মো জুয়েল হাছান, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও ফ্রিল্যান্সার:
প্রযুক্তির বৈপ্লবিক অগ্রগতির ইতিহাস সবসময়ই দুইমুখী—এটি যেমন নতুন সম্ভাবনার দোরগোড়া খুলে দেয়, তেমনই চিরচেনা কাঠামোর ভেতরে আনে বড় ধরনের ভাঙন। সাম্প্রতিক সময়ে বহুজাতিক পরিবহন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘উবার’-এর একটি সিদ্ধান্ত পুরো বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তারা তাদের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ১০ শতাংশ, অর্থাৎ তিন হাজার তিনশো কর্মীকে ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এই বিপুল অর্থ তারা ঢালতে যাচ্ছে চালকবিহীন প্রযুক্তি ও ‘রোবোট্যাক্সি’র ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কাজে। এই একক পদক্ষেপটি যেন পুরো তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্বের আগামী দিনের এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
বিশ্ব জুড়ে কর্মসংস্থানের এই চরম পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন এবং এর বাস্তবতা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
সফল ব্যবসার মাঝেই কেন কর্মী ছাঁটাই?
সাধারণ ধারণা হলো—ব্যবসায় ধস নামলেই কেবল প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ছাঁটাই করে। কিন্তু এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। উবারের বার্ষিক আয় আগের বছরের তুলনায় শতকরা ১৮ ভাগ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাগুলোর কারণে সাম্প্রতিক প্রান্তিকগুলোতে তাদের যাতায়াত বুকিংও প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে।
তাহলে কেন এই ছাঁটাই? উবার কর্তৃপক্ষের মতে, দ্রুত বৃদ্ধির ফলে প্রশাসনিক কাঠামোর জটিলতা বেড়ে গেছে। ব্যবস্থাপনা স্তর কমিয়ে আরও গতিশীল ও সচ্ছল হওয়ার লক্ষ্যেই শীর্ষ পর্যায় থেকে নিচের দিকের কর্মী সংখ্যা ২০ শতাংশ কমানো হচ্ছে। একই সময়ে, আগামী কয়েক বছরে তারা চালকবিহীন আধুনিক প্রযুক্তিতে দশ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। সরাসরি নিজে গাড়ি না বানিয়ে অভিজ্ঞ স্বচালিত প্রযুক্তি উদ্ভাবকদের সঙ্গে অংশীদারিত্বে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার আধুনিক গাড়ি বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—চালকমুক্ত গাড়ির বাণিজ্যিকীকরণ ক্ষেত্রে বিশ্বসেরা প্ল্যাটফর্ম হওয়া, যাতে কোনো নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের সেবা ব্যবস্থা বাইপাস বা এ এড়িয়ে সরাসরি যাত্রীদের কাছে পৌঁছাতে না পারে।
মানুষ চালকের জায়গা কীভাবে নিচ্ছে রোবোট্যাক্সি?
পরিবর্তনের গতি সত্যিই বিস্ময়কর। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু স্বচালিত গাড়ি সেবাদাতার সাপ্তাহিক রাইড ৫০ হাজার থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখে পৌঁছেছে—অর্থাৎ দশগুণ বৃদ্ধি! বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত নগরীতে হাজার হাজার স্বচালিত গাড়ি প্রতিদিন লাখ লাখ মাইল পথ পাড়ি দিচ্ছে।
এই দ্রুত স্থানান্তরের পেছনে প্রধানত প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও বাণিজ্যিক কারণ কাজ করছে:
উচ্চমানের নিরাপত্তা প্রযুক্তি: সংবেদক, রাডার ও ক্যামেরার সমন্বিত প্রযুক্তির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন অত্যন্ত পরিপক্ক। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক স্বচালিত গাড়ি মানুষের পরিচালিত গাড়ির তুলনায় শতকরা ৬৮ ভাগ কম দুর্ঘটনায় জড়ায়।
বিপুল খরচ সাশ্রয়: প্রচলিত যাতায়াত সেবায় চালকের মজুরি বাবদ মোট খরচের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যয় হয়। চালকবিহীন মডেলে এই বিশাল অংশ সাশ্রয় হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের লাভের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়।
কম খরচের মডেল: অনেক প্রতিষ্ঠান কম খরচের ক্যামেরা-নির্ভর স্বচালিত ব্যবস্থা ব্যবহার করে দ্রুত নিজেদের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের ভবিষ্যৎ কী?
প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের নির্দিষ্ট কিছু সপ্তাহের বেতন, স্বাস্থ্যবীমা ও নতুন কর্মসংস্থান খোঁজার সাময়িক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে নতুন কোনো শিল্পে গিয়ে খাপ খাওয়ানো বেশ জটিল।
যাদের পরিচালনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তারা হয়তো সমজাতীয় অন্য অ্যাপ-ভিত্তিক পরিবহন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হতে পারেন। আর যাদের যানবাহন বহর পরিচালনা বা মানচিত্রায়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের জন্য স্বচালিত গাড়ির প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কিছু সুযোগ তৈরি হতে পারে; কারণ রোবোট্যাক্সিগুলোর জন্য মানুষ দ্বারা চালিত চার্জিং, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও নিয়মিত পরিদর্শনের কাজের প্রয়োজন এখনও ফুরিয়ে যায়নি।
তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমান প্রযুক্তি খাতে পেশাগত স্থানান্তর আর কোনো সাময়িক বিষয় নয়, বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
পরিবহন ছাড়া আর কোন কোন ক্ষেত্র ঝুঁকিতে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব কেবল সড়ক বা পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নেই।
গ্রাহক সেবা: স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম চ্যাট ব্যবস্থার দৌরাত্ম্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে গ্রাহক সেবা খাত। বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ এ কারণে পেশাগত অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
আর্থিক সেবা ও ব্যাংকিং: আর্থিক বিশ্লেষণ ও লেনদেনের স্বয়ংক্রিয়তার ফলে আগামী কয়েক বছরে বৈশ্বিক শেয়ার বাজার ও ব্যাংক খাতে কয়েক লাখ পদ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
উৎপাদন ও খুচরা বিক্রয়: কারখানার সংযোজন লাইন, পণ্য গুদামজাতকরণ এবং বিবরণী চালনায় দ্রুত রোবোটিক্স ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা জায়গা করে নিচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী মোট কর্মসংস্থানের একটি বিশাল অংশ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত পরিবর্তনের মুখোমুখি। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন নতুন প্রযুক্তির ফলে নতুন ধরণের চাকরিও তৈরি হবে; কিন্তু সমস্যা হলো—বিলুপ্ত হওয়া কাজ এবং নতুন তৈরি হওয়া কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নীতিনির্ধারক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানের প্রচলিত বেকারত্ব ভাতা বা সাময়িক সহায়তা ব্যবস্থাগুলো এই ধরনের আধুনিক ও কাঠামোগত কর্মসংস্থান সংকটের সমাধান করতে পারবে না।
এর জন্য প্রয়োজন:
দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও আয় সুরক্ষা: কর্মীদের কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রিতা ছাড়া নির্দিষ্ট মেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা দেওয়া।
কার্যকর পুনঃপ্রশিক্ষণ: কর্মীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে এমন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা, যে পেশাগুলো অদূর ভবিষ্যতে রোবট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রতিস্থাপিত হওয়ার ঝুঁকি কম।
ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা: কঠোর কোনো আইনি বাধা দিয়ে প্রযুক্তির অগ্রগতি থামিয়ে দিলে অন্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার অন্যদিকে কোনো সুরক্ষা নীতি না রাখলে বিশাল জনগোষ্ঠী মারাত্মক সামাজিক সংকটে পড়বে।
প্রযুক্তির এই তীব্র গতির সাথে মানবসম্পদ ও নীতি নির্ধারণের ভারসাম্য রক্ষা করাটাই এখন একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।




