Homeটুডে ওয়ার্ল্ডহরমুজ পেরিয়ে বাব আল-মান্দেবেও আগুন: ইরান যুদ্ধ এখন বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার সংকট

হরমুজ পেরিয়ে বাব আল-মান্দেবেও আগুন: ইরান যুদ্ধ এখন বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার সংকট

তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, সৌদির বিকল্প পাইপলাইনও হামলার মুখে—মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ একসঙ্গে ঝুঁকিতে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন আর শুধু ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত নয়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থার ওপর গিয়ে পড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে ইয়েমেনের বাব আল-মান্দেব ঘিরে নতুন উত্তেজনা। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া, ইউরোপ ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে তেল সরবরাহের বিকল্প পথও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

রয়টার্সের সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। একই সময়ে হরমুজের বাধা এড়িয়ে সৌদি আরব যে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহনের চেষ্টা করছে, সেটিও হামলার কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে। আগস্টে এই বিকল্প রুট দিয়ে সৌদির তেল রপ্তানি দিনে প্রায় ৪–৫ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে নেমে প্রায় ২ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়ায় বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

একটি জলপথ বন্ধ হলে যে পথটি বাঁচায়, সেটিও এখন নিরাপদ নয়

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর। ইরানের ওপর সামরিক চাপ ও পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতায় সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

শুরুতে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন এমন একটি বিকল্প, যার মাধ্যমে পারস্য উপসাগর এড়িয়ে লোহিত সাগরের দিকে তেল নেওয়া যায়।

কিন্তু এখন ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের অগ্রগতি বাব আল-মান্দেবকে নতুন ঝুঁকির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

অর্থাৎ পরিস্থিতিটি এখন এমন—

হরমুজ অস্থিতিশীল, বাব আল-মান্দেব অস্থিতিশীল, আর বিকল্প পাইপলাইনও হামলার ঝুঁকিতে।

এতে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের নিরাপত্তা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

হুতিদের অগ্রগতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অবস্থান দখল করেছে এবং বাব আল-মান্দেবের কাছাকাছি তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোতে নতুন করে হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতির সামরিক গুরুত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বড়।

বাব আল-মান্দেব হলো এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার। সেখানে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে জাহাজকে দীর্ঘ বিকল্প পথে যেতে হয়। এতে বাড়ে—

জ্বালানি খরচ, বীমা ব্যয়, পরিবহন সময় এবং পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল কোথায় আটকে যাচ্ছে

ওয়াশিংটন ইরানের জ্বালানি রপ্তানি এবং হরমুজে তার প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু একই সময়ে ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা সামুদ্রিক chokepoint-গুলোতে চাপ বাড়াচ্ছে।

এখানে একটি কৌশলগত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, কিন্তু সেই চাপ যত বাড়ছে, ততই বিশ্ববাজারে জ্বালানি ঝুঁকি বাড়ছে। অর্থাৎ তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের একটি অংশের অর্থনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্র দেশগুলোকেও বহন করতে হচ্ছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণও বলছে, হরমুজে যুক্তরাষ্ট্র কিছু অগ্রগতি করলেও যুদ্ধের কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক সমাধান এখনো দেখা যাচ্ছে না। একই সময়ে হুতিদের তৎপরতা নতুন করে সংকট বাড়াচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আসল বিপদ কোথায়

তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে যাওয়া নিজেই সবচেয়ে বড় খবর নয়। আসল উদ্বেগ হলো—এই দাম কতদিন থাকবে।

দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ তেলের দাম মানে শিল্প উৎপাদনে বাড়তি খরচ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর সুদের চাপ।

পরিশোধিত ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির সরবরাহেও ঘাটতি দেখা দিলে খাদ্য পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাত একসঙ্গে চাপে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের ঝুঁকি কোথায়

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো জ্বালানি আমদানির ব্যয়।

তেলের আন্তর্জাতিক দাম দীর্ঘদিন ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে। এর সঙ্গে যদি সমুদ্র পরিবহনের বীমা ও freight cost বাড়ে, তাহলে জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হতে পারে, কারণ ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে পণ্য পাঠানোর shipping cost বাড়তে পারে।

তবে যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে কোন পর্যায়ে গিয়ে স্থিতিশীল হবে, তার ওপর প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে।

আগামী দিনের হিসাব

বর্তমানে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রশ্ন হলো—মধ্যপ্রাচ্যের কোনো পক্ষ কি এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে সামরিক সংঘাতের তুলনায় জ্বালানি বাজারের ক্ষতি নিজেদের জন্যও অসহনীয় হয়ে উঠবে?

যদি হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুই পথেই অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এটি আর আঞ্চলিক যুদ্ধ থাকবে না।

এটি হয়ে উঠবে বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট

আর সেই সংকটে সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে তেল আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর।

তথ্যসূত্র: Reuters, Associated Press, The Guardian, Al Jazeera, Prothom Alo.

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments