মাহবুব কবির মিলনের বিশ্লেষণ
“আজ যে কথা বলছি, সেটি নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০১৫ সাল থেকেই আমি বলে আসছি—কীটনাশকের মান, অবশিষ্টাংশ (Residue), হেভি মেটাল এবং নিরাপদ কৃষি নিয়ে রাষ্ট্রকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
এভাবেই নিজের সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্টে দীর্ঘ ১১ বছরের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন। তাঁর দাবি, বহু বছর আগে সরকারি বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী বৈঠকে যে বিষয়গুলো তিনি উত্থাপন করেছিলেন, সেগুলো সে সময় গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু এখন সরকার নিরাপদ খাদ্য ও কীটনাশক ব্যবস্থাপনায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে।
২০১৫ সালের স্মৃতি: ‘আমাকে বলা হয়েছিল কৃষি সম্পর্কে কিছুই জানি না’
মাহবুব কবির মিলনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ কাউন্সিল (BARC)-এর বিভিন্ন পিআইটিএসি (PITAC) বৈঠকে তিনি পর্যবেক্ষক সদস্য হিসেবে অংশ নেন।
সেখানে তিনি প্রস্তাব করেছিলেন—
- কীটনাশকের আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা,
- হেভি মেটাল ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান পরীক্ষা,
- নিম্নমানের ও ভেজাল কীটনাশকের লাইসেন্স বন্ধ,
- আমদানির আগে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।
তবে তাঁর অভিযোগ, সে সময় কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রকাশ্য বৈঠকেই তাঁর এসব প্রস্তাবকে গুরুত্ব না দিয়ে তাঁকে অপমান করেছিলেন।
‘পিএইচআই চালু করলে ভোট নষ্ট হবে’—একটি পুরোনো অভিজ্ঞতা
মাহবুব কবির মিলন আরও দাবি করেন, এক বৈঠকের বাইরে তিনি একজন তৎকালীন মহাপরিচালককে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলেন অন্তত একটি উপজেলায় গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (GAP) এবং Pre-Harvest Interval (PHI) পরীক্ষামূলকভাবে চালুর জন্য।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তরে ওই কর্মকর্তা বলেছিলেন—
“এটা করা যাবে না, সরকারের ভোট নষ্ট হবে।”
এই ঘটনার পর তিনি আর ওই বৈঠকে অংশ নেননি বলেও উল্লেখ করেন।
১১ বছর পর নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখছেন তিনি
মাহবুব কবির মিলনের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে লেখালেখি ও জনসচেতনতা তৈরির পর এখন সরকার নিরাপদ কৃষি ও কীটনাশক নিয়ন্ত্রণে আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় হচ্ছে।
তিনি বলেন, তাঁর অবস্থান কখনোই কীটনাশক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পক্ষে ছিল না। বরং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব কীটনাশক ব্যবহারের পক্ষে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মত দিয়ে আসছেন।
কীটনাশক ব্যবহার করতেই হবে—নাকি বিকল্প পথও আছে?
মাহবুব কবির মিলনের আলোচনাকে সামনে রেখে কৃষি বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক রয়েছে।
ইউরোপের অনেক দেশ এখন—
- ড্রিপ ইরিগেশন,
- সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM),
- জৈব সার,
- উপকারী পোকা ও প্রাকৃতিক শত্রু সংরক্ষণ,
- কম রাসায়নিক নির্ভর কৃষি
ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।
এসব পদ্ধতিতে কীটনাশকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে।
সমস্যা শুধু কীটনাশক নয়, ব্যবহারবিধিও
মাহবুব কবির মিলনের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে—কীটনাশক ব্যবহারের নিয়ম না মানা।
প্রতিটি অনুমোদিত কীটনাশকের লেবেলে PHI (Pre-Harvest Interval) বা স্প্রে করার পর কতদিন অপেক্ষা করে ফসল সংগ্রহ করতে হবে, তা উল্লেখ থাকে।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে কৃষক যদি আজ স্প্রে করে পরদিনই ফসল বাজারে নিয়ে আসেন, তাহলে খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
অর্থাৎ শুধু মানসম্পন্ন কীটনাশক থাকলেই হবে না; সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
‘বাংলাদেশ কীটনাশক তৈরি করে’—এই ধারণা কতটা সঠিক?
মাহবুব কবির মিলনের আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের কীটনাশক শিল্প।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নতুন কীটনাশকের অণু (Molecule) উদ্ভাবন করে না।
বরং বিদেশ থেকে টেকনিক্যাল অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট এনে এখানে ফর্মুলেশন করা হয়।
অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উৎপাদনের পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাতকরণই হয়।
তাঁর মতে, নতুন প্রজন্মের নিরাপদ কীটনাশক আবিষ্কারের জন্য প্রয়োজন—
- উচ্চমানের গবেষণা,
- আধুনিক ল্যাব,
- দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ,
- দক্ষ বিজ্ঞানী,
- আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কী করা জরুরি?
মাহবুব কবির মিলনের বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপদ কৃষি নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—
- আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কীটনাশক পরীক্ষা
- হেভি মেটাল ও ক্ষতিকর উপাদান শনাক্তকরণ
- কৃষকদের PHI সম্পর্কে প্রশিক্ষণ
- খাদ্যে কীটনাশকের রেসিডিউ নিয়মিত মনিটরিং
- গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (GAP) বাস্তবায়ন
- সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) সম্প্রসারণ
- গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি
- নিরাপদ কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রণোদনা
শেষকথা
মাহবুব কবির মিলনের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লড়াই কেবল একটি ব্যক্তি, একটি সংস্থা বা একটি মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। এটি কৃষক, গবেষক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নীতিনির্ধারক এবং ভোক্তা—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
তিনি বিশ্বাস করেন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, কৃষকদের সচেতনতা এবং নিরাপদ কৃষি চর্চা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য
এই প্রতিবেদনটি সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলনের প্রকাশিত ফেসবুক পোস্টের বক্তব্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। পোস্টে উল্লিখিত কিছু দাবি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মতামত হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে; সেগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত নয়।




