Homeটুডে ওয়ার্ল্ডতারেক রহমানের দিল্লি সফর কেন আটকে গেল?

তারেক রহমানের দিল্লি সফর কেন আটকে গেল?

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ থেকে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য ও চীনের সঙ্গে ঢাকার নতুন ভারসাম্য—ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কি পুরোনো নির্ভরতার যুগ পেরিয়ে নতুন দরকষাকষির পর্যায়ে?

ঢাকা–নয়াদিল্লি | ২৪ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এখন আর কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফরের সূচি-সংক্রান্ত বিষয় নয়। এটি হয়ে উঠেছে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের বর্তমান অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে নয়াদিল্লি সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও বাংলাদেশ সরকার ২১ আগস্ট পর্যন্ত কোনো সফর চূড়ান্ত করেনি বলে জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহ বলেছেন, ঢাকা শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং অন্য পলাতক আসামিদের বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় আছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সফর নিয়ে কোনো নতুন তথ্য প্রকাশ করেনি।

এর মধ্যে ২১ আগস্ট ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন এমন একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, যাতে পরদিনের নিয়মিত Change of Guard অনুষ্ঠান বাতিলের কারণ হিসেবে বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মহড়ার কথা বলা হয়েছিল। পরে বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহার করা হয়। ঘটনাটি সফর নিয়ে অনিশ্চয়তাকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে।

এখন মূল প্রশ্ন—কেন একটি সম্ভাব্য রাষ্ট্রীয় সফর এত জটিল হয়ে উঠল?

এর উত্তর শুধু শেখ হাসিনা নন। তাঁর বিষয়টি সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা হলেও এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কয়েকটি প্রশ্ন: বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা, ভারতের সীমান্তনীতি, বাণিজ্যিক ভারসাম্য, পানি ভাগাভাগি, জ্বালানি নির্ভরতা এবং ঢাকা–বেইজিং সম্পর্কের নতুন মাত্রা।


🌍 কী ঘটেছে

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। এরপর বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ভারত বলেছে তারা অনুরোধটি পর্যালোচনা করছে। এদিকে ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়; হাসিনা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

৫ আগস্ট ২০২৬-এ দিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। ঢাকার অভিযোগ, ভারতের মাটিতে তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ভারত পাল্টা বলেছে, ওই আয়োজনের সঙ্গে সরকারের সম্পৃক্ততা ছিল না।


⚖️ আসল বাধা কি শেখ হাসিনা?

হ্যাঁ—কিন্তু পুরোপুরি নয়।

শেখ হাসিনা এখন ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সংকট। বাংলাদেশের জন্য এটি বিচার ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন; ভারতের জন্য এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিবেশী-রাষ্ট্রের সাবেক নেতাকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেই কূটনৈতিক ও আইনি প্রশ্ন।

বাংলাদেশ চায় প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত। ভারতকে আবার আইনগত কাঠামো, রাজনৈতিক অপরাধের ব্যতিক্রম এবং সম্ভাব্য বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন বিবেচনা করতে হচ্ছে। ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি দুই দেশের মধ্যে একটি আইনি ভিত্তি তৈরি করলেও এতে কিছু ব্যতিক্রমী ধারা রয়েছে, ফলে অনুরোধটি গ্রহণ করা স্বয়ংক্রিয় কোনো প্রক্রিয়া নয়।

অর্থাৎ, ঢাকার কাছে বিষয়টি ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির; দিল্লির কাছে এটি একই সঙ্গে আইন, কূটনীতি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।

এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই সমস্যাটিকে দীর্ঘায়িত করছে।


🇧🇩 ঢাকার নতুন বার্তা: ‘সম্পর্ক চাই, কিন্তু শর্তহীন নয়’

তারেক রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইছে—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং বাস্তব চিত্র তার বিপরীত।

ঢাকা বলছে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক প্রয়োজন। কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা এবং জাতীয় স্বার্থ

পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, সফরের জন্য এমন পরিবেশ প্রয়োজন যেখানে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান এবং কূটনৈতিক সংলাপ থাকবে। তিনি আরও বলেছেন, ঢাকার কোনো তাড়াহুড়া নেই।

এটি আসলে তারেক সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত:

ঢাকা দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক চায়—কিন্তু পুরোনো কাঠামোয় নয়।


🇮🇳 দিল্লির অবস্থান: সম্পর্কের দরজা বন্ধ নয়

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাম্প্রতিক বক্তব্যে যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন, সেটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—mutual interest, অর্থাৎ পারস্পরিক স্বার্থ।

তিনি বলেছেন, কোনো সম্পর্ক টেকসই হতে হলে তা উভয় পক্ষের স্বার্থ পূরণ করতে হবে; প্রতিবেশী শুধু ভারতের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে—এমন প্রত্যাশা তাঁর নেই।

এখানে দিল্লির অবস্থানও পরিষ্কার হচ্ছে।

ভারত তারেক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে চায় না। কিন্তু একই সঙ্গে তারা চাইছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক যেন তাদের নিরাপত্তা, সীমান্ত এবং আঞ্চলিক কৌশলগত উদ্বেগের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।

অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে এখন ‘বিশেষ সম্পর্ক’ নয়, ‘স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক’ নিয়ে নতুন দরকষাকষি চলছে।


🛃 সীমান্ত: সবচেয়ে নীরব কিন্তু বিস্ফোরক ইস্যু

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ। সম্পর্কের অবনতির সঙ্গে সীমান্তও নতুন করে উত্তেজনার উৎস হয়েছে।

রয়টার্সের জুনের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দেশ সীমান্তে সমন্বিত টহল, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ, অনিচ্ছাকৃত ও জোরপূর্বক সীমান্ত পারাপার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ বেড়েছে। বাংলাদেশ ভারতীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রোটোকল ছাড়াই লোকজনকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ করেছে; ভারত সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসীদের জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা চেয়েছে।

এই ইস্যু রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হওয়ার কারণ, ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর রাজনীতি এবং অবৈধ অভিবাসন প্রশ্নটি বিজেপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত।

ঢাকার কাছে বিষয়টি আরও সরাসরি—সীমান্তে কোনো ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া ঠেলে দেওয়া হলে তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।

ফলে তারেক সরকারের জন্য দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখলেও এই ইস্যুতে নরম দেখানোর রাজনৈতিক সুযোগ খুব সীমিত।


💧 পানি: সামনে আসছে আরও বড় পরীক্ষা

শেখ হাসিনা বা সীমান্তের বাইরেও এমন একটি প্রশ্ন আছে যার গুরুত্ব ভবিষ্যতে আরও বাড়বে—পানি।

গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ১৯৯৬ সালে ৩০ বছরের জন্য স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কথা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গঙ্গা ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে দুই দেশের কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল কূটনীতি নয়; এটি কৃষি, পরিবেশ, নদীর নাব্যতা, লবণাক্ততা এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পানি নিরাপত্তার প্রশ্ন।

এর সঙ্গে রয়েছে তিস্তা—যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চুক্তি হয়নি।

অতএব তারেক রহমান–মোদি বৈঠক হলে পানি সম্ভবত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব এজেন্ডা হতে পারে।


⚡ যে সম্পর্ক ভাঙেনি: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি

রাজনৈতিক সম্পর্ক যতই খারাপ হোক, দুই দেশের কিছু বাস্তব অর্থনৈতিক নির্ভরতা এখনো অক্ষুণ্ণ।

ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে এবং ভারতের সহায়তায় নির্মিত মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রকল্পও বাংলাদেশের গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনও জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে:

রাজনৈতিক দূরত্বের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ একে অপরকে টেনে রাখে।

বাংলাদেশ ভারতের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা পুরোপুরি বাদ দিতে পারবে না; ভারতও বাংলাদেশের বাজার, বন্দর ও আঞ্চলিক সংযোগকে উপেক্ষা করতে পারবে না।


🚢 বাণিজ্য: রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বাস্তব মূল্য

দুই দেশের অর্থনীতির আন্তঃনির্ভরতা সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় সীমান্ত বাণিজ্যে।

পেট্রাপোল–বেনাপোল দিয়ে দুই দেশের স্থলবাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ পরিচালিত হয়।

কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে বাণিজ্যে পড়ছে। বাংলাদেশভিত্তিক TBS-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।

আখাউড়া সীমান্তেও বাণিজ্যিক প্রবাহে ধাক্কার কথা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

অর্থাৎ সম্পর্কের রাজনৈতিক সংকটের মূল্য শুধু কূটনৈতিক টেবিলে দিতে হয় না।

ট্রাক থামে, পণ্য আটকে যায়, ব্যবসায়ীর নগদ প্রবাহ কমে এবং সীমান্ত এলাকার শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হন।


🇨🇳 চীন: দিল্লির জন্য নতুন সমীকরণ

এখানে এসে তারেক সরকারের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে—চীনের সঙ্গে সম্পর্ক।

বাংলাদেশ এখন একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরতার বদলে একাধিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

ভারতের জন্য এটি স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগত প্রশ্ন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ভারতকে বাদ দিয়ে চীনের দিকে যাচ্ছে। বরং ঢাকা সম্ভবত ভারত–চীন প্রতিযোগিতাকে ব্যবহার করে নিজের দরকষাকষির জায়গা বাড়াতে চাইছে।

এই কৌশল সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে ঢাকা কতটা ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে তার ওপর।


🇵🇰 পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক: দিল্লির আরেক উদ্বেগ

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে উষ্ণ হয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর আগ্রহ দুই দেশেই দেখা যাচ্ছে।

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি নিরাপত্তা প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে—বিশেষ করে ১৯৭১-এর ইতিহাসের কারণে।

কিন্তু ঢাকার জন্য বিষয়টি অন্যভাবে দেখা যায়:

বাংলাদেশ কি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বলয়ে যাবে, নাকি সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে?

তারেক সরকারের ‘Bangladesh First’ ধারণা কার্যকর হলে দ্বিতীয় পথটিই বেশি যৌক্তিক।


🛡️ ভারত কী হারাতে পারে?

দিল্লির জন্য বাংলাদেশ কেবল একটি প্রতিবেশী নয়।

বাংলাদেশ ভারতের—

  • উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ,
  • বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা,
  • সীমান্ত ব্যবস্থাপনা,
  • বাণিজ্যিক করিডোর,
  • বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা,
  • আঞ্চলিক যোগাযোগ

—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ এশীয় কৌশলগত অবস্থানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

তাই দিল্লির জন্যও সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কোনো সৌজন্য নয়; এটি জাতীয় স্বার্থের বিষয়


🇧🇩 বাংলাদেশ কী হারাতে পারে?

ঢাকার জন্যও ভারতকে দূরে ঠেলে দেওয়া সহজ নয়।

ভারত বাংলাদেশের নিকটতম বড় প্রতিবেশী অর্থনীতি। বিদ্যুৎ, স্থলবন্দর, চিকিৎসা, শিক্ষা, সরবরাহব্যবস্থা, সীমান্তবাণিজ্য এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই ভারতের সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু একই সঙ্গে অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও আছে।

তাই বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম কৌশল সম্ভবত:

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক—হ্যাঁ।
ভারতের ওপর একক নির্ভরতা—না।


🧭 তিনটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ

১. দ্রুত বরফ গলবে

ভারত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে কোনো বাস্তবসম্মত পথ দেখাবে, তারেক রহমান দিল্লি সফর করবেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত স্বাভাবিক করার চেষ্টা শুরু হবে।

এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য, পানি ও জ্বালানি সহযোগিতায় অগ্রগতি সম্ভব।

২. সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু ঠান্ডা থাকবে

এটি সবচেয়ে বাস্তবসম্মত স্বল্পমেয়াদি দৃশ্যপট।

শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক সফর বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু আমলা পর্যায়ের যোগাযোগ, সীমান্ত বৈঠক, বাণিজ্য ও বিদ্যুৎ সহযোগিতা চলতে থাকবে।

অর্থাৎ—

উচ্চ রাজনীতিতে দূরত্ব, বাস্তব প্রয়োজনে যোগাযোগ।

৩. নতুন আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরি হবে

যদি শেখ হাসিনা প্রশ্নের সমাধান না হয় এবং সীমান্ত, পানি ও বাণিজ্যেও উত্তেজনা বাড়ে, তাহলে ঢাকা আরও জোরালোভাবে চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, উপসাগরীয় দেশ ও পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে পারে।

তখন ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক কেবল দ্বিপক্ষীয় থাকবে না; এটি বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।


📅 ঘটনাপঞ্জি

আগস্ট ২০২৪ — শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন।

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে।

জুন ২০২৬ — বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে সমন্বিত টহল ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত।

৫ আগস্ট ২০২৬ — দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলন; ঢাকা প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানায়।

আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ — তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে জল্পনা বাড়ে।

২১ আগস্ট — বাংলাদেশ জানায়, সফরের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি; ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোনো নতুন তথ্য দেয়নি।

২১ আগস্ট — রাষ্ট্রপতি ভবনের অভ্যর্থনা মহড়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রত্যাহার।

২৩ আগস্ট — ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেন, বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।


🔎 দাবি বনাম যাচাইকৃত বাস্তবতা

“তারেক রহমানের ভারত সফর বাতিল হয়ে গেছে।”
এখনো এমন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। ২১ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ বলেছে, কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

“শেখ হাসিনাই একমাত্র সমস্যা।”
তিনি সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক বিরোধের জায়গা হলেও সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক কৌশলও সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

“ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায় না।”
এমন প্রমাণ নেই। বরং ভারতীয় কূটনৈতিক বক্তব্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও পারস্পরিক স্বার্থের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

“ঢাকা ভারতকে ছেড়ে চীনের দিকে চলে যাচ্ছে।”
এটিও অতিরঞ্জিত। বাংলাদেশের কৌশলকে বরং বহুমুখী অংশীদারিত্ব তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।


🇧🇩 বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থ কী বলছে?

ঢাকার সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ—সম্পর্কের পুনর্গঠন, কিন্তু আত্মমর্যাদা বজায় রেখে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো স্থায়ী সংঘাতের স্বার্থ নেই। আবার পুরোনো সম্পর্কের কাঠামোয় ফিরে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই।

একটি কার্যকর নতুন সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে—

সীমান্তে শূন্য-সহিংসতা → পানি বণ্টনে বাস্তব অগ্রগতি → বাণিজ্যে সমতা → জ্বালানি সহযোগিতা → প্রত্যর্পণ প্রশ্নে আইনগত স্বচ্ছতা → অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পারস্পরিক অ-হস্তক্ষেপ।

এগুলোর ওপর অগ্রগতি হলে তারেক রহমানের দিল্লি সফর কেবল একটি প্রোটোকল সফর হবে না; সেটি দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সূচনা হতে পারে।


শেষ কথা: আসল প্রশ্ন সফর নয়, সম্পর্কের নতুন কাঠামো

তারেক রহমান দিল্লি কবে যাবেন—এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো:

তিনি দিল্লিতে গেলে কী নিয়ে যাবেন?

শুধু সৌজন্য?

নাকি নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট?

ঢাকার জন্য এখনকার সুযোগ হলো, ভারতকে প্রতিপক্ষ বানানো নয়; আবার পুরোনো নির্ভরতার সম্পর্কেও ফিরে না যাওয়া। দিল্লির জন্যও সুযোগ হলো, ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্বীকার করে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এই সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু তার পরেও গঙ্গা চুক্তি, তিস্তা, সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, অভিবাসন, উত্তর-পূর্ব ভারতের সংযোগ এবং বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা—সবগুলো প্রশ্ন অপেক্ষা করছে।

তাই তারেক রহমানের দিল্লি সফর শেষ পর্যন্ত হবে কি না, সেটি কেবল একটি সূচির প্রশ্ন।

এই সফর আদৌ হবে কি না—তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশ ও ভারত কি পুরোনো সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে নতুন একটি সমতার সম্পর্ক তৈরি করতে পারবে?

বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, দুই দেশ একে অপরকে এড়িয়ে যেতে পারবে না।

কিন্তু ভবিষ্যতের সম্পর্কের ভাষা হয়তো বদলে গেছে:

বন্ধুত্ব থাকবে—কিন্তু শর্ত হবে পারস্পরিক স্বার্থ।
যোগাযোগ থাকবে—কিন্তু তার ভিত্তি হবে সার্বভৌম সমতা।
সহযোগিতা থাকবে—কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে।

এটাই সম্ভবত তারেক–মোদি যুগের বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments