Homeটুডে বাংলাপদ্মার পানি আরও বাড়লে বিপদ বাড়বে, কুষ্টিয়ায় পানিবন্দী প্রায় ৬০ হাজার

পদ্মার পানি আরও বাড়লে বিপদ বাড়বে, কুষ্টিয়ায় পানিবন্দী প্রায় ৬০ হাজার

৩৫ গ্রামের মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন; ডুবে গেছে শত শত হেক্টর কৃষিজমি, বিষধর সাপ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ

কুষ্টিয়া | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পদ্মা নদীর পানি আবারও বাড়তে থাকায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার চরাঞ্চলে মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের ৩৫টি গ্রামের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি আরও ৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে নদীর পানি এখন বিপৎসীমার মাত্র ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কয়েক দিন ধরে পানি দ্রুত বাড়ায় অনেক ঘরবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন কোথাও কোথাও নৌকা ও অস্থায়ী ভেলা ছাড়া চলাচলের উপায় নেই। চরাঞ্চলে বিষধর সাপের উপস্থিতিও বেড়ে যাওয়ায় শিশু ও বয়স্কদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এক সপ্তাহের দ্রুত উত্থান

পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাইড্রোলজি বিভাগের হিসাবে, শনিবার সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি ১৩ দশমিক ০৫ মিটার উচ্চতায় ছিল। বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার।

এর আগের দিন একই সময়ে পানি ছিল ১৩ দশমিক ০২ মিটার।

অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি হয়েছে ৩ সেন্টিমিটার।

তবে গত এক সপ্তাহে পানি বৃদ্ধির হার ছিল অনেক বেশি—প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার। গত ২৪ ঘণ্টায় সেই গতি কমেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিই এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ।

৩৫ গ্রামের মানুষের জীবন থমকে

চিলমারী ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টি প্লাবিত হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের হিসাবে সেখানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী।

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের সব ১৬টি গ্রামই পানিতে ঘেরা বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। সড়ক ডুবে যাওয়ায় স্বাভাবিক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ।

মানুষজন নৌকায় করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরাচ্ছেন। কোথাও গবাদিপশুকেও নিরাপদ জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

কৃষিতেও বড় আঘাত

শুধু বসতবাড়ি নয়, পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমিও।

দৌলতপুর উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চিলমারী, রামকৃষ্ণপুর, ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়নের প্রায় ৩৫১ হেক্টর কৃষিজমি ইতিমধ্যে পানিতে ডুবে গেছে।

মরিচা ও কলাচাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

পানি যদি আরও বাড়ে, তাহলে ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে পারে।

এখনো বিপৎসীমার ওপরে নয়

পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পদ্মার পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।

গত ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়াও কিছুটা স্বস্তির কারণ।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারাই বলছেন, এই মুহূর্তে পানি আর বাড়বে নাকি কমবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

অর্থাৎ পরিস্থিতি এখনো পর্যবেক্ষণনির্ভর।

চরাঞ্চলে আরেক ভয়—বিষধর সাপ

বন্যার পানিতে চরাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যাওয়ায় বিষধর সাপের উপদ্রব বেড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

পানি বাড়লে সাপ সাধারণত শুকনো ও উঁচু জায়গার দিকে উঠে আসে। ফলে পানিবন্দী পরিবারগুলোর জন্য বাড়িঘরের ভেতরেও ঝুঁকি তৈরি হয়।

চিকিৎসা সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি এবং নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি এখন সাপের কামড়ের জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে এর প্রভাব কতটা?

পদ্মা অববাহিকার বন্যা শুধু স্থানীয় দুর্ভোগের বিষয় নয়।

চরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে কৃষকের আয়, স্থানীয় বাজার ও খাদ্য সরবরাহের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ফল, সবজি ও ধানের জমি দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকলে ক্ষতি পুনরুদ্ধারে সময় লাগে।

আপাতত সবচেয়ে জরুরি

পানিবন্দী মানুষের নিরাপদ চলাচল, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, জরুরি ওষুধ এবং গবাদিপশুর নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করলে আগাম সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখতে হবে।

কারণ নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও দিকটি কোন দিকে যাবে—সেটিই আগামী কয়েক দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

তথ্যসূত্র: The Business Standard, UNB, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments