চাহিদামতো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস না পাওয়ায় সরবরাহ বাড়াতে পারছে না পেট্রোবাংলা
দেশে গ্যাসের ঘাটতি কমাতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও এবার সেই এলএনজিই চাহিদামতো পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথম আলোর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ক্রয়াদেশ দেওয়া একটি এলএনজি কার্গো দেশে আসেনি। আগস্ট মাসের জন্য তিনটি কার্গো কিনতে তিন দফা দরপত্র ডেকে পাওয়া গেছে মাত্র দুটি। ফলে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর পথ সীমিত হয়ে পড়েছে।
পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড বা আরপিজিসিএল এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামও দ্রুত বেড়েছে। গত জানুয়ারিতে এশিয়ার স্পট বাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল প্রায় ১০ থেকে ১১ ডলার। জুলাইয়ের শেষ দিকে তা প্রায় ২২ ডলারে উঠে যায়।
টার্মিনাল থাকলেও পর্যাপ্ত গ্যাস নেই
বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি করছে। মহেশখালীতে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি সামিটের। দুটির সম্মিলিত সর্বোচ্চ সরবরাহক্ষমতা দিনে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট। কিন্তু ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে।
টানা ২৫ দিনের তীব্র সংকটের পর ১৫ আগস্ট সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। কিন্তু নতুন এলএনজি কার্গো না থাকায় এক্সিলারেট থেকে সরবরাহ আবার কমতে থাকে এবং ১৯ আগস্ট তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরে নতুন করে দরপত্র ডেকে একটি কার্গো আনা হলে সরবরাহ আবার শুরু হয়, কিন্তু পরবর্তী কার্গো নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় সরবরাহ সীমিত রাখা হয়েছে।
শিল্প ও বিদ্যুতে প্রভাব
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসনির্ভর কারখানায় চাপ কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস না পেলে বিকল্প জ্বালানির দিকে যেতে বাধ্য হয়, ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।
প্রথম আলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমান বাজারদরে এলএনজি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ফার্নেস তেল ব্যবহার করার তুলনায়ও বেশি হতে পারে। ফলে গ্যাসের ঘাটতি পূরণে তেলনির্ভর উৎপাদন বাড়াতে হলে সরকারের ভর্তুকি, কর ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক দামই বড় বাধা
বর্তমান সংকটের আরেকটি কারণ আন্তর্জাতিক বাজার। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে এশিয়ার বাজারে এলএনজির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বেশি দামে জরুরি এলএনজি কিনতে হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ পড়ে। তবে বর্তমানে রিজার্ভ তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে থাকায় বাড়তি আমদানি ব্যয় কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের সামনে এখন অগ্রাধিকার ঠিক করে গ্যাস সরবরাহ করা, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এলএনজি কেনার কৌশল ঠিক করার প্রশ্ন রয়েছে। কারণ গ্যাস সংকট দীর্ঘ হলে এর প্রভাব শুধু শিল্পে নয়, বিদ্যুৎ, পরিবহন, ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো; পেট্রোবাংলা; আরপিজিসিএল; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।




