এইচএসসির শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থেমে গেল ১৮ বছরের এক মেধাবী তরুণের জীবন | বাবা সাজ্জাদুল মিরাজের বুকভরা শোক, সহপাঠীদের চোখে অশ্রু
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
কিছু মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকে থামিয়ে দেয় না—থামিয়ে দেয় অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর ভালোবাসাকেও।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে মিনহাজুল ইসলাম রোজান চলে গেলেন না ফেরার দেশে। যে বয়সে একজন তরুণের হাতে থাকার কথা ছিল পরীক্ষার ফল, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আর নতুন জীবনের স্বপ্ন—সেই বয়সেই হাসপাতালের বিছানায় থেমে গেল তার জীবনযুদ্ধ।
রোববার বিকেলে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রোজান। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন, সহপাঠী, শিক্ষক, রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
একজন রোজান—যাকে শুধু ‘কারও সন্তান’ দিয়ে চেনানো যায় না
রোজান ছিলেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের নির্ঝর বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী।
শিক্ষাজীবনে মেধা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বগুণের জন্য শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে ছিলেন পরিচিত মুখ। অষ্টম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর ক্লাস ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।
এটি শুধু একটি দায়িত্বের পদবি ছিল না। দীর্ঘ পাঁচ বছর সহপাঠীদের নেতৃত্ব দেওয়া এবং শিক্ষকদের আস্থা ধরে রাখা বলে দেয়—রোজানের মধ্যে কতটা দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের গুণ ছিল।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর—BNCC-এর ক্যাপ্টেন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
একজন মেধাবী শিক্ষার্থী, একজন দায়িত্বশীল তরুণ, একজন নেতৃত্ব দিতে শেখা কিশোর—এই পরিচয়গুলো নিয়েই ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিলেন রোজান।
কিন্তু জীবন তাকে বড় হওয়ার সময়টুকু দিল না।
এইচএসসি পরীক্ষার শেষ মুহূর্তে শুরু হয় বিপর্যয়
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষার শেষদিকে রোজান অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা দেওয়ার সময় কয়েক দিন আগে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এরপর দ্রুত তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
প্রথমে তাকে মিরপুর-১১ নম্বরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে স্থানান্তর করা হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
একটি পরিবার তখন শুধু অপেক্ষা করছিল—
হয়তো আবার চোখ খুলবে রোজান।
হয়তো আবার বাবাকে ডাকবে।
হয়তো আবার ফিরে আসবে সেই প্রাণবন্ত ছেলেটি।
কিন্তু সেই অপেক্ষা শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হলো না।
একসঙ্গে ভেঙে পড়তে থাকে শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোজানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রক্তে শর্করা, কিডনি, হৃদ্যন্ত্র, সোডিয়াম, রক্তচাপ, হিমোগ্লোবিন ও ফুসফুসসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়।
চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান, আইসিইউর চিকিৎসা এবং পরিবারের সর্বোচ্চ চেষ্টা—কোনো কিছুই শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
১৮ বছরের একটি জীবন থেমে গেল।
থেমে গেল একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।
থেমে গেল একজন ক্যাডেটের স্বপ্ন।
থেমে গেল একজন ক্লাস ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বের গল্প।
আর একজন বাবার জীবনে নেমে এলো এমন এক শূন্যতা, যা কোনো শব্দ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
একজন বাবার কাছে সন্তানের মৃত্যু মানে কী?
রোজানের বাবা ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্যসচিব সাজ্জাদুল মিরাজ।
কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় যখন নিজের সন্তান জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে, তখন তিনি কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে ছিলেন না।
তিনি ছিলেন শুধু একজন বাবা।
যে বাবা সন্তানের জন্য চিকিৎসার দরজায় দরজায় ছুটেছেন।
যে বাবা প্রতিটি মুহূর্তে হয়তো অপেক্ষা করেছেন—ডাক্তার এসে বলবেন, “অবস্থা একটু ভালো।”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কাঙ্ক্ষিত কথাটি আর শোনা হলো না।
রাজনীতি, পদ-পদবি, পরিচিতি—সবকিছুই তখন অর্থহীন। সন্তানের নিথর শরীরের সামনে একজন বাবার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য একটাই—
সন্তানকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না।
রোজানের মৃত্যু আমাদের কী প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়?
একজন ১৮ বছরের তরুণ কেন এমন ভয়াবহ শারীরিক সংকটে পড়লেন—তার চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট কারণ চিকিৎসকদের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ও নথি ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
তবে রোজানের ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—আমাদের তরুণদের ওপর মানসিক চাপ কতটা বাড়ছে?
পরীক্ষা কি জীবনের চেয়ে বড়?
একটি পরীক্ষার ফল কি একজন মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে?
মেধাবী শিক্ষার্থীদের কাছে আমরা কি কখনো যথেষ্ট করে বলি—
“তুমি ব্যর্থ হলেও তুমি মূল্যহীন নও।”
পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের দায়িত্ব শুধু ভালো ফলাফল আশা করা নয়; একজন তরুণের মানসিক অবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া।
পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত চাপ, উদ্বেগ বা আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে অবহেলা না করে পরিবারকে সন্তানের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহায়তা নিতে হবে।
কারণ একটি ফলাফল খারাপ হওয়া সাময়িক—কিন্তু একটি জীবন হারিয়ে গেলে সেই ক্ষতি আর কখনো পূরণ হয় না।
রোজান, তোমার অসমাপ্ত গল্প
রোজানের হাতে আর কোনোদিন উঠবে না পরীক্ষার খাতা।
কোনোদিন আর ক্লাসে দাঁড়িয়ে সহপাঠীদের নেতৃত্ব দেবেন না তিনি।
BNCC-এর পোশাকে আর দেখা যাবে না তাকে।
কোনো শিক্ষক হয়তো আর বলবেন না—
“রোজান, তুমি সামনে থেকে নেতৃত্ব দাও।”
কোনো সহপাঠী হয়তো আর বলবে না—
“রোজান, চল একসঙ্গে পড়ি।”
এই ছোট ছোট স্মৃতিগুলোই এখন পরিবারের কাছে হয়ে থাকবে অমূল্য সম্পদ।
১৮ বছরের একটি জীবন আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে গেল—জীবন কতটা ভঙ্গুর।
আমরা ভবিষ্যতের জন্য কত পরিকল্পনা করি। পরীক্ষার ফল নিয়ে চিন্তা করি। ক্যারিয়ার নিয়ে দৌড়াই। সাফল্যের পেছনে ছুটি।
কিন্তু কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্যটি আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়—
জীবনটাই যদি না থাকে, তাহলে সাফল্যের সব সংজ্ঞাই অর্থহীন।
রোজানের জন্য আজ আর কিছু করার নেই।
শুধু তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো যায়।
তার রুহের মাগফিরাত কামনা করা যায়।
আর তার অসমাপ্ত স্বপ্নগুলোর দিকে তাকিয়ে আমাদের সন্তানদের একটু বেশি সময় দেওয়া যায়, একটু বেশি ভালোবাসা যায়, তাদের কথা একটু বেশি শোনা যায়।
রোজান আর নেই।
কিন্তু তার গল্প আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে থাকুক—
একটি পরীক্ষার ফল নয়, একটি তরুণের জীবনই সবচেয়ে মূল্যবান।
আল্লাহ রোজানকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এবং তার পরিবারকে এই অপূরণীয় শোক সহ্য করার শক্তি দিন। আমিন।




