বছরের মোট freshwater consumption-এর প্রায় ৭৮ শতাংশের সমতুল্য। Meta ২০৩০ সালের মধ্যে water positive হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কুলিংয়ে পানি কমানোর একাধিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অর্থাৎ শিল্পের ভেতরেই “আরও এআই” ও “কম পানিতে এআই”—দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জনের চেষ্টা চলছে। এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে dry cooling, closed-loop liquid cooling এবং পানি-স্বল্প অঞ্চলে ডাটা সেন্টার স্থাপনে।
বাংলাদেশের জন্য কেন এই আলোচনা জরুরি
বাংলাদেশে এআই নিয়ে আলোচনা এখনো মূলত চাকরি, শিক্ষা ও ফ্রিল্যান্সিং কেন্দ্রিক। কিন্তু ভবিষ্যতে বড় এআই অবকাঠামো এলে পানিও নীতিগত আলোচনার অংশ হতে হবে। দেশ জলসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ, নগরায়ণ, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সব অঞ্চলে সারাবছর নিরাপদ পানির প্রাচুর্য নেই। তাই ভবিষ্যতে দেশে বড় ডাটা সেন্টার বসাতে হলে শুধু জমি-বিদ্যুৎ-সংযোগ নয়, দেখতে হবে—কোন watershed-এ বসছে, কী ধরনের কুলিং ব্যবহার হবে, কতটা পানি তুলবে ও কতটা প্রকৃতপক্ষে consume করবে, reclaimed water ব্যবহারের সুযোগ আছে কি না। এটি নিছক এআই নীতি নয়—পানি নীতিরও অংশ।
তাহলে চূড়ান্ত রায় কী
এআইয়ের পরিবেশগত খরচ বাস্তব—বিদ্যুৎ, হার্ডওয়্যার, ডাটা সেন্টার এবং কিছু ক্ষেত্রে পানি সত্যিই লাগে, আর অবকাঠামো বাড়ার সঙ্গে এই পদচিহ্নও বড় হতে পারে। কিন্তু “প্রতি প্রশ্নে এক বোতল পানি” বা “এআই পৃথিবীর সব খাবার পানি শেষ করে দেবে”-জাতীয় সাধারণীকরণও সমান ভুল। Ren-এর গবেষণা ও Google-এর নিজস্ব পরিমাপ—দুটোই সঠিক পদ্ধতিতে করা, তবু ফলাফলে হাজার গুণ পার্থক্য দেখায় একটাই শিক্ষা: প্রযুক্তির প্রভাব বিচার করতে হেডলাইন নয়, পদ্ধতি (কোন মডেল, কোন ডাটা সেন্টার, কোন কুলিং, withdrawal নাকি consumption) দেখতে হবে।
আসল প্রশ্ন তাই “এআই বন্ধ করব কি না” নয়—প্রশ্ন হলো, কম শক্তি ও কম পানিতে এআই তৈরি সম্ভব কি না, পানি-সংকটপূর্ণ অঞ্চলে ডাটা সেন্টার বসানোর আগে water-impact assessment বাধ্যতামূলক করা যায় কি না, আর প্রতিটি এআই কোম্পানি তাদের শক্তি ও পানির পদচিহ্ন স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করবে কি না। এআই আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে—কিন্তু তার সাফল্য মাপা উচিত শুধু গতি বা মানে নয়, বরং সেই বুদ্ধিমত্তা তৈরিতে কত বিদ্যুৎ, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যয় হচ্ছে, তা দিয়েও।
তথ্যসূত্র: International Energy Agency (IEA), Google Environmental Report 2026 ও Google Cloud-এর AI inference পরিমাপ পদ্ধতি (arXiv, ২০২৫), Meta Sustainability/Water Stewardship প্রতিবেদন, Li, Yang, Islam ও Ren, “Making AI Less Thirsty” (UC Riverside/UT Arlington, arXiv 2304.03271), Resources, Conservation & Recycling (2025), Water Research (2026)




