থাইল্যান্ড থেকে টেকনাফ হয়ে ঢাকার অলিগলি — একটি মাদকের ২৫ বছরের বিস্তার এবং এক জাতীয় সংকটের অন্তরালের গল্প
ঢাকা | TODAY TV BD বিশেষ কাভার স্টোরি
ঢাকার এক অগোছালো ঘরে শুয়ে থাকা চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি পোষা পাখির খাঁচার কথা বলেন। একসময় তিনি পাখিটির যত্ন নিতেন, খাঁচা পরিষ্কার করতেন, ডানা মেলে উড়তে দিতেন। এখন আর সে সব করেন না। জীবনের সেই ছোট্ট আনন্দও যেন হারিয়ে গেছে। তাঁর পরিচয় তিনি প্রকাশ করতে চান না — সবাই তাঁকে ডাকেন একটি ছদ্মনামে।
এই মানুষটি শুধু একজন আসক্ত নন। তিনি বাংলাদেশের ইয়াবা সংকটের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি — এমন এক সংকট, যার শিকড় ছড়িয়ে আছে প্রায় তিন দশক আগের এক ছোট্ট সীমান্ত-পথ থেকে শুরু করে আজকের ঢাকার প্রতিটি অলিগলি পর্যন্ত।
যেভাবে শুরু হয়েছিল: একটি সময়রেখা
ইয়াবার ইতিহাস বোঝার জন্য ফিরে তাকাতে হবে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইয়াবার প্রথম আবির্ভাব ঘটে ১৯৯৭ সালে। তবে এর ব্যাপক বিস্তার শুরু হয় ২০০০ সালের পর থেকে, যখন কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে নিয়মিত ইয়াবা আসতে শুরু করে। শুরুর দিকে দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এটি মূলত উচ্চবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
দৈনিক আজাদীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ সালের দিকে বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এবং বান্দরবান সীমান্তকেন্দ্রিক এলাকায় মিয়ানমার নিয়মিত ইয়াবা কারখানা গড়ে তোলে। ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ইয়াবার চালান। এরপর থেকে ক্রমান্বয়ে এই মাদকের প্রকোপ বেড়েই চলেছে — মিয়ানমারও তাদের উৎপাদন-কারখানা বাড়িয়েছে বহুগুণ।
থাই ভাষার ‘পাগল করা ওষুধ’ যেভাবে তৈরি হয়
থাই ভাষায় ইয়াবার অর্থ প্রায় “পাগল করা ওষুধ” — এমন বর্ণনা বহুদিন ধরেই প্রচলিত। মিয়ানমারের ওয়া ও কোকাং নামের আদিবাসী সম্প্রদায় মেথামফেটামিন পিল বা ইয়াবার সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী হিসেবে পরিচিত। এই দুই গোষ্ঠী অতীতে আফিম ও হেরোইন উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ছিল, পরবর্তীতে তারা ঝুঁকে পড়ে সিন্থেটিক এই মাদক উৎপাদনে।
উদ্বেগজনক তথ্য হলো, মিয়ানমারের সাধারণ ল্যাবরেটরিতেও মাত্র ২০ হংকং সেন্টের বিনিময়ে একটি ইয়াবা পিল তৈরি করা সম্ভব — যা এই মাদককে করে তুলেছে ভয়াবহভাবে সহজলভ্য ও লাভজনক। বর্তমানে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় দেড় শতাধিকেরও বেশি ইয়াবা তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে বলে জানা যাচ্ছে।
নাফ নদী থেকে ৪৫টি রুট: পাচারের বিস্তৃত জাল
দৈনিক আজাদীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তত ৪৫টি রুট দিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবা প্রবেশ করছে — টেকনাফে যেখানে দাম সবচেয়ে কম, ঢাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই দামই হয়ে যায় সর্বোচ্চ।
নাফ নদী দীর্ঘদিন ধরে পাচারের প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলেছে। আজকের পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সরকারি বাহিনী ও স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির চলমান সংঘাতের মধ্যেও কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের অন্তত ৩৩টি পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ঢুকছে।
শুধু টেকনাফ মডেল থানাতেই চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাদক জব্দসংক্রান্ত ১৭৫টি মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন ২১৯ জন, উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৪৯ লাখ ইয়াবা ও ২ কেজির বেশি আইস।
পথ বদলাচ্ছে পাচারকারীরা
নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাচারকারীরাও কৌশল পাল্টাচ্ছে। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগে পাচারের জন্য মূলত টেকনাফ সীমান্ত ব্যবহৃত হলেও এখন কক্সবাজার, বাঁশখালী, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পটুয়াখালী, কুয়াকাটা ও চট্টগ্রামের সমুদ্রপথও ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। সম্প্রতি কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর মোহনায় এক অভিযানে চার লাখ ৬০ হাজার পিস ইয়াবাসহ নয়জনকে আটক করা হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো, বিলাসবহুল গাড়িতে করেও এখন ইয়াবা পাচার হচ্ছে — এমনকি সেনাবাহিনীর স্টিকার লাগানো গাড়িতে সিটের নিচে বিশেষভাবে লুকিয়ে ২৮ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। এই কৌশল বদল দেখায়, পাচার নেটওয়ার্ক কতটা সংগঠিত ও অভিযোজনক্ষম হয়ে উঠেছে।
এখন এটি আর সীমান্তের সমস্যা নয়
আইরিশ টাইমসের এক প্রতিবেদনে উঠে আসা একজন ব্যবহারকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াবা তাঁকে একদিকে জাগিয়ে রাখে, অন্যদিকে ভেঙে দেয়। কয়েক ঘণ্টার উত্তেজনার পর আসে দীর্ঘ ক্লান্তি, নিদ্রাহীনতা, বিষণ্নতা আর আত্মনিয়ন্ত্রণের ভাঙন। এই অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর একার নয় — বরং হাজারো মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা।
ঢাকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইয়াবা এখন আর শুধু সীমান্তবর্তী কোনো প্রান্তিক সমস্যা নয়। এটি ঢুকে গেছে শহর, বন্দর, শ্রমবাজার, এমনকি তরুণদের সামাজিক আড্ডার ভেতরেও। সাশ্রয়ী দাম, সহজে বহনযোগ্যতা এবং দ্রুত প্রভাব — এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একে করে তুলেছে ভয়ংকরভাবে জনপ্রিয়। সীমান্ত পেরিয়ে আসার পর এই বড়ি ছড়িয়ে পড়ে শহরের ভেতরেও — কখনো ট্রাকচালকের হাতে, কখনো রিকশাচালকের কাছে, কখনো তরুণদের আড্ডায়।
শরীরের ওপর যে ধ্বংস নেমে আসে
ইয়াবা মূলত মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণ। এই সংমিশ্রণ শরীরে দ্রুত উত্তেজনা তৈরি করে, হৃদস্পন্দন বাড়ায়, ঘুম কমায়, ক্ষুধা দমন করে এবং সাময়িক আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। কিন্তু এই “উত্তেজনা”র বিনিময়ে শরীর ও মনের ওপর যে ক্ষতি জমতে থাকে, তা অনেক সময় বোঝা যায় অনেক পরে।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এটি ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, স্মৃতিভ্রংশ, আচরণগত অস্থিরতা, হার্টের ঝুঁকি, দাঁতের ক্ষয়, খিঁচুনি এমনকি গুরুতর মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিশাল ফাঁক
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একজন চিকিৎসকের তথ্য এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অত্যন্ত অল্প। যাঁদের চিকিৎসা প্রয়োজন, তাঁদের বড় অংশই কোনো সেবা পান না। আর যাঁরা মাদকাসক্ত, তাঁদের জন্য পুনর্বাসন সুবিধা, মানসিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি থেরাপি আরও দুর্লভ।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে — আমরা কি আসক্তিকে কেবল অপরাধ হিসেবে দেখছি, নাকি একটি চিকিৎসা-সামাজিক সমস্যা হিসেবে?
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ, অনেক আসক্ত ব্যক্তি আসলে মানসিক চাপ, হতাশা, উদ্বেগ বা পারিবারিক সংকটের মধ্য দিয়ে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আবার কেউ কেউ নিজের খরচ চালাতে গিয়ে নিজেই ডিলার হয়ে ওঠেন। অর্থাৎ ইয়াবা শুধু গ্রহণকারীর শরীরকে নয়, তার পরিবার, সামাজিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যকেও ভেঙে দেয়।
দমন অভিযান কি যথেষ্ট প্রমাণিত হয়েছে?
বাংলাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান আগেও হয়েছে। ২০১৮ সালে বড় ধরনের “অ্যান্টি-ড্রাগ” অভিযানে বহু মানুষ নিহত হন। তবে প্রশ্ন থেকে যায় — শুধু কঠোর হাতে দমন করলেই কি সমস্যার প্রকৃত সমাধান হয়?
বড়ি জব্দ করা বা গ্রেপ্তার করা একটি বিষয়; কিন্তু আসক্তি কমানো, চিকিৎসা দেওয়া, পুনর্বাসন করা এবং সামগ্রিক চাহিদা কমানো — এগুলো সম্পূর্ণ আলাদা এক চ্যালেঞ্জ। যে সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল, পুনর্বাসন সীমিত এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেশি, সেখানে কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে মাদক বন্ধ করা কঠিন। বরং নতুন ব্যবহারকারী তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, একটি কাঠামোগত সংকট
ইয়াবা নিয়ে আলোচনায় সাধারণত ব্যক্তির নৈতিকতা বা দুর্বলতাকেই সামনে আনা হয়। কিন্তু এই আসক্তির পেছনে আছে আরও বড় কিছু — দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সীমান্ত-নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি, দারিদ্র্য, মানসিক চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং এক ধরনের সামাজিক নীরবতা।
ঢাকার সেই আসক্ত ব্যক্তি যখন পোষা পাখির কথা বলেন, তখন আসলে তিনি একটি হারানো স্বাভাবিক জীবনের কথাই বলেন। ইয়াবা তাঁকে শুধু মাদকাসক্ত করেনি — তাঁর দৈনন্দিন রুটিন, মনোযোগ, সম্পর্ক আর দায়িত্ববোধও কেড়ে নিয়েছে। এখানেই এই মাদকের প্রকৃত ভয়াবহতা। এটি শুধু একটি বড়ি নয় — এটি ধীরে ধীরে মানুষের পরিচয়, ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎকে গলিয়ে দেয়।
🧭 এই সংকটের শেষ কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এই সংকট মোকাবিলায় পাঁচটি সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত, মাদককে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক চিকিৎসাব্যবস্থার অংশ করতে হবে। তৃতীয়ত, স্কুল, কলেজ ও কর্মজীবী তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। চতুর্থত, সীমান্ত ও সরবরাহ চেইনে নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে — বিশেষত পাচারকারীরা যেভাবে দ্রুত রুট পরিবর্তন করছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। পঞ্চমত, আসক্তদের জন্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, সমাজকে বুঝতে হবে — আসক্ত মানুষ অপরাধী নয়, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি নিজেই এক দীর্ঘ ভাঙনের শিকার।
বাংলাদেশে ইয়াবা এখন আর একটি বিচ্ছিন্ন মাদক সমস্যা নয়। ১৯৯৭ সালে যে বড়ির যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি সীমান্ত-পথ ধরে, প্রায় তিন দশক পর আজ তা পরিণত হয়েছে সমাজের ভেতরে ঢুকে পড়া এক নীরব মহামারিতে। আর এই মহামারির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় চোখে দেখা যায় না এমন জায়গায় — মনের ভেতরে, পরিবারের ভেতরে, ভবিষ্যতের ভেতরে।
এই সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে দরকার কেবল অভিযান নয়। দরকার সহানুভূতি, চিকিৎসা, নীতি আর রাষ্ট্রীয় আন্তরিকতা। কারণ একটি সমাজ যখন ইয়াবার মতো মাদকে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন সেখানে শুধু শরীর নয়, আশা-ভরসাও আস্তে আস্তে আসক্ত হয়ে যায়।
তথ্যসূত্র: আইরিশ টাইমস, উইকিপিডিয়া, দৈনিক আজাদী, বাংলা ট্রিবিউন, আজকের পত্রিকা, ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা




