Homeটুডে ওয়ার্ল্ডহরমুজে সর্বাত্মক নৌসংঘাত, তেলের দাম পেরোল ১০০ ডলার

হরমুজে সর্বাত্মক নৌসংঘাত, তেলের দাম পেরোল ১০০ ডলার

যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ ইরানি ট্যাংকার ধ্বংসের পর ১০টি জাহাজে হামলার দাবি তেহরানের; বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আরও গভীর

দুবাই/তেহরান | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ছয় মাসের সংঘাত এবার সবচেয়ে তীব্র সামুদ্রিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে। এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালির কাছে ১০টি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে। একই সময়ে হরমুজ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন দ্রুত কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

ঘটনাটি এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাতের বিষয় নয়। হরমুজ প্রণালির বাণিজ্যিক নৌপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতির ওপর সরাসরি চাপ তৈরি হচ্ছে।

জাহাজে হামলার পাল্টাপাল্টি দাবি

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের পাঁচটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব ট্যাংকার ইরানের একটি ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ ছিল এবং ইরানের সামরিক কাঠামোকে অর্থায়নে সহায়তা করছিল।

অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানি বাহিনী হরমুজের আশপাশে একাধিক জাহাজে হামলা করেছে। তেহরানের দাবি, এগুলোর মধ্যে আটটি তেলবাহী জাহাজ এবং দুটি মার্কিন নৌযানও রয়েছে।

তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

হরমুজে বাণিজ্যিক চলাচল নেমে গেছে

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়।

কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার পর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমেছে। জাহাজ মালিকেরা নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বাড়তি বিমা ব্যয়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রে যাত্রা স্থগিত করছেন।

ফলে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ এখন বৈশ্বিক supply-chain সংকটে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

১০০ ডলারের ওপরে ব্রেন্ট

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নতুন পর্যায়ের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবার ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।

বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোতে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিল্প এবং কৃষি উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়তে পারে।

বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে এই চাপ দ্রুত দেখা দিতে পারে।

শুধু তেল নয়, গ্যাসের বাজারেও চাপ

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব শুধু অপরিশোধিত তেলের জন্য নয়। কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর LNG সরবরাহের সঙ্গেও এই জলপথের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

দীর্ঘ সময় নৌচলাচল ব্যাহত হলে LNG-এর সরবরাহ ও মূল্যও চাপে পড়তে পারে।

এর ফলে শীত মৌসুমে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি মজুত ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ইরান কি হরমুজকে পুরোপুরি বন্ধ করবে?

এখন পর্যন্ত তেহরান পুরো প্রণালি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ঘোষণা করেনি। বরং ইরানের কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ‘নিয়ন্ত্রিত’ বা restricted maritime zone তৈরির কথা বলছেন।

কিন্তু বাস্তবে যদি জাহাজ মালিকেরা নিরাপত্তার কারণে এই পথ ব্যবহার বন্ধ করেন, তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালি বন্ধ না করেও কার্যত সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে।

যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক চেষ্টা

সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করছে।

মিশর, ওমান ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সরাসরি আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়ে কোনো স্থায়ী সমঝোতা হয়নি।

বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানি করে। ফলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে।

এর প্রভাব পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়তে পারে।

একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

📊 হরমুজ সংকটের চিত্র

  • ব্রেন্ট ক্রুড: ১০০ ডলারের ওপরে
  • মার্কিন হামলায় ধ্বংস: ৫ ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার
  • ইরানের হামলার দাবি: ১০টি জাহাজ
  • সংঘাতের কেন্দ্র: হরমুজ প্রণালি
  • প্রধান ঝুঁকি: তেল, LNG ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল

🧭 সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, সেটিই এখন বিশ্ববাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

যদি সামরিক সংঘাত আরও বাড়ে এবং জাহাজ চলাচল আরও কমে যায়, তাহলে ১০০ ডলারের তেল সাময়িক ঘটনা না হয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

তথ্যসূত্র: Reuters, Associated Press, Al Jazeera, The Guardian

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments