Homeটুডে ওয়ার্ল্ডচীনের দুই মঞ্চে দুই বার্তা: একদিকে Xiangshan Forum, অন্যদিকে ‘Greater BRICS’

চীনের দুই মঞ্চে দুই বার্তা: একদিকে Xiangshan Forum, অন্যদিকে ‘Greater BRICS’

বেইজিংয়ে সামরিক ও নিরাপত্তা সংলাপ, নয়াদিল্লিতে বহুমেরু অর্থনৈতিক কাঠামোর ডাক—চীন কি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক নেতৃত্বের বিকল্প কেন্দ্র গড়ে তুলছে?

কূটনীতি ও কৌশলগত ডেস্ক | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের ভূমিকা এখন আর শুধু অর্থনীতি বা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একই দিনে এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চে চীনের কার্যক্রম সেই পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করেছে।

বেইজিংয়ে শুরু হচ্ছে Xiangshan Forum, যেখানে সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর এবং আন্তর্জাতিক সামরিক ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা করবেন।

অন্যদিকে নয়াদিল্লিতে BRICS সম্মেলনের পর চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং “Greater BRICS” ধারণাকে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার দিকে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।

দুই ঘটনাকে আলাদা করে দেখা গেলেও কৌশলগতভাবে এগুলো একই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত—

বিশ্ব নিরাপত্তা ও অর্থনীতির নেতৃত্ব কি ধীরে ধীরে একাধিক কেন্দ্রে বিভক্ত হচ্ছে?

Xiangshan Forum আসলে কী?

Xiangshan Forum চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্মেলন।

এটি দীর্ঘদিন ধরে চীনের প্রতিরক্ষা কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এবারের আয়োজনের সময়কাল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তাইওয়ান নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা রয়েছে।

দক্ষিণ চীন সাগরে সামুদ্রিক বিরোধ বাড়ছে।

জাপানের সঙ্গে চীনের সম্পর্কেও অবিশ্বাস আছে।

আর একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় তার সামরিক জোট ও নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব জোরদার করার চেষ্টা করছে।

এই পরিবেশে Xiangshan Forum বেইজিংকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ দিচ্ছে।

চীনের বার্তা: বহুমেরু বিশ্ব

চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডং জুন এবারের ফোরামে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বহুমেরু বিশ্বের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরতে পারেন বলে Reuters জানিয়েছে।

এর অর্থ হলো—বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত নয়—এমন একটি অবস্থান বেইজিং প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

এটি সরাসরি “যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জোট” তৈরির ঘোষণা নয়।

বরং চীনের কৌশল হলো—

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনার নিয়ম ও ভাষা তৈরির ক্ষেত্রে নিজের প্রভাব বাড়ানো।

তার সঙ্গে BRICS-এর যোগ কোথায়?

নয়াদিল্লির BRICS সম্মেলনে সি চিন পিং যে “Greater BRICS” ধারণা সামনে এনেছেন, সেটি একই কৌশলের অর্থনৈতিক দিক।

চীন চাইছে BRICS শুধু কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে না থেকে—

বাণিজ্য + প্রযুক্তি + অর্থায়ন + কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা + আর্থিক লেনদেন

—এসব ক্ষেত্রে আরও কার্যকর সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করুক।

চীনের প্রস্তাবের মধ্যে BRICS AI Open Source Zone, সেবা বাণিজ্য ফোরাম এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে সহযোগিতার মতো উদ্যোগ রয়েছে।

অর্থাৎ চীন এখন BRICS-কে শুধু পশ্চিমা ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নয়, একটি কার্যকর বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক হিসেবেও গড়ে তুলতে চাইছে।

কেন এখন?

এর পেছনে আন্তর্জাতিক পরিবেশের বড় পরিবর্তন কাজ করছে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিনিয়ত নতুন অগ্রাধিকার তৈরি হচ্ছে।

ইউরোপ ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে।

আর উন্নয়নশীল দেশগুলো আগের তুলনায় বেশি করে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিকল্প খুঁজছে।

এই পরিস্থিতিতে চীন বলছে—

বিশ্বকে একক শক্তিকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল রাখা যাবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর অর্থ কী?

ওয়াশিংটনের জন্য এটি একটি জটিল পরিবর্তন।

যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইনসহ একাধিক অংশীদারের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখছে।

কিন্তু একই সময়ে চীন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও আঞ্চলিক সম্মেলনের মাধ্যমে নিজের কূটনৈতিক প্রভাব বাড়াচ্ছে।

ফলে প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু যুদ্ধজাহাজ বা ক্ষেপণাস্ত্রের নয়।

কে নিরাপত্তার নিয়ম লিখবে—সেটিও এখন প্রতিযোগিতার অংশ।

রাশিয়া ও ভারত কোথায় দাঁড়িয়ে?

BRICS-এ রাশিয়া চীনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হলেও ভারত তার নিজস্ব স্বার্থে কাজ করে।

ভারত একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ইন্দো-প্যাসিফিক অংশীদার এবং BRICS-এর অন্যতম প্রধান সদস্য।

এই দ্বৈত অবস্থান দেখায়, বিশ্ব এখন সরল দুই শিবিরে বিভক্ত হচ্ছে না।

বরং একই দেশ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করছে, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক বা বহুপক্ষীয় মঞ্চে কাজ করছে।

এটাই সম্ভবত আগামী দশকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে চলেছে।

ইরান এখানে কেন গুরুত্বপূর্ণ

BRICS-এর সম্প্রসারিত কাঠামোয় ইরানের উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে এই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

ইরান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে।

তাই তেহরানকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টার বিপরীতে বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক একটি বিকল্প অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পথ তৈরি করছে।

এটি ইরানকে সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমা ব্যবস্থার বাইরে স্বাধীন অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে—এমন দাবি করা যাবে না।

কিন্তু তেহরান যে একা নয়, সেটি স্পষ্ট।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ

বাংলাদেশের জন্য চীনকেন্দ্রিক এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং জাপানের সঙ্গে একসঙ্গে সম্পর্ক রাখে।

ফলে বিশ্ব যদি সত্যিই আরও বহুমেরু হয়ে ওঠে, বাংলাদেশের সামনে সুযোগ থাকবে একাধিক অংশীদারের সঙ্গে কাজ করার।

তবে এর জন্য প্রয়োজন ভারসাম্য।

কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা কমাতে পারে।

বরং বাংলাদেশের স্বার্থ হলো—

বাণিজ্য বাড়ানো, বিনিয়োগ আনা, প্রযুক্তি সহযোগিতা নেওয়া এবং একই সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা।

এরপর কী হতে পারে

Xiangshan Forum এবং BRICS—দুই ক্ষেত্রেই যদি চীনের উদ্যোগ ধারাবাহিক হয়, তাহলে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র থাকবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও আর্থিক শক্তিগুলোর একটি।

কিন্তু তার পাশাপাশি চীন অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই একটি বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে চাইবে।

সুতরাং ভবিষ্যৎ বিশ্বকে হয়তো “আমেরিকা বনাম চীন”—এই সরল সমীকরণে বোঝা যাবে না।

বরং বাস্তবতা হতে পারে—

একাধিক শক্তিকেন্দ্র, একাধিক জোট এবং একই সঙ্গে একাধিক স্বার্থের রাজনীতি।

শেষ কথা

বেইজিংয়ের Xiangshan Forum এবং নয়াদিল্লির BRICS সম্মেলন—দুটো আলাদা অনুষ্ঠান।

কিন্তু দুই জায়গা থেকে আসা বার্তাটি একই দিকে ইঙ্গিত করছে।

বিশ্বের ক্ষমতার কাঠামো বদলাচ্ছে।

এই পরিবর্তন এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও আর্থিক শক্তি অক্ষুণ্ণ। চীনেরও বহু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হয়তো এখানেই—

বিশ্ব আর একজনের হাতে চলছে না।

আর এই পরিবর্তনের গতি যত বাড়বে, বাংলাদেশসহ মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্যও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির গুরুত্ব তত বাড়বে।

তথ্যসূত্র: Reuters, Associated Press, Al Jazeera, Xinhua, The Guardian, BRICS Summit materials.

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments