Homeনাগরিক দর্পণসাগর-রুনি হত্যা: ১৪ বছর পরও যে প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি

সাগর-রুনি হত্যা: ১৪ বছর পরও যে প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি

অজ্ঞাত ডিএনএ, প্রথম কয়েক ঘণ্টার অসঙ্গতি, ২০১৫ সালের পুরোনো অনুসন্ধান, নতুন ডিজিটাল সূত্র—সবকিছু আবার একসঙ্গে দেখলে তদন্তের সামনে কোন প্রশ্নগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি নিহত হওয়ার পর কেটে গেছে ১৪ বছর। মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তদন্তকারী সংস্থা বদলেছে, আদালত বারবার সময় দিয়েছেন। কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্টেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি। সর্বশেষ ২৭ আগস্ট আদালত আবার সময় দিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারণ করেন। এ নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমার সময় পিছিয়েছে ১২৯ বার

২০২৪ সালে উচ্চ আদালত দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে র‍্যাবকে তদন্ত থেকে সরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। তবু সেই নতুন ব্যবস্থাতেও তদন্ত শেষ হয়নি।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কিছু তদন্ত-সূত্রের কথা সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের যোগাযোগের সূত্র পাওয়া গেছে এবং সেটি যাচাই করা হচ্ছে। একই সময়ে বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশের সম্ভাব্য পূর্বজ্ঞান ও পরে ঘটনাস্থলের আলামত নষ্টের অভিযোগের কথা তুলেছেন। তবে এসব এখনো তদন্তের দাবি বা সূত্র, আদালতে প্রমাণিত সত্য নয়।

এই নতুন তথ্যের সঙ্গে যদি পুরোনো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো আবার পাশাপাশি রাখা হয়, তাহলে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সামনে কয়েকটি অমীমাংসিত জায়গা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ঘটনার প্রথম কয়েক ঘণ্টা: কোথায় ছিল অসঙ্গতি?

২০১৫ সালে যুগান্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে হত্যার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সূত্রের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে রুনির ভাই নওয়াজেশ আলম রিমনকে ঘিরে সময়, ঘটনাস্থলে তাঁর উপস্থিতি এবং পরিবারের প্রাথমিক বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একটি পুনঃপ্রকাশিত সংকলনে গৃহকর্মী দেলোয়ারা ও প্রতিবেশী সাহিদা রাজ্জাকের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে বলা হয়, তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে রুনির মা ও ভাইকে দেখেছিলেন এবং তখনকার আচরণ তাঁদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে রান্নাঘরের গ্রিলের একটি অংশ কেটে পালানোর বয়ান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।

এই তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো ২০১৫ সালের সংবাদ-প্রতিবেদনে প্রকাশিত সাক্ষ্য ও দাবি। এগুলোকে অপরাধের প্রমাণ বা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। বর্তমান তদন্তে প্রয়োজন হলে এসব সাক্ষ্য মূল মামলার নথির সঙ্গে আবার মিলিয়ে দেখা দরকার।

রিমনকে ঘিরে পুরোনো সন্দেহের জায়গাটি কী?

আপনার দেওয়া সংকলনে বলা হয়েছে, হত্যার দিন রুনির ভাই রিমনের বিরুদ্ধে পুলিশ সন্দেহ প্রকাশ করেছিল এবং পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ দাবিটি বর্তমান প্রকাশ্য সরকারি মামলার নথি দিয়ে আমরা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারিনি। তাই এটিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে না লিখে পুরোনো সংবাদ-সূত্রে উত্থাপিত অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত।

তবে রিমনের ওই রাতে রুনির বাসায় যাওয়ার দাবি ২০১৫ সালের যুগান্তর-ভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। একই প্রতিবেদনে র‍্যাবের একজন তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, রিমন সেদিন রাতে দুবার ওই ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ফোন নম্বর আর সক্রিয় পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে একই প্রতিবেদনে রিমনের ভাই নওশের আলম রোমান স্বীকার করেছিলেন যে রিমন বাসায় গিয়েছিলেন, তবে এটিকে হত্যার প্রমাণ মনে করার বিরোধিতা করেছিলেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাসায় যাওয়া নিজে কোনো হত্যার প্রমাণ নয়। তদন্তে এই তথ্যের সঙ্গে সময়, অবস্থান, ফোন রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শী, ডিএনএ এবং অন্য ফরেনসিক তথ্য মিলতে হবে।

১৬৪ ধারার জবানবন্দি নিয়ে যে বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার

সাগর-রুনি মামলার পুরোনো অনুসন্ধানে রুনির মা নূরুন্নাহার মির্জা, ভাই নওয়াজেশ আলম রিমন ও সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়ার উদ্যোগের কথা উঠে আসে। কিন্তু ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি না দেওয়া এবং তদন্তকারীদের কাছে কোনো বক্তব্য না দেওয়া একই বিষয় নয়। পরবর্তী র‍্যাবের অগ্রগতি প্রতিবেদন নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে মেঘকে জিজ্ঞাসাবাদের কথাও এসেছে। তাই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হলে মূল আদালত-নথি ও তদন্ত নথি দেখতে হবে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পুরোনো তথ্যকে আংশিকভাবে ব্যবহার করলে সহজেই ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

ঘটনাস্থল সংরক্ষণে প্রথম দিনের ভুল কি তদন্তকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে?

এটি মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুরোনো প্রশ্নগুলোর একটি।

র‍্যাবের অগ্রগতি প্রতিবেদন নিয়ে প্রথম আলোর প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, মামলার শুরুতে ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত পরীক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রে দুজন অজ্ঞাত পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ বৃত্তান্ত পাওয়া যায়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলার আটজন গ্রেপ্তার ব্যক্তি ও অন্যান্য সন্দেহভাজন-আত্মীয়সহ মোট ২১ জনের ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়েছিল।

এর আগে ২০১৩ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষার পর অজ্ঞাত দুই ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

কিন্তু ঘটনাস্থল নিয়ে আরেকটি সমস্যা ছিল। হত্যার পর অনেক মানুষ ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়েছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট বক্তব্যে উঠে আসে। ফলে বিভিন্ন আলামতে পরবর্তী স্পর্শ বা দূষণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এই কারণে অজ্ঞাত ডিএনএ পাওয়া গেলেও সেটি হত্যাকারীর কি না, তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ প্রয়োজন ছিল।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

২০১২ সালে পাওয়া ওই দুই অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ আজ পর্যন্ত কারও সঙ্গে মিলেছে কি না?

এটি বর্তমান তদন্ত সংস্থার কাছ থেকে পরিষ্কারভাবে জানা দরকার।

নতুন প্রযুক্তি কি পুরোনো ডিএনএকে আবার কার্যকর করতে পারে?

১৪ বছরে ফরেনসিক প্রযুক্তি অনেক এগিয়েছে। পুরোনো নমুনা থাকলে উন্নত ডিএনএ বিশ্লেষণ, নতুন তুলনামূলক নমুনা এবং বৃহত্তর ডেটাবেস ব্যবহার করে নতুন ফল পাওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে সবকিছু নির্ভর করবে নমুনার গুণমান, সংরক্ষণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হস্তান্তরের ওপর।

তাই বর্তমান তদন্তে শুধু “ডিএনএ পাওয়া গেছে” বললেই হবে না। জানতে হবে—কোন নমুনায় পাওয়া গেছে, পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল কি না, সেটি কারও সঙ্গে মেলানো হয়েছে কি না এবং ১৪ বছর পরও নমুনাটি পরীক্ষাযোগ্য অবস্থায় আছে কি না।

‘চুরি’ নাকি অন্য কিছু?

ঘটনার শুরু থেকেই বাসা থেকে কিছু জিনিস নিয়ে যাওয়ার বিষয় এবং চোর ঢোকার সম্ভাবনা তদন্তের অংশ ছিল। র‍্যাবের অগ্রগতি প্রতিবেদনে ২০১৫ সালেও গ্রিল কেটে ঢোকা বা বের হওয়ার সম্ভাব্য ঘটনাটি তদন্তের কথা ছিল। চুরি যাওয়া ল্যাপটপ ব্যবহার হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও বিটিআরসির সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু ঘটনাস্থলের গঠন, গ্রিলের প্রকৃতি, প্রবেশ ও বের হওয়ার সম্ভাব্য পথ, চুরি যাওয়া জিনিসের তালিকা এবং হত্যার সঙ্গে সেগুলোর সম্পর্ক—এসবের একটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্মূল্যায়ন আজও জনসমক্ষে নেই।

একই কারণে প্রথমে চুরি, পরে আত্মহত্যা—এই বয়ানগুলো কেন তৈরি হয়েছিল, সেটিও পুরোনো অনুসন্ধানের আলোকে পুনরায় যাচাই করা যেতে পারে। ২০১৫ সালের যুগান্তরভিত্তিক প্রতিবেদনে এমন বক্তব্য ও পারিবারিক প্রতিক্রিয়ার কথা প্রকাশিত হয়েছিল।

সাগর-রুনির ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কি তদন্তে প্রশ্ন ছিল?

পুরোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাঁদের দাম্পত্য জীবনে টানাপোড়েনের কথা কিছু সহকর্মী ও স্বজনের বক্তব্যে এসেছে। একইভাবে রুনির সঙ্গে মাকসুদুর রহমান রঞ্জুর যোগাযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। এসব তথ্য ২০১৫ সালের সংবাদ প্রতিবেদনের অংশ, এবং এগুলোর কোনোটিই হত্যার কারণ বা অপরাধের প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এখানে সাংবাদিকতার সীমারেখা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে কারও বক্তব্য থাকলেই সেটিকে হত্যার সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। তদন্তে এর প্রাসঙ্গিকতা তখনই তৈরি হবে, যখন যোগাযোগের সঙ্গে হত্যার সময়, উদ্দেশ্য, অর্থনৈতিক লেনদেন বা ফরেনসিক প্রমাণের সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া যাবে।

সাগর-রুনির কাছে কি কোনো সংবেদনশীল তথ্য ছিল?

এই প্রশ্নও বহু বছর ধরে আলোচনায়।

সাম্প্রতিক সময়ে তানভীর হাসান জোহার বক্তব্যে রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর তথ্য বা পূর্বজ্ঞান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তদন্ত বা আদালতের নথিতে সাগর-রুনির কাছে নির্দিষ্ট কোনো গোপন নথি ছিল এবং সেটি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই।

তাই এই সম্ভাবনাও তদন্তের বিষয় হতে পারে, কিন্তু এখনই কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘পূর্বজ্ঞান’-এর অভিযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

জোহার সাম্প্রতিক বক্তব্য যদি স্বাধীন তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে মামলার চরিত্রই বদলে যেতে পারে। কারণ তখন প্রশ্ন হবে শুধু হত্যাকারী কারা নয়; হত্যার আগে কেউ জানত কি না এবং হত্যার পর আলামত নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছিল কি না

তবে এই দাবি অত্যন্ত গুরুতর। তাই এখানে প্রমাণের মানও খুব উঁচু হতে হবে। ফোন রেকর্ড, অবস্থান-তথ্য, যোগাযোগের সময়, সরকারি নথি, প্রত্যক্ষদর্শী, ভিডিও এবং আলামত হস্তান্তরের নথি—সবকিছু দিয়ে দাবিটির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। শুধু কোনো কর্মকর্তার বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না।

একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ‘কানেকশন’: নতুন রহস্য, নাকি নতুন সূত্র?

৩০ আগস্ট প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট তথ্য নজরদারিতে রয়েছে।

এখানেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। যোগাযোগ থাকা আর হত্যায় জড়িত থাকা এক জিনিস নয়।

বর্তমান তদন্তের জন্য জানা প্রয়োজন—যোগাযোগটি কখনকার, কতবার হয়েছে, কোন নম্বর বা যন্ত্র ব্যবহার হয়েছে, সেটি হত্যার সময়ের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে তার মিল কোথায়।

নাম প্রকাশের আগে যাচাই শেষ করাই এখানে সবচেয়ে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পথ।

১৪ বছরে তদন্তের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কোথায়?

সাগর-রুনি হত্যায় শুধু একটি সংস্থা ব্যর্থ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তও যথেষ্ট নয়। ২০১২ সালে তদন্ত শুরু করে পরে ডিবি, র‍্যাব এবং শেষ পর্যন্ত উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সের হাতে গেছে মামলা।

একটি মামলায় এত বছর ধরে তদন্তকারী সংস্থা বদলানোর পরও যদি তদন্ত প্রতিবেদন না আসে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে তদন্তের ধারাবাহিকতা নিয়ে।

আরও বড় প্রশ্ন হলো—একটি হত্যামামলায় প্রাপ্ত সব তথ্যের কেন্দ্রীয়, সংহত বিশ্লেষণ হয়েছে কি না।

কারণ এই মামলায় আলাদা আলাদা জায়গায় আছে ডিএনএ, ফোন রেকর্ড, ঘটনাস্থলের আলামত, সাক্ষ্য, আর্থিক তথ্য, সাংবাদিকতার পুরোনো অনুসন্ধান এবং এখন নতুন ডিজিটাল সূত্র।

সবগুলোকে একসঙ্গে না দেখলে মামলার কোনো একটি অংশ হয়তো চিরকাল অন্ধকারে থেকে যাবে।

রাষ্ট্রের দায় শুধু খুনি ধরায় শেষ হয় না

সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার দায় প্রথমত সেই সময়ের রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর পড়ে, যার হাতে বছরের পর বছর তদন্তের দায়িত্ব ছিল। পরবর্তী সরকারগুলোর কাছেও একই প্রশ্ন রয়ে গেছে—ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন করে তদন্তের সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও কেন একটি কার্যকর নিষ্পত্তি হয়নি?

২০২৫ সালে সাগর-রুনির সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘের হাতে পূর্বাচলের একটি প্লটের দলিল হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেন এবং দ্রুত তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। প্লটটি সাগর সরওয়ার ২০০৪ সালে আবেদন করে ২০০৫ সালে পেয়েছিলেন এবং ২০০৯ সালে মূল্য পরিশোধ করেছিলেন।

কিন্তু পরিবারের জন্য সম্পত্তি বা সহায়তা কখনো হত্যার বিচারের বিকল্প হতে পারে না।

সাগরের মা সালেহা মনিরও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বলেছেন, ১৪ বছর পরও তিনি বিচার চান এবং তদন্ত নিয়ে তাঁর হতাশা রয়েছে।

এখন তদন্তে কোন কাজগুলো সবচেয়ে জরুরি?

বর্তমান তদন্ত সংস্থার সামনে মূল কাজ হওয়া উচিত পুরোনো ও নতুন প্রমাণকে একই কাঠামোয় আনা। ২০১২ সালের অজ্ঞাত দুই পুরুষের ডিএনএ আবার পরীক্ষা করা, গ্রেপ্তার হওয়া ও সন্দেহের তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে তা পুনর্মিলানো, পুরোনো ফোন রেকর্ড আধুনিক প্রযুক্তিতে পুনর্বিশ্লেষণ করা, ঘটনার দিন ও আগের কয়েক দিনের চলাচলের তথ্য যাচাই করা এবং ২০১২ সালের ঘটনাস্থলের আলামত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পুরো শৃঙ্খল পরীক্ষা করা জরুরি।

এর পাশাপাশি ২০১৫ সালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোর প্রত্যেকটি গুরুতর দাবিকে মূল মামলার নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেসব সাক্ষী তখন বক্তব্য দিয়েছিলেন, তাঁরা যদি এখনো জীবিত থাকেন, তাঁদের বক্তব্য পুনরায় নেওয়া যেতে পারে। নতুন তদন্ত-সূত্র হিসেবে যে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রসঙ্গ এসেছে, তাঁদের সম্পর্কেও প্রমাণভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন।

একটি মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: সত্যটি কোথায়?

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে আজও বহু তথ্য একে অন্যের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। কোথাও পুরোনো সংবাদ-প্রতিবেদন, কোথাও তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য, কোথাও পরিবারের অভিযোগ, কোথাও নতুন প্রযুক্তিগত সূত্র। তার সঙ্গে রয়েছে ২০১২ সালে পাওয়া অজ্ঞাত দুই পুরুষের ডিএনএ, যা এখনো মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত ফরেনসিক সূত্রগুলোর একটি।

কিন্তু এই সবকিছুর মাঝখানে সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না—সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার বিচার এখনো হয়নি।

১৪ বছর ধরে তাঁদের সন্তান বড় হয়েছেন। পরিবার অপেক্ষা করেছে। সাক্ষীরা বয়সী হয়েছেন। কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মারা গেছেন। প্রযুক্তি বদলেছে। তদন্তকারী সংস্থা বদলেছে। সরকার বদলেছে।

শুধু মামলাটি বদলায়নি।

এখন নতুন করে যে সূত্রগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো যদি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে ৩০ সেপ্টেম্বর আরেকটি তারিখ পাওয়ার বদলে দরকার প্রমাণসমৃদ্ধ তদন্ত প্রতিবেদন

আর সেটি না হলে ১২৯ বার সময় পিছোনোর পর ১৩০তমবারের অপেক্ষা শুধু একটি মামলার দীর্ঘসূত্রতা হবে না—এটি হবে রাষ্ট্রের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্নের আরও একটি দিন পিছিয়ে দেওয়া:

সাগর-রুনিকে আসলে কে হত্যা করেছিল, কেন করেছিল এবং ১৪ বছর ধরে সেই সত্যটি গোপন রয়ে গেল কীভাবে?

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, বিডিনিউজ২৪, প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার এবং ২০১৫ সালের যুগান্তর-ভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট আর্কাইভ। সাম্প্রতিক তদন্ত-সংক্রান্ত বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহার বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

—টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments