Homeটুডে ওয়ার্ল্ডহরমুজের পর এবার প্রতিবেশী দেশগুলোকে হুমকি: ইরানের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ কি মধ্যপ্রাচ্যকে আরও...

হরমুজের পর এবার প্রতিবেশী দেশগুলোকে হুমকি: ইরানের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ কি মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

ট্রাম্পের ‘ইকোনমিক ডি-ডে’র জবাবে তেহরানের কড়া বার্তা—মার্কিন অবরোধে যোগ দিলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে ‘শত্রু’ হিসেবে বিবেচনার হুমকি; ঝুঁকিতে হরমুজের বিকল্প তেলপথ, উপসাগরীয় অর্থনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার

তেহরান–ওয়াশিংটন | ২৪ আগস্ট ২০২৬

ইরান যুদ্ধের সামরিক অধ্যায় শেষ হওয়ার আগেই সংঘাত এখন দ্রুত অর্থনৈতিক যুদ্ধের দিকে চলে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও তৃতীয় দেশকে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। এর জবাবে তেহরান সতর্ক করেছে—যে প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক অভিযানে অংশ নেবে, তাকে আর নিরপেক্ষ প্রতিবেশী হিসেবে দেখা হবে না; প্রয়োজন হলে তার অর্থনৈতিক স্বার্থও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন সচিব মোহসেন রেজাই রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম IRIB-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, প্রথমে তেহরান আলোচনার মাধ্যমে প্রতিবেশীদের দূরে রাখার চেষ্টা করবে। এরপর সতর্ক করবে। তারপরও কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগে অংশ নিলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। তিনি আরও বলেছেন, এখন পর্যন্ত ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে; কিন্তু মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থ আক্রান্ত হলে ভবিষ্যতে হিসাব বদলাতে পারে।

এটি নিছক আরেকটি রাজনৈতিক হুমকি নয়। কারণ একই সময়ে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর নতুন অর্থনৈতিক অভিযান হবে নজিরবিহীন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও মিত্রদের উদ্দেশে বলেছেন—তারা হয় এই প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকবে, নয়তো বিপরীতে থাকবে। অর্থাৎ ওয়াশিংটন এখন শুধু তেহরানকে নয়, তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোকেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক মানচিত্রে টেনে আনতে চাইছে।


🌍 কী ঘটেছে: যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট খুলল অর্থনীতিতে

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান-অভিযান শুরুর পর ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। জুনে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হলেও তা কার্যকরভাবে ভেঙে পড়ে; হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য থেকেই যায়। ফলে সামরিক হামলা থামেনি, আর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলও স্বাভাবিক হয়নি।

এখন ওয়াশিংটনের কৌশল বদলাচ্ছে।

সামরিক হামলার পাশাপাশি লক্ষ্য হচ্ছে—

তেল বিক্রি কমানো → বৈদেশিক মুদ্রা কমানো → বাণিজ্যিক পথ সংকুচিত করা → যুদ্ধ চালানোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করা → শেষ পর্যন্ত তেহরানকে আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করা।

কিন্তু এই কৌশলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—ইরান একা নয়।


⚠️ রেজাইয়ের হুমকির আসল অর্থ কী?

মোহসেন রেজাইয়ের বক্তব্যে তিনটি স্তর আছে।

প্রথম স্তর: কূটনীতি।
ইরান বলছে, প্রতিবেশী দেশগুলোকে বোঝানো হবে যেন তারা মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধে যোগ না দেয়।

দ্বিতীয় স্তর: সতর্কতা।
যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যাবে তাকে আরও একবার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেওয়া হবে।

তৃতীয় স্তর: প্রতিশোধ।
তবুও যদি কোনো দেশ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অংশ নেয়, তেহরান তার স্বার্থে আঘাত করার কথা বলছে।

এই ভাষা থেকে বোঝা যায়, ইরান এখন তার সামরিক যুদ্ধকে অর্থনৈতিক প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত করছে

আর এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

কারণ উপসাগরের দেশগুলো—সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ওমান—কেউই এই সংঘাতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে পারছে না।


🚢 হরমুজ বন্ধ—এবার বিকল্প পথও কি টার্গেট হবে?

হরমুজ প্রণালি ইতিমধ্যে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

স্বাভাবিক সময়ে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। যুদ্ধের পর থেকে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে কমেছে এবং তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু রেজাইয়ের নতুন বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করেছে।

তিনি শুধু হরমুজের কথা বলেননি। তিনি বলেছেন, উপসাগরের বাইরে থাকা বিকল্প তেল পরিবহন পথগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

এর অর্থ হতে পারে—যদি তেহরান মনে করে হরমুজের অবরোধ এড়িয়ে অন্য রুট দিয়ে তেল পরিবহন করা হচ্ছে, তাহলে সেই বিকল্প ব্যবস্থাও সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপের আওতায় আসতে পারে।

তাহলে সমস্যা আর হরমুজে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

পারস্য উপসাগর → ওমান উপকূল → আরব সাগর → লোহিত সাগর → ভূমধ্যসাগর—পুরো জ্বালানি করিডরই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।


🇦🇪 সংযুক্ত আরব আমিরাত: প্রথম বড় পরীক্ষা

সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসেছে। এর পেছনে ইরানি হামলার অভিযোগ রয়েছে।

ইউএইর সিদ্ধান্ত তেহরানের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ, দীর্ঘদিন ধরে দুবাই ও অন্যান্য আমিরাতি বাণিজ্যিক কেন্দ্র ইরানের জন্য আমদানি-রপ্তানি, আর্থিক লেনদেন এবং পুনঃরপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ হাব হিসেবে কাজ করেছে।

ফলে ইরানের প্রশ্ন এখন শুধু—

“কত দেশ আমাদের সঙ্গে বাণিজ্য করবে?”

তা নয়।

বরং—

“কোন দেশ আমাদের অর্থনৈতিক জীবনরেখা বন্ধ করতে মার্কিন চাপ মেনে নেবে?”


🇨🇳 আসল লক্ষ্য: চীন

ইরানের অর্থনৈতিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সম্ভবত চীনকে ঘিরে।

চীন ইরানের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার এবং ইরানি তেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। যুক্তরাষ্ট্র তাই বেইজিংকেও এই অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার অংশ করতে চাইছে। কিন্তু চীন প্রকাশ্যে জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যার সমাধান হবে না।

এখানে ওয়াশিংটনের দ্বিধা পরিষ্কার।

চীনের ব্যাংক বা তেল ক্রেতাদের ওপর ব্যাপক secondary sanctions আরোপ করলে ইরানের ওপর চাপ বাড়তে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সেটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের নতুন অর্থনৈতিক সংঘাতও তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে যখন দুই দেশ নিজেদের সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টাও করছে।

অর্থাৎ—

ইরানকে চাপে ফেলতে গিয়ে চীনের সঙ্গে নতুন যুদ্ধ শুরু করা—ট্রাম্পের জন্য এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত হতে পারে।


🇷🇺 রাশিয়া কেন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ?

রাশিয়া ইরানের চীনের মতো বড় বাণিজ্য অংশীদার নয়। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই বহু বছরের কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

এ কারণে মস্কোর বিরুদ্ধে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তেহরানের বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।

রাশিয়া ইতোমধ্যে পশ্চিমা আর্থিক কাঠামোর ওপর তার নির্ভরতা কমিয়েছে। ফলে নতুন নিষেধাজ্ঞা মস্কোর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে, কিন্তু আগের মতো করে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার নিশ্চয়তা দেয় না।

এখানেই ওয়াশিংটনের পুরোনো “economic coercion” মডেলের সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে।


🏛️ এটি কি শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত?

না।

এটি এখন তিনটি স্তরে চলছে।

প্রথম স্তর: যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান

যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ ও পারমাণবিক কর্মসূচি।

দ্বিতীয় স্তর: যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদার

চীন, রাশিয়া, ভারতসহ যেসব দেশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করে।

তৃতীয় স্তর: বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ

ডলারভিত্তিক ব্যবস্থা কি আরও শক্তিশালী হবে, নাকি রাষ্ট্রগুলো বিকল্প বাণিজ্য ও আর্থিক নেটওয়ার্ক দ্রুত গড়ে তুলবে?

এই তৃতীয় স্তরটাই সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি।


🛢️ জ্বালানি বাজার: হুমকির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র

হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার ফলে ইতোমধ্যে তেলের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। Reuters জানিয়েছে, সংঘাতের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে এবং পরিবহন ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

ফ্রান্স ও সৌদি আরব ইতোমধ্যে হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প বাণিজ্য ও জ্বালানি করিডর নিয়ে কাজ করার বিষয়েও আলোচনা করছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে ওমানের বাইরে বন্দর ব্যবহার, সৌদি পাইপলাইন সম্প্রসারণ এবং নতুন রেল সংযোগ।

এটি তেহরানের জন্য দ্বিমুখী সমস্যা।

একদিকে হরমুজ তার অন্যতম বড় leverage।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন হরমুজ বন্ধ থাকলে ক্রমে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যা ভবিষ্যতে ইরানের কৌশলগত প্রভাব কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে।


💥 সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিবর্তন: অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তুকে সামরিক লক্ষ্য বানানোর সম্ভাবনা

রেজাইয়ের বক্তব্যের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হলো মার্কিন “economic interests” আক্রান্ত করার হুমকি।

এখানে সামরিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।

ধরা যাক—

কোনো উপসাগরীয় রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করল।

তেহরান যদি তার তেল টার্মিনাল, পাইপলাইন, বন্দর, শিপিং কোম্পানি বা অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে, তাহলে সংঘাত সরাসরি Gulf economic infrastructure war-এ পরিণত হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের নয়।

ক্ষতি হবে পুরো বিশ্ব অর্থনীতির।


🕊️ একই সময়ে কূটনীতির একটি দরজাও খোলা

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে।

ইরানের নতুন নিরাপত্তা নেতৃত্বের বক্তব্য যতই কঠোর হোক, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এখনো আলোচনার পথকে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখছেন। Reuters জানিয়েছে, তিনি আগের MoU-কে একটি সম্ভাব্য সমাধানের পথ হিসেবে দেখিয়েছেন, যদিও হরমুজ ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিরোধের কারণে আলোচনা আটকে আছে।

এদিকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানও মধ্যস্থতার উদ্দেশ্যে তেহরান সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে খবর এসেছে।

অর্থাৎ একই সময়ে—

সামরিক চাপ বাড়ছে → অর্থনৈতিক হুমকি বাড়ছে → কিন্তু কূটনীতির দরজাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

এই দ্বৈত অবস্থাই বর্তমান সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।


🇮🇷 ইরানের অভ্যন্তরে চাপ কতটা?

এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি।

ইরান যে অর্থনৈতিকভাবে প্রচণ্ড চাপে আছে, তা নিয়ে খুব বেশি সন্দেহ নেই। AP-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও অর্থনৈতিক সংকোচনের কথা বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে।

অর্থাৎ তেহরানের “আমরা টিকে আছি” বার্তার অর্থ এই নয় যে অর্থনীতি সুস্থ আছে।

বরং বাস্তবতা হলো—

ইরান দুর্বল হয়েছে, কিন্তু ভেঙে পড়েনি।

এবং এই পার্থক্যটাই ট্রাম্পের কৌশলের সবচেয়ে বড় সমস্যা।


📊 তাহলে কার হাতে কত leverage?

ক্ষেত্রযুক্তরাষ্ট্রইরান
বৈশ্বিক আর্থিক ক্ষমতাঅত্যন্ত শক্তিশালীসীমিত
নিষেধাজ্ঞা আরোপব্যাপক সক্ষমতাসীমিত
সামরিক শক্তিবিশালঅসমমিত সক্ষমতা
হরমুজসরাসরি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নয়শক্তিশালী leverage
তেল বাজারনিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে প্রভাবসরবরাহ ব্যাহত করার ক্ষমতা
চীনের ওপর প্রভাবশক্তিশালী কিন্তু সীমিতগুরুত্বপূর্ণ তেল সম্পর্ক
দীর্ঘ যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতাব্যয়বহুলঅর্থনৈতিকভাবে আরও দুর্বল
আঞ্চলিক প্রতিশোধের সক্ষমতাঘাঁটি ও মিত্রদের ওপর নির্ভরশীলভূগোল ও মিত্র নেটওয়ার্কের সুবিধা

এই চিত্রে কোনো পক্ষই সম্পূর্ণ বিজয়ী অবস্থানে নেই।


🇧🇩 বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যয়

যদি হরমুজ সংকট দীর্ঘায়িত হয় এবং বিকল্প তেলপথেও হামলা শুরু হয়—

  • জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়তে পারে;
  • ডলার চাহিদা বাড়তে পারে;
  • শিপিং ও বীমা ব্যয় বাড়তে পারে;
  • শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়তে পারে;
  • খাদ্য ও সার আমদানিতে পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির জন্য তাই এই সংঘাতের সরাসরি সামরিক প্রভাব না থাকলেও অর্থনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ

তবে বর্তমানে বাংলাদেশের ওপর কী পরিমাণ প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে হরমুজে জাহাজ চলাচল কতদিন ব্যাহত থাকে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম কোথায় স্থির হয় তার ওপর।


📅 ঘটনাপঞ্জি

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরু।

জুন ২০২৬ — যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে MoU; পরে আলোচনা স্থবির।

জুলাই–আগস্ট — হরমুজে নৌ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত।

আগস্টের শুরু — ওমানের সঙ্গে হরমুজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা এগোয়, কিন্তু পানি খুলে দেওয়ার সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক শর্ত যুক্ত হয়।

২০ আগস্ট — ট্রাম্প নতুন অর্থনৈতিক চাপের ঘোষণা দেন; বেসেন্ট মিত্রদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

২২ আগস্ট — মোহসেন রেজাই প্রতিবেশীদের মার্কিন অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার সতর্কতা দেন।

২৩ আগস্ট — ইরান নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে ব্যর্থ হবে বলে প্রত্যাখ্যান করে; একই সময়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগের খবর আসে।


🔎 দাবি বনাম যাচাইযোগ্য বাস্তবতা

দাবি: ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোকে সরাসরি আক্রমণ করবে।
বাস্তবতা: রেজাই প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছেন, কিন্তু কোন দেশ বা কোন লক্ষ্যবস্তুতে কী ধরনের হামলা হবে, তা নির্দিষ্ট করেননি। এটি এখনো একটি রাজনৈতিক-সামরিক সতর্কবার্তা।

দাবি: যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানকে দ্রুত ভেঙে দেবে।
বাস্তবতা: ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক চাপে, কিন্তু বহু বছরের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটি বিকল্প বাণিজ্য ও তেল বিক্রির পথ তৈরি করেছে।

দাবি: চীন ও রাশিয়া ইরানকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারবে।
বাস্তবতা: তাদের সহায়তা ইরানের অর্থনৈতিক টিকে থাকার সুযোগ বাড়াতে পারে, কিন্তু কোনো দেশই সীমাহীন অর্থনৈতিক বা সামরিক সহায়তার নিশ্চয়তা দেয়নি।

দাবি: হরমুজ চিরকাল বন্ধ থাকবে।
বাস্তবতা: হরমুজে বাণিজ্যিক চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হলেও ওমানসহ বিভিন্ন পক্ষ বিকল্প ব্যবস্থাপনা ও পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা করছে।


🧭 এরপর কী হতে পারে?

সবচেয়ে সম্ভাব্য তিনটি পথ সামনে রয়েছে।

প্রথমত, নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক যুদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা বাড়াবে, কিন্তু চীন ও অন্যান্য বড় বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা করবে। ইরানও প্রতিবেশীদের সতর্ক করবে, কিন্তু বড় আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়িয়ে চলবে।

দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক বিস্তার।
কোনো উপসাগরীয় দেশ সক্রিয়ভাবে মার্কিন অবরোধে যুক্ত হলে ইরান তার অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত করতে পারে। তখন হরমুজের বাইরে নতুন সমুদ্রপথও যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

তৃতীয়ত, দরকষাকষির নতুন পর্ব।
অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার আলোচনায় ফিরতে পারে। পেজেশকিয়ানের বক্তব্য এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতার প্রস্তুতি এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে দিচ্ছে না।


শেষ কথা

এই মুহূর্তে ইরানকে ঘিরে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিবর্তন হলো—যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে।

আগে যুদ্ধ ছিল ক্ষেপণাস্ত্র বনাম বিমান।

এখন যুদ্ধ হচ্ছে—

নিষেধাজ্ঞা বনাম তেল।
হরমুজ বনাম বিকল্প সমুদ্রপথ।
ডলার বনাম বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থা।
ওয়াশিংটন বনাম বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক হিসাব।

ট্রাম্পের লক্ষ্য যদি হয় অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে তেহরানকে আলোচনায় বাধ্য করা, তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—ইরান কতটা চাপ সহ্য করতে পারবে এবং চীন-রাশিয়ার মতো অংশীদাররা কতটা বিকল্প পথ খোলা রাখবে।

অন্যদিকে ইরানের জন্যও ঝুঁকি কম নয়। প্রতিবেশীদের ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত করার হুমকি যদি বাস্তব সামরিক পদক্ষেপে রূপ নেয়, তাহলে তেহরান নিজেই আরও বড় আঞ্চলিক জোটের মুখোমুখি হতে পারে।

সুতরাং সামনে যে লড়াইটি, সেটিকে শুধু “কে কাকে হারাবে” হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

আসল প্রশ্ন হলো—

কে প্রথমে বুঝবে যে এই যুদ্ধ সামরিকভাবে যতটা কঠিন, অর্থনৈতিকভাবে তার চেয়েও বেশি ব্যয়বহুল?

আর সেই উপলব্ধিই হয়তো শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে—হরমুজ আবার খুলবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হবে।

তথ্যসূত্র

Reuters, Associated Press (AP), Al Jazeera, The Guardian, The Daily Ittefaq, CBS News; চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ্য বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সরকারি বিবৃতি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments