Homeটুডে বাংলাজঙ্গল সলিমপুর: রহস্য, ভয় ও বাস্তবতা

জঙ্গল সলিমপুর: রহস্য, ভয় ও বাস্তবতা

পর্ব–১ | দেশের ভেতর আরেক দেশ?

TODAY TV BD বিশেষ অনুসন্ধানী ধারাবাহিক

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের নাম শুনলেই এখনো অনেকের মনে প্রথম যে শব্দটি আসে, তা হলো আতঙ্ক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, সাংবাদিক, এমনকি প্রতিবেদন করতে যাওয়া গবেষকের কাছেও জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের “ব্যতিক্রমী” এলাকা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। কারণ এটি কেবল একটি পাহাড়ি বসতি নয়; বরং ভূমি দখল, অবৈধ বসতি, অপরাধ, প্রতিরোধ, পুনর্দখল এবং রাষ্ট্রীয় উপস্থিতির সীমা—সবকিছুর এক জটিল পরীক্ষাগার।

১৯ জানুয়ারি ২০২৬ সালে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গিয়ে র‍্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর এই নাম আবারও জাতীয় আলোচনায় ফিরে আসে। এর পরপরই যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু করে এবং প্রশাসন এলাকাটিতে নিয়ন্ত্রণ পুনঃস্থাপনের দাবি জানায়। কিন্তু এক মাস পরও স্থানীয়দের একটি অংশ বলছিল, “অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ” পুরোপুরি ভাঙেনি। এই দ্বৈত বাস্তবতাই জঙ্গল সলিমপুরকে বোঝার মূল চাবিকাঠি।

📦 জঙ্গল সলিমপুর এক নজরে

সূচকবিবরণ
অবস্থানচট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার পশ্চিমে প্রায় ২ কিলোমিটার, লিংক রোডের উত্তর পাশে; প্রশাসনিকভাবে সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের অংশ
সীমানাপূর্বে হাটহাজারী উপজেলা, দক্ষিণে বায়েজিদ পুলিশ স্টেশন এলাকা
বিস্তারপ্রায় ৩,১০০ একর সরকারি পাহাড় ও বনভূমি
ভূমির প্রকৃতিসরকারি খাসজমি; দীর্ঘদিন ধরে বড় অংশ অবৈধ দখল ও পাহাড় কেটে বসতি গড়ার অভিযোগে আলোচিত
প্রবেশব্যবস্থাবাসিন্দাদের আইডি কার্ড দেখিয়ে ঢুকতে হয়; বহিরাগত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে
সাম্প্রতিক বড় ঘটনা১৯ জানুয়ারি ২০২৬ (র‍্যাব কর্মকর্তা নিহত), ৯ মার্চ ২০২৬ (বড় যৌথ অভিযান), ১০ এপ্রিল ২০২৬ (নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে সংশয়)

🗺️ জঙ্গল সলিমপুর কোথায়?

জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান বুঝতে হলে একে চট্টগ্রাম নগরসংলগ্ন পাহাড়ি বলয়ের মধ্যে দেখতে হবে। একদিকে বায়েজিদ বোস্তামী, অন্যদিকে হাটহাজারী; দক্ষিণে বায়েজিদ থানা এলাকা, আর উত্তর-পশ্চিমে লিংক রোড—এই চারদিকের ভৌগোলিক বাস্তবতাই এলাকাটিকে একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের মতো করে তুলেছে। প্রথম আলো ও ফাইন্যান্সিয়াল টুডের প্রতিবেদনে এই অবস্থানকে নগরের একেবারে প্রান্তে, অথচ কার্যত শহর-সংলগ্ন বলেই বর্ণনা করা হয়েছে।

সীমারেখা:

  • পূর্ব: হাটহাজারী উপজেলা
  • দক্ষিণ: বায়েজিদ পুলিশ স্টেশন এলাকা
  • পশ্চিম/দক্ষিণ-পশ্চিম: লিংক রোড
  • শহরমুখী সংযোগ: বায়েজিদ বোস্তামী হয়ে নগরের মূল অংশ

এই অবস্থানগত সুবিধা ও দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি মিলেই জঙ্গল সলিমপুরকে একই সঙ্গে নগর-সংলগ্ন এবং দুর্গম—দুই রকম পরিচয় দিয়েছে। নগরীর প্রাণকেন্দ্র থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত হয়েও এটি বছরের পর বছর কার্যত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে গেছে—এই ভৌগোলিক সান্নিধ্য ও প্রশাসনিক দূরত্বের বৈপরীত্যই এলাকাটিকে করে তুলেছে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

🕒 কীভাবে এই জনপদ আলোচনায় উঠল

১৯৮০–১৯৯০-এর দশক
সরকারি পাহাড় কেটে বসতি গড়ে ওঠার শুরু। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে বড় অনিয়ন্ত্রিত জনবসতিতে রূপ নেয়।

৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২
জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব ও কথিত সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে আসে।

৮ সেপ্টেম্বর ২০২২
আলীনগরে অবৈধ বসতি উচ্ছেদে গেলে পুলিশ আক্রান্ত হয়।

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩
উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে প্রশাসন ও পুলিশের ওপর হামলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।

৩০ আগস্ট ২০২৫
যৌথ বাহিনী দেশীয় অস্ত্র তৈরির একটি কারখানার সন্ধান পায়; অস্ত্র, কার্তুজ ও সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

১৯ জানুয়ারি ২০২৬
অস্ত্র উদ্ধারে গিয়ে র‍্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন; আরও কয়েকজন আহত ও জিম্মি হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন জানায়।

৯ মার্চ ২০২৬
সেনাবাহিনী, র‍্যাব ও পুলিশের প্রায় চার হাজার সদস্য নিয়ে বড় যৌথ অভিযান শুরু হয়।

১০ মার্চ ২০২৬
পুলিশ ও র‍্যাব জানায়, তারা সেখানে “নিয়ন্ত্রণ” প্রতিষ্ঠা করেছে; তবে স্থানীয়দের একটি অংশ এক মাস পরও বলছিল, ভেতরে অদৃশ্য প্রভাব রয়ে গেছে।

ভূমি, পাহাড়, বসতি: কীভাবে জন্ম নিল এই ভয়

জঙ্গল সলিমপুরের ভয় কেবল অপরাধের ভয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘমেয়াদি ভূমি-সংকট। প্রথম আলো, bdnews24 এবং TBS-এর একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি পাহাড় কেটে সেখানে হাজার হাজার অবৈধ বসতি গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে প্লট ব্যবসা ও পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ চলতে থাকে। এই প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে রাখতে স্থানীয়ভাবে সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে ওঠে বলেও একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয় ও সংবাদসূত্রে আরও বলা হয়েছে, বাসিন্দাদের জন্য পরিচয়পত্র ব্যবস্থাও চালু ছিল; বহিরাগতদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হতো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা প্রশাসন প্রবেশের চেষ্টা করলে অনেক সময় পাহাড়ি ঢাল, সংকীর্ণ গলি এবং আগাম সতর্কবার্তার কারণে তারা হামলার মুখে পড়ত। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, অপরাধীরা প্রবেশপথে নজরদারি রাখত; আর পুলিশের গাড়ি ঢুকলেই প্রতিরোধ শুরু হয়ে যেত।

এই ভয় তৈরি হওয়ার পেছনে শুধু অস্ত্র বা সংঘর্ষ নয়, দীর্ঘ সময়ের অদৃশ্য নিয়মও কাজ করেছে। যে এলাকায় কে ঢুকবে, কে জমি পাবে, কোথায় ঘর উঠবে—এসব প্রশ্ন যদি প্রশাসন নয়, স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্র ঠিক করে, তখন মানুষের কাছে রাষ্ট্রের বদলে সেই অদৃশ্য কাঠামোই “শাসন” হয়ে দাঁড়ায়। জঙ্গল সলিমপুরের ভয় মূলত সেখান থেকেই।

📂 প্রকাশ্য প্রতিবেদনে কী দেখা যায়

প্রথম নথি: প্রথম আলোর ১৯ জানুয়ারির প্রতিবেদন
এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরের ৩,১০০ একর এলাকা সরকারি পাহাড় ও বনভূমি; এর বড় অংশ অবৈধ দখলে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কেটে বসতি, প্লট ব্যবসা, অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর পাহারা ও আইডি-ভিত্তিক প্রবেশব্যবস্থা ছিল।

দ্বিতীয় নথি: bdnews24-এর ৯ মার্চের প্রতিবেদন
এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি উঠে এসেছে যে, অপরাধীরা লাউডস্পিকার ঘোষণা দিয়ে লোক জড়ো করে হামলা চালায়; সেই হামলায় র‍্যাব সদস্য নিহত হন এবং বড় মাত্রার অভিযান শুরু হয়। একই সঙ্গে পুলিশ পরে অস্থায়ী ক্যাম্প বসায়।

তৃতীয় নথি: bdnews24-এর ১০ এপ্রিলের প্রতিবেদন
অভিযানের এক মাস পরও স্থানীয়দের একাংশ বলছিল, নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি; কিছু অদৃশ্য প্রভাব রয়ে গেছে। এটি দেখায়, অভিযান আর স্থায়ী শাসনব্যবস্থা এক জিনিস নয়।

চতুর্থ নথি: ২০২৩-এর উচ্ছেদ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন
উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে প্রশাসনের ওপর হামলা, ইটপাটকেল, ককটেল এবং আহত হওয়ার ঘটনা জানায় যে, রাষ্ট্র যখন ঢোকে, তখন প্রতিরোধও তৈরি হয়।

এই নথিগুলো একত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার করে: জঙ্গল সলিমপুর কোনো হঠাৎ তৈরি হওয়া “অপরাধের দ্বীপ” নয়; এটি বহু দশকের দখল, অব্যবস্থাপনা, পাহাড় কাটা, অনানুষ্ঠানিক বসতি ও ক্ষমতার আন্তঃসংঘাতের ফল।

কেন সাধারণ মানুষও ভয় পেত?

জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে আতঙ্কের একটি বড় কারণ হলো, সেখানে সব মানুষই এক রকম ছিলেন না। প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, এলাকায় হাজার হাজার বসতি, বহুবিধ পেশার মানুষ এবং অনানুষ্ঠানিক বসবাসের বাস্তবতা ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে অস্ত্রধারী পাহারা, আইডি-নির্ভর প্রবেশ এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাগুলো পুরো এলাকাকে সন্দেহের আওতায় এনে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনও সেই নেতিবাচক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

অন্য কথায়, ভয়টি কেবল অপরাধীদের কারণে তৈরি হয়নি; ভয়কে স্থায়ী করেছে অবিশ্বাস, অনিয়ন্ত্রিত বসতি এবং রাষ্ট্রের সীমিত উপস্থিতি। বহু বছর ধরে সাধারণ বাসিন্দাদের জন্যও এই এলাকার বাইরের পরিচয় বহন করাটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক ধরনের সামাজিক বোঝা—চাকরি খোঁজা, ব্যাংক ঋণ পাওয়া, এমনকি সন্তানের স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রেও ঠিকানার কারণে বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

আজকের জঙ্গল সলিমপুর

সরকারি অভিযান, যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি এবং ক্যাম্প স্থাপনের পরও জঙ্গল সলিমপুর পুরোপুরি “স্বাভাবিক” হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না। একটি প্রতিবেদনে পুলিশ ও র‍্যাবের ৩০০ সদস্যের নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও অন্য প্রতিবেদনে স্থানীয়রা বলেছেন, অদৃশ্য প্রভাব এখনো রয়ে গেছে।

এই টানাপোড়েনই দেখায় যে, জঙ্গল সলিমপুরে টেকসই নিয়ন্ত্রণ মানে কেবল সামরিক বা পুলিশি অভিযান নয়; বরং ভূমি প্রশাসন, পুনর্বাসন, নিরাপত্তা ও স্থানীয় আস্থার এক সমন্বিত সমাধান। একটি এলাকায় চার হাজার সদস্যের অভিযান চালানো যায়, ক্যাম্প বসানো যায়—কিন্তু চার দশকের অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকাঠামো, অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও সামাজিক সম্পর্কের জাল একদিনে ভাঙা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতাই আগামী দিনের নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

🧭 শেষ কথা

জঙ্গল সলিমপুরের আসল শিক্ষা হলো—রাষ্ট্র যদি দীর্ঘদিন কোনো অঞ্চলে তার নিয়মিত ও ন্যায়সঙ্গত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সেখানে বিকল্প নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প প্রবেশব্যবস্থা, বিকল্প অর্থনীতি এবং বিকল্প ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে।

এই পর্বে আমরা দেখলাম, কেন জঙ্গল সলিমপুর ভয়, অপরাধ ও রাষ্ট্রীয় চ্যালেঞ্জের নাম হয়ে উঠেছে। পরের পর্বে আমরা ফিরে যাব শুরুর দিকে—পাহাড় কেটে এই জনপদের জন্ম কীভাবে হয়েছিল, কারা প্রথম এসেছিল সেই দুর্গম পাহাড়ি ভূমিতে, এবং কীভাবে একটি অনিয়ন্ত্রিত বসতি ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছিল এক সমান্তরাল ক্ষমতাকাঠামোয়।


পর্ব–২: পাহাড় থেকে জনপদ—জঙ্গল সলিমপুরের জন্মকথা
কীভাবে সরকারি পাহাড়ে প্রথম বসতি শুরু হলো, কারা ভূমির নিয়ন্ত্রণ নিল, এবং কীভাবে এক অনিয়ন্ত্রিত বসতি ধীরে ধীরে একটি সমান্তরাল ক্ষমতাকাঠামোয় রূপ নিল—সেই অনুসন্ধান।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, bdnews24, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS), ফাইন্যান্সিয়াল টুডে, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিবৃতি

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments