Homeটুডে নেশনমহেশখালীর একটি ধাক্কায় থমকে গেল পুরো দেশ: গ্যাস সংকটে বন্ধ চুলা, পাম্পে...

মহেশখালীর একটি ধাক্কায় থমকে গেল পুরো দেশ: গ্যাস সংকটে বন্ধ চুলা, পাম্পে দীর্ঘ লাইন, কারখানায় উৎপাদন বিপর্যয়

একটি FSRU-র কারিগরি ত্রুটিতে সরবরাহ কমেছে ৪৫০ mmcfd; আমদানিনির্ভরতা, উৎপাদন ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক সংকট মিলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন প্রশ্নের মুখে

রাজধানীর বনশ্রী, ফার্মগেট, এসকাটন, মিরপুর, ধানমন্ডি ও উত্তরার ঘরে ঘরে গ্যাসের চুলা জ্বলছে না ঠিকমতো। সিএনজি স্টেশনগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ি। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশুলিয়ার কারখানাগুলো চলছে অর্ধেক সক্ষমতায়। এই সবকিছুর মূলে রয়েছে একটি একক ঘটনা — মহেশখালীর একটি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে (FSRU) দেখা দেওয়া কারিগরি ত্রুটি, যার ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (mmcfd) গ্যাস সরবরাহ হঠাৎ কমে গেছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রযুক্তিবিদরা সমস্যা মেরামতে কাজ করছেন এবং জরুরি ও অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই সংকটকে নিছক একটি প্রযুক্তিগত দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে আসল চিত্রটি ধরা পড়ে না — কারণ বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা এমনিতেই ছিল টানাটানির মধ্যে।

এক টার্মিনালের ত্রুটি কেন গোটা দেশে ধাক্কা দিল

দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ২,৬২০ mmcfd থেকে নেমে ২,১৭০ mmcfd-এ দাঁড়িয়েছে, যেখানে দেশের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ mmcfd। অর্থাৎ বর্তমানে দেশ মোট চাহিদার মাত্র ৫৭ শতাংশ পূরণ করতে পারছে।

The Business Standard-এ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা সরাসরি বলেছেন, “আমাদের বিকল্প খুবই কম” — এ কারণেই একটিমাত্র FSRU-তে সমস্যা দেখা দিলে পুরো দেশ এর প্রভাবে কেঁপে ওঠে। মূল দুর্বলতাটি এখানেই — বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থার প্রায় ৩০ শতাংশই নির্ভরশীল মাত্র দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর।

সংকট কি হঠাৎ, নাকি জমছিল বহুদিন ধরে

আসল চিত্রটা আরও গভীরে। পেট্রোবাংলার তথ্য উদ্ধৃত করে বিএসএস জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারিতেই ২৪ ঘণ্টায় LNG-সহ মোট গ্যাস উৎপাদন ছিল ২,৫৯৪.৭ mmcfd, অথচ চাহিদা ছিল ৩,৮০০ mmcfd — অর্থাৎ ঘাটতি ছিল সংকট শুরুর অনেক আগে থেকেই।

আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২০২৩ সালের শেষে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন নেমে আসে দৈনিক প্রায় ২.০৮ বিলিয়ন ঘনফুটে, যা ২০১২ সালের গড় ২.২০ বিলিয়ন ঘনফুটের চেয়েও কম। অর্থাৎ বাংলাদেশের গ্যাস খাতের সমস্যা কেবল আমদানি-নির্ভরতার নয়, দেশীয় মজুত ও উত্তোলন-সক্ষমতা হ্রাসেরও। সরকারি বিবৃতিতেও এই দুর্বলতা স্বীকার করা হয়েছে — অতীতে দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদনে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় LNG আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক যুদ্ধের প্রভাব ঘরোয়া বাজারেও

দেশীয় সংকট যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই এসেছে বৈদেশিক এক বড় ধাক্কা। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে কাতার এনার্জি ২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশে নির্ধারিত LNG সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে দিয়েছে। পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রয়টার্সকে বলেছেন, এই সমস্যার মূল কারণ যুদ্ধ, আর বাংলাদেশ এখন বিকল্প উৎস, বেশি স্পট-মার্কেট কেনাকাটা এবং সরকার-থেকে-সরকার চুক্তির দিকে তাকিয়ে আছে।

কাতার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় LNG সরবরাহকারী দেশ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ যে প্রায় ৭ মিলিয়ন টন LNG আমদানি করেছিল, তার মধ্যে প্রায় ৪.১৫ মিলিয়ন টনই এসেছিল কাতার থেকে। এই একক দেশনির্ভরতাই এখন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে এসেছে।

📊 কোথায় কতটা ক্ষতি

খাতআগের অবস্থাবর্তমান অবস্থা
জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ২,৬২০ mmcfd২,১৭০ mmcfd
দৈনিক চাহিদা৩,৮০০ mmcfdপূরণ হচ্ছে ৫৭%
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ৯৫০ mmcfd৭৫০ mmcfd
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন৫,১০০–৫,২০০ MW৪,৪০০ MW
কারখানার উৎপাদন সক্ষমতাস্বাভাবিক৭০–৭৫%

ঘরে ঘরে যেভাবে ভুগছেন মানুষ

দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্যাস সংকটের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার আগে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পেত প্রায় ৯৫০ mmcfd গ্যাস, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ৭৫০ mmcfd-এ। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে দাঁড়িয়েছে ৪,৪০০ মেগাওয়াটে, যেখানে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা ছিল ৫,১০০ থেকে ৫,২০০ মেগাওয়াট।

আবাসিক এলাকায়: ঢাকার বনশ্রী, ফার্মগেট, এসকাটন, মিরপুর, ধানমন্ডি ও উত্তরাসহ একাধিক এলাকায় গ্যাসের চাপ নেমে এসেছে প্রায় শূন্যে — যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ঘরে ঘরে রান্নার কাজে।

যানবাহন খাতে: সিএনজি স্টেশনগুলোতে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ লাইন, যা রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করছে।

শিল্প খাতে: গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও কারখানা তাদের স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ৭০-৭৫ শতাংশেও চালাতে পারছে না — যা রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ।

সরকারের ব্যাখ্যা ও তাৎক্ষণিক করণীয়

জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত FSRU থেকে সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল এবং সমস্যা মেরামতে রাতদিন কাজ চলছে। বিএসএসের সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে ১০০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দরপত্রের মাধ্যমে আরও একটি FSRU সংযোজন, মালয়েশিয়া থেকে LNG আমদানির সম্ভাবনা এবং ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে।

The Business Standard-এর আরেকটি প্রতিবেদনে উপমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সরকার আশা করছে ক্ষতিগ্রস্ত FSRU-টি আগামী সপ্তাহের শুরুতে ২৮০-৩০০ mmcfd সরবরাহে ফিরবে, এবং মেরামত পরিকল্পনা সঠিকভাবে এগোলে পরের সপ্তাহের শেষ নাগাদ পূর্ণ পুনরুদ্ধার সম্ভব হতে পারে। একই প্রতিবেদনে সরকার এই সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি-নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

🔎 বিশ্লেষণ: আসল কারণ কী

সব তথ্য একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের এই গ্যাস সংকটের রয়েছে তিনটি স্তর।

প্রথমত, একটি FSRU-তে হঠাৎ কারিগরি ত্রুটির মতো তাৎক্ষণিক ধাক্কা। দ্বিতীয়ত, LNG আমদানিনির্ভর ও সীমিত বিকল্পসম্পন্ন সরবরাহ কাঠামোর দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। তৃতীয়ত, দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিক পতন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা।

এই তিনটি কারণ একত্রে মিলে সংকটটিকে বাহ্যিকভাবে “হঠাৎ” মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি বহুদিন ধরে জমে থাকা কাঠামোগত ঝুঁকিরই এক আকস্মিক বিস্ফোরণ।

🧭 এরপর কী

আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে FSRU-টির পূর্ণ পুনরুদ্ধার সম্ভব হয় কিনা, তার ওপরই নির্ভর করছে স্বল্পমেয়াদে সংকট প্রশমনের সম্ভাবনা। তবে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসকূপ খনন, বিকল্প LNG উৎস অনুসন্ধান এবং নতুন টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত না হলে ভবিষ্যতে অনুরূপ সংকট আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বিএসএস), রয়টার্স, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, পেট্রোবাংলা-উদ্ধৃত সরকারি বিবৃতি

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments