Homeটুডে বাংলা‘আওয়াজে’ দুই দিনে ৭৮ অভিযোগ: নীরবতার আড়ালে শিশু যৌন নিপীড়নের কতটা অদৃশ্য?

‘আওয়াজে’ দুই দিনে ৭৮ অভিযোগ: নীরবতার আড়ালে শিশু যৌন নিপীড়নের কতটা অদৃশ্য?

বেনামি প্ল্যাটফর্মে উঠে আসছে শৈশবের নিপীড়নের অভিজ্ঞতা; ১০–১২ বছর বয়সীদের অভিযোগ বেশি, বাসাবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—দুই জায়গাতেই ঝুঁকি

টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান

শিশু যৌন নিপীড়নের সবচেয়ে বড় সংকট অনেক সময় ঘটনাটি নয়, বরং ঘটনার পরের নীরবতা। ভয়, লজ্জা, পারিবারিক চাপ কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে ক্ষমতার অসম সম্পর্কের কারণে অনেক শিশু তখন কথা বলতে পারে না। সেই চাপা অভিজ্ঞতাই বহু বছর পর সামনে আসছে ‘আওয়াজ ডট বিডি’ নামের একটি বেনামি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে।

৭ সেপ্টেম্বর চালুর পর অল্প সময়েই প্ল্যাটফর্মটিতে ৭৮টি অভিজ্ঞতা জমা পড়েছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। এর আগে প্রথম ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৪৫টি এবং ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরের দিকে প্রায় ৬০টি অভিজ্ঞতা প্রকাশের কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

তবে এই সংখ্যা বাংলাদেশের শিশু যৌন নিপীড়নের মোট চিত্র নয়। এগুলো self-reported, বেনামি বয়ান; প্রতিটি ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই হয়েছে বা আদালতে প্রমাণিত—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তাই ৭৮টি রিপোর্টকে জাতীয় পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিন নীরব থাকা অভিজ্ঞতার একটি দৃশ্যমান নমুনা হিসেবে দেখা জরুরি।

সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ১০–১২ বছর বয়সে

‘আওয়াজ’-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১০–১২ বছর বয়সী শিশুদের নিয়ে অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। এরপর ৭–৯ বছর বয়সীদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত কম বয়সেই অনেক শিশু এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন, যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা অভিযোগ জানানোর ক্ষমতা তাদের সীমিত।

এই বয়সে শিশু অনেক সময় ঘটনাটির প্রকৃতি বুঝতে পারে না। আবার অভিযুক্ত ব্যক্তি শিক্ষক, বড় শিক্ষার্থী, আত্মীয় বা পরিচিত কেউ হলে ভয় ও বিভ্রান্তি আরও বাড়তে পারে।

ঘটনাস্থল শুধু স্কুল-মাদ্রাসা নয়, বাড়িও

‘আওয়াজ’-এর তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ঘটনাস্থল। প্রকাশিত ডেটায় ৫৪ শতাংশ ঘটনায় বাসাবাড়ির কথা এসেছে। ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ৩২ শতাংশ, আর বাকি ঘটনাগুলো অন্যান্য স্থানে।

অর্থাৎ শিশু সুরক্ষা নিয়ে শুধু স্কুল বা মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে ব্যবস্থা নিলেই হবে না। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, আবাসিক ব্যবস্থা, কোচিং এবং শিশুর নিয়মিত যাতায়াতের পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন।

পরিচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধেই বেশি অভিযোগ

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো অভিযুক্ত ব্যক্তি অনেক ক্ষেত্রেই শিশুর পরিচিত। ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে প্রকাশিত বয়ানে পরিচিত ও বিশ্বস্ত পরিচিত ব্যক্তির পাশাপাশি আত্মীয়দের কথাও এসেছে। মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রেও পরিচিত আত্মীয়ের সম্পৃক্ততার উল্লেখ রয়েছে।

এতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—শিশুকে শুধু অপরিচিত মানুষের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করলেই সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না। বরং বিশ্বাসের সম্পর্কের আড়ালে ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থাও জরুরি।

বারবার নিপীড়নের অভিযোগও উদ্বেগজনক

‘আওয়াজ’-এ প্রকাশিত অভিজ্ঞতাগুলোতে একাধিকবার নিপীড়নের অভিযোগও এসেছে। প্রথমে জোরপূর্বক এবং পরে ভয় দেখিয়ে ঘটনা চালিয়ে যাওয়ার বর্ণনা রয়েছে। Prothom Alo-র প্রতিবেদনে প্ল্যাটফর্মটির প্রকাশিত তথ্য উদ্ধৃত করে ৬৩ শতাংশ অভিজ্ঞতায় একাধিকবার নিপীড়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এই প্রবণতা দেখায়, প্রথম ঘটনার পর একটি শিশু দ্রুত সহায়তা না পেলে একই ধরনের নির্যাতন পুনরায় ঘটার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কওমি মাদ্রাসার তথ্য: গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জাতীয় চিত্র নয়

ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক অভিযোগের মধ্যে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি—এমন তথ্য প্ল্যাটফর্মটির ডেটায় এসেছে। কিন্তু এই সংখ্যাকে বাংলাদেশের সব কওমি মাদ্রাসার বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ‘আওয়াজ’-এর তথ্য কোনো জাতীয়ভাবে প্রতিনিধিত্বশীল জরিপ থেকে পাওয়া নয়; যারা রিপোর্ট করেছেন, তারা নিজেরাই এই প্ল্যাটফর্মে অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।

তবে তথ্যটি উপেক্ষা করারও কারণ নেই। বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষক-কর্মীদের যাচাই, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং অভিযোগের পরবর্তী ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন।

‘আওয়াজ’-এর সুবিধা, আবার সীমাবদ্ধতাও আছে

বেনামি প্ল্যাটফর্মের বড় সুবিধা হলো, পরিচয় প্রকাশ না করেও একজন ব্যক্তি নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে পারেন। যারা পরিবার, প্রতিষ্ঠান বা পুলিশের কাছে সরাসরি যেতে ভয় পান, তাদের জন্য এটি অন্তত কথা বলার একটি জায়গা তৈরি করতে পারে। Child Helpline 1098-ও বাংলাদেশে শিশুদের জন্য বিনা খরচে ও গোপনীয় সহায়তা দেয় এবং ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে।

তবে বেনামি অভিযোগ আর আইনগত প্রমাণ এক বিষয় নয়। কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত বা বিচার করতে হলে সাক্ষ্য, নথি, ডিজিটাল তথ্যসহ অন্যান্য প্রমাণের প্রয়োজন হতে পারে। তাই ‘আওয়াজ’-এর মতো প্ল্যাটফর্মের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে—অভিজ্ঞতা সংগ্রহের পর ভুক্তভোগী চাইলে তাকে নিরাপদে আইনগত, চিকিৎসা ও মনোসামাজিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা যাচ্ছে কি না।

শিশু সুরক্ষায় এখন প্রয়োজন শক্ত ব্যবস্থা

শিশু যৌন নিপীড়ন ঠেকাতে শিক্ষা ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুস্পষ্ট safeguarding policy, অভিযোগ জানানোর গোপন ব্যবস্থা, শিক্ষক-কর্মীদের যথাযথ background verification এবং অভিযোগের লিখিত রেকর্ড থাকা জরুরি। গুরুতর অভিযোগ উঠলে বিষয়টি চেপে না রেখে নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা এবং প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় রক্ষা করতে হবে। অভিযোগের নামে শিশুর ছবি, ভিডিও বা এমন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়, যা তাকে পরে শনাক্ত করতে পারে। শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সংবাদ প্রকাশের সময় অপরাধের তথ্য সামনে আনা জরুরি, কিন্তু শিশুর পরিচয় নয়।

৭৮টি রিপোর্টের আসল গুরুত্ব কোথায়?

‘আওয়াজ’-এর ৭৮টি রিপোর্টকে জাতীয় পরিসংখ্যান বলা যাবে না। প্রতিটি অভিযোগও আদালতে প্রমাণিত ঘটনা নয়। কিন্তু এই তথ্যের গুরুত্ব অন্য জায়গায়—এগুলো দেখাচ্ছে, কথা বলার একটি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গা তৈরি হলে বহু মানুষ বহু বছর পরও তাদের অভিজ্ঞতা সামনে আনতে চান।

এখন প্রয়োজন এসব বয়ানের ভিত্তিতে sensational narrative তৈরি না করে স্বাধীন গবেষণা, জাতীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বশীল জরিপ এবং কার্যকর child-protection system গড়ে তোলা। ১০৯৮, পুলিশ, সমাজসেবা, শিক্ষা ও শিশু অধিকার সংগঠনের তথ্যের মধ্যে সমন্বয়ও বাড়ানো প্রয়োজন।

কারণ শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম শর্ত শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়—অভিযোগের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, সেটিই আসল পরীক্ষা।

তথ্যসূত্র: দ্য ডিসেন্ট; প্রথম আলো; ডিজি বাংলা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments