সরকার বলছে মজুত পর্যাপ্ত, কৃষকের অভিযোগ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে; রাজশাহী, কুড়িগ্রামসহ কয়েক জেলায় উত্তেজনা
দেশে সার সংকট আছে কি না—এই প্রশ্নের সঙ্গে এখন আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে: সরকারি গুদামে থাকা সার কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না। কৃষি মন্ত্রণালয় ও সরকার দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার কথা বললেও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার কৃষকেরা ডিএপি, টিএসপি ও ইউরিয়া সার পেতে সমস্যার অভিযোগ করছেন। কোথাও সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে, আবার কোথাও কৃষকেরা বিক্ষোভ করেছেন। ফলে জাতীয় মজুতের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জাতীয় ঘাটতি নাকি স্থানীয় সরবরাহ সমস্যা
The Business Standard-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রাজশাহী, কুড়িগ্রাম ও নওগাঁসহ কয়েকটি এলাকার কৃষকদের সমস্যার কথা উঠে এসেছে।
অন্যদিকে সরকার বলছে, দেশে সার মজুত রয়েছে এবং সারা দেশে ঘাটতি নেই।
অর্থাৎ বিতর্কটি মূলত সরবরাহের পরিমাণ নিয়ে নয়; কৃষকের প্রয়োজনের সময় নির্ধারিত দামে সেই সার হাতে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটি নিয়ে।
কৃষকের অভিযোগ
আমন ধানের মৌসুমে ডিএপি ও টিএসপির চাহিদা বাড়ে।
কৃষকদের একটি অংশের অভিযোগ, অনুমোদিত ডিলারের কাছে গিয়ে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু এলাকায় অননুমোদিত বিক্রেতাদের কাছ থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং সময়মতো সার প্রয়োগ করা নিয়েও কৃষকেরা সমস্যায় পড়ছেন।
সরকারের অবস্থান
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সার মজুত পর্যাপ্ত।
কৃষি মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসন কিছু জায়গায় কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও অতিরিক্ত দামের অভিযোগ তদন্ত করছে।
মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার।
সংখ্যার পেছনের বাস্তব সমস্যা
The Financial Express-এর বিশ্লেষণে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ের জন্য সারের চাহিদা ছিল প্রায় ১৩ লাখ ২১ হাজার টন।
সরকারি মজুত ছিল প্রায় ১২ লাখ ৪৫ হাজার টন। এর সঙ্গে ডিলার পর্যায়ের মজুত এবং পথে থাকা আমদানিও রয়েছে।
অর্থাৎ কাগজে মোট সরবরাহ চাহিদা মেটানোর মতো হলেও মাঠ পর্যায়ে কোন এলাকায় কত সার পৌঁছেছে, সেটিই মূল প্রশ্ন।
কেন আমন মৌসুমে বিষয়টি সংবেদনশীল
আমন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদন মৌসুম।
সময়মতো সার পাওয়া না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। আবার বেশি দামে সার কিনলে কৃষকের লাভ কমে যায় এবং উৎপাদন খরচ বাড়ে।
শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব চালের বাজারেও পড়তে পারে—যদিও বর্তমান সার বিতরণ পরিস্থিতির সঙ্গে ভবিষ্যৎ চালের দাম সরাসরি কতটা বদলাবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যায় না।
কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন কয়েকটি উত্তরাঞ্চলীয় এলাকায় সার মজুত করে দাম বাড়ানোর চেষ্টার অভিযোগ করেছে।
সংগঠনটির দাবি, পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কিছু অননুমোদিত ব্যবসায়ী সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
📊 মাঠের চিত্র
- জুলাই-সেপ্টেম্বর চাহিদা: প্রায় ১৩.২১ লাখ টন
- সরকারি মজুতের হিসাব: প্রায় ১২.৪৫ লাখ টন
- আলোচিত সার: ইউরিয়া, DAP, TSP
- সমস্যার এলাকা: রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, নওগাঁসহ কয়েক জেলা
- সরকারের বক্তব্য: জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত আছে
- কৃষকদের অভিযোগ: স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহ ও দামে সমস্যা
কৃষকের জন্য মূল প্রশ্ন
সরকারের গুদামে কত সার আছে—এই পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে কত সার পৌঁছেছে, তার হিসাব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি বিভাগের ডিলারভিত্তিক বিতরণ, মজুত ও বিক্রির তথ্য প্রকাশ করা গেলে সার সংকট নিয়ে বর্তমান বিরোধ আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা সম্ভব হবে।
সামনে কী
আমন মৌসুম শেষ হওয়ার আগে সরকার যদি বিতরণ ব্যবস্থার সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
কিন্তু স্থানীয় সংকট দীর্ঘায়িত হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ, ফলন এবং পরবর্তী সময়ে খাদ্যবাজার—তিন জায়গাতেই এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
তথ্যসূত্র: The Business Standard, The Daily Star, The Financial Express, কৃষি মন্ত্রণালয়




