Homeটুডে ওয়ার্ল্ডফিদেল কাস্ত্রো: বন্দুক হাতে বিপ্লব থেকে শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহী রাষ্ট্রনায়ক

ফিদেল কাস্ত্রো: বন্দুক হাতে বিপ্লব থেকে শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহী রাষ্ট্রনায়ক

বিশ শতকের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু নেতা আছেন, যাঁদের নাম শুনলেই একসঙ্গে বিপ্লব, আদর্শ, বিতর্ক এবং ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া মনে আসে। ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন তাঁদের অন্যতম। কেউ তাঁকে লাতিন আমেরিকার মুক্তির প্রতীক বলেছেন, কেউ দেখেছেন সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নের নির্মাতা হিসেবে, আবার সমালোচকেরা তাঁকে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসক বলে আখ্যায়িত করেছেন।

কিন্তু মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও একটি বিষয়ে খুব কমই দ্বিমত আছে—ফিদেল কাস্ত্রো কেবল কিউবাকে পরিবর্তন করেননি, তিনি শীতল যুদ্ধের বৈশ্বিক রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন।

প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ক্ষমতায় থাকা এই মানুষটি ছিলেন একাধারে গেরিলা যোদ্ধা, রাষ্ট্রনির্মাতা, তাত্ত্বিক বক্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ।

জন্ম ও শৈশব: চিনি বাগানের প্রান্তে বেড়ে ওঠা

ফিদেল আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো রুজ জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট কিউবার ওরিয়েন্তে প্রদেশের বিরান অঞ্চলে।

তাঁর বাবা আনহেল কাস্ত্রো ছিলেন স্পেন থেকে আসা এক কৃষক, যিনি পরে চিনি বাগানের বড় মালিক হয়ে ওঠেন। মা লিনা রুজ ছিলেন পারিবারিক কর্মচারী, যিনি পরে আনহেলের স্ত্রী হন।

পরিবার অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ছিল, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ফিদেল কিউবার গভীর সামাজিক বৈষম্য লক্ষ্য করেন। একদিকে বিশাল জমির মালিক শ্রেণি, অন্যদিকে দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিকদের কষ্ট—এই বাস্তবতা তাঁর মনে প্রশ্ন তৈরি করেছিল।

শৈশবে তিনি ছিলেন জেদি, আত্মবিশ্বাসী এবং তীব্র প্রতিযোগিতাপ্রবণ।

তাঁর শিক্ষকরা পরবর্তীতে বলেছিলেন, তিনি এমন একজন ছাত্র ছিলেন যিনি সাধারণ নিয়মের মধ্যে থাকতে চাইতেন না।

শিক্ষা: ক্যাথলিক স্কুল থেকে আইন বিভাগ

ফিদেলের প্রাথমিক শিক্ষা হয় ক্যাথলিক স্কুলে।

পরবর্তীতে তিনি সান্তিয়াগোর বিখ্যাত জেসুইট পরিচালিত স্কুল বেলেন কলেজে ভর্তি হন।

এই প্রতিষ্ঠানে তাঁর মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব এবং আত্মবিশ্বাসের বিকাশ ঘটে।

১৯৪৫ সালে তিনি University of Havana-এ আইন বিভাগে ভর্তি হন।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর কাছে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না।

সেই সময় কিউবার ছাত্ররাজনীতি ছিল উত্তপ্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে সহিংসও।

এখানেই তিনি রাজনীতি, বিপ্লব এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি মার্ক্সবাদী সাহিত্য পড়তে শুরু করেন।

কার্ল মার্ক্স, এঙ্গেলস এবং লেনিনের ধারণা ধীরে ধীরে তাঁর চিন্তাকে প্রভাবিত করতে থাকে।

তরুণ বিপ্লবীর জন্ম

১৯৫২ সালে কিউবার রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে।

সেনাপ্রধান Fulgencio Batista সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন।

ফিদেল এই ঘটনাকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আঘাত হিসেবে দেখেন।

প্রথমে তিনি আইনি পথে লড়াই করার চেষ্টা করেন।

কিন্তু ব্যর্থ হয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন।

মনকাদা ব্যারাক আক্রমণ: ব্যর্থতা থেকে ইতিহাসের সূচনা

১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই তিনি সান্তিয়াগোর মনকাদা ব্যারাকে হামলা চালান।

এই অভিযান ব্যর্থ হয়।

অনেক বিদ্রোহী নিহত হন এবং ফিদেল গ্রেপ্তার হন।

আদালতে নিজের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি একটি ঐতিহাসিক বাক্য উচ্চারণ করেন—

“ইতিহাস আমাকে ক্ষমা করবে।”

এই বক্তৃতা পরবর্তীতে বিপ্লবী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে ওঠে।

তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হলেও পরে সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি দেওয়া হয়।

নির্বাসন, চে গুয়েভারা এবং বিপ্লবের প্রস্তুতি

কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি মেক্সিকোতে চলে যান।

সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় Che Guevara-এর সঙ্গে।

দুই তরুণ বিপ্লবী খুব দ্রুত একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।

তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে কিউবায় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

১৯৫৬ সালে “গ্রানমা” নামের ছোট একটি নৌকায় করে তাঁরা কিউবায় ফিরে আসেন।

তাঁদের অনেক সঙ্গী নিহত হলেও অল্প কয়েকজন পাহাড়ে আশ্রয় নিতে সক্ষম হন।

সিয়েরা মায়েস্ত্রা পাহাড় থেকেই শুরু হয় কিউবার বিপ্লব।

ক্ষমতার পথে উত্থান

১৯৫৯ সালে বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।

ফিদেল কাস্ত্রো বিজয়ী হয়ে হাভানায় প্রবেশ করেন।

প্রথমদিকে অনেকেই তাঁকে গণতান্ত্রিক সংস্কারক হিসেবে দেখেছিলেন।

কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুরু করেন।

ব্যাংক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বড় বড় সম্পদ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।

এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত খারাপ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত এবং শীতল যুদ্ধ

ফিদেল কাস্ত্রোর সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ছিল তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত।

১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত “বে অব পিগস” আক্রমণ ব্যর্থ হয়।

এই ব্যর্থতা ফিদেলের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।

এরপর তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হন।

১৯৬২ সালে পৃথিবী পারমাণবিক যুদ্ধের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

কিউবায় সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনকে কেন্দ্র করে শুরু হয় “কিউবান মিসাইল সংকট”।

বিশ্ব কয়েক দিনের জন্য কার্যত আতঙ্কে স্থবির হয়ে পড়েছিল।

সমাজতন্ত্রের নির্মাণ

ফিদেল স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষাকে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার দেন।

তাঁর শাসনামলে—

নিরক্ষরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়,

স্বাস্থ্যব্যবস্থা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়,

গড় আয়ু বৃদ্ধি পায়।

কিন্তু একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, খাদ্যসংকট এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে আসে।

বিরোধীরা অভিযোগ করেন—

বহুদলীয় রাজনীতি কার্যত বিলুপ্ত হয়,

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়,

বহু রাজনৈতিক বিরোধীকে কারাগারে পাঠানো হয়।

ব্যক্তিগত জীবন: রহস্য, শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘ বক্তৃতা

ফিদেলের ব্যক্তিগত জীবন সবসময় কিছুটা রহস্যে ঘেরা ছিল।

তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন মির্তা দিয়াজ-বালার্ট।

পরবর্তীকালে তাঁর একাধিক সম্পর্কের কথা বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।

তাঁর বহু সন্তানের কথাও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে।

ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কর্মঠ।

তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য।

কখনো কখনো টানা পাঁচ বা ছয় ঘণ্টাও তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন।

সবুজ সামরিক পোশাক এবং দাড়িওয়ালা চেহারা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানো

২০০৬ সালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি ধীরে ধীরে ক্ষমতা হস্তান্তর শুরু করেন।

২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দেন।

তাঁর ভাই Raul Castro তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।

মৃত্যু এবং উত্তরাধিকার

২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর, ৯০ বছর বয়সে ফিদেল কাস্ত্রো মারা যান।

তাঁর মৃত্যু বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

হাভানায় হাজারো মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা জানায়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বহু কিউবান নির্বাসিত তাঁর মৃত্যুকে উদ্‌যাপন করেন।

আজও ইতিহাসবিদরা তাঁকে নিয়ে বিভক্ত।

কারও কাছে তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক।

কারও কাছে তিনি কর্তৃত্ববাদী শাসক।

তবে একটি বিষয় নিয়ে খুব কমই বিতর্ক আছে—

ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি ছোট একটি দ্বীপ রাষ্ট্রকে বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর কূটনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন, কখনো কখনো একটি বিপ্লব শুধু একটি সরকার পরিবর্তন করে না; এটি বিশ্বরাজনীতির ভাষাও বদলে দিতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments