Homeনাগরিক দর্পণফিদেল কাস্রো–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পূর্ণ ইতিহাস

ফিদেল কাস্রো–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পূর্ণ ইতিহাস

ক্যারিবিয়ানের ছোট দ্বীপ থেকে বিশ্বরাজনীতির বিস্ফোরণ

১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে কিউবায় বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন তরুণ বিপ্লবী নেতা Fidel Castro। তাঁর নেতৃত্বে গেরিলা বাহিনী দীর্ঘ লড়াইয়ের পর উৎখাত করে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সামরিক শাসক Fulgencio Batista-কে।

প্রথম দিকে ওয়াশিংটন নতুন সরকারের প্রতি সরাসরি বৈরী ছিল না। বরং মার্কিন প্রশাসন অপেক্ষা করছিল ফিদেলের প্রকৃত রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার জন্য। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

কাস্ত্রো ক্ষমতায় এসেই ভূমি সংস্কার শুরু করেন। কিউবার বিশাল আখখেত, চিনি শিল্প, তেল কোম্পানি এবং বহু মার্কিন মালিকানাধীন ব্যবসা রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় কোম্পানির কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ে।

ওয়াশিংটনের কাছে এটি শুধু অর্থনৈতিক আঘাত ছিল না; এটি ছিল আমেরিকার প্রভাব বলয়ের ভেতরে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ঘোষণা।

শত্রুতার সূচনা: ১৯৬০–১৯৬১

১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি শুরু করে। কিউবার প্রধান রপ্তানি পণ্য চিনি কেনা কমিয়ে দেওয়া হয়।

ফিদেল দ্রুত নতুন মিত্র খুঁজে নেন—সোভিয়েত ইউনিয়ন।

মস্কো কিউবার অর্থনীতিতে সহায়তা দিতে শুরু করে। সোভিয়েত নেতা Nikita Khrushchev কিউবাকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেন।

শীতল যুদ্ধের দুই মেরুর মধ্যে কিউবা হঠাৎই পরিণত হয় গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঘাঁটিতে।

১৯৬১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট John F. Kennedy-এর প্রশাসন সিআইএর সহায়তায় কিউবান নির্বাসিতদের ব্যবহার করে ফিদেলকে উৎখাতের গোপন পরিকল্পনা নেয়।

বে অব পিগস: অপমানের যুদ্ধ

১৯৬১ সালের এপ্রিল।

প্রায় ১,৪০০ কিউবান নির্বাসিত সৈন্য কিউবার দক্ষিণ উপকূলের “বে অব পিগস”-এ অবতরণ করে।

সিআইএর ধারণা ছিল, আক্রমণের পর সাধারণ মানুষ বিদ্রোহ করবে এবং ফিদেল সরকার ভেঙে পড়বে।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল উল্টো।

ফিদেল নিজে সামরিক পোশাক পরে যুদ্ধক্ষেত্রে যান। মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কিউবার সেনাবাহিনী হামলাকারীদের পরাজিত করে।

এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ঐতিহাসিক অপমান।

আর ফিদেলের জন্য এটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পুনর্জন্ম।

এই ঘটনার পর তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন:

“কিউবার বিপ্লব সমাজতান্ত্রিক।”

কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট: পৃথিবী পারমাণবিক যুদ্ধের কিনারায়

বে অব পিগসের পর ফিদেল উপলব্ধি করেন—যুক্তরাষ্ট্র আবার আক্রমণ করতে পারে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় গোপনে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন শুরু করে।

১৯৬২ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন গোয়েন্দা বিমান সেই ক্ষেপণাস্ত্রের ছবি ধারণ করে।

বিশ্ব আতঙ্কে কেঁপে ওঠে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি কিউবাকে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেন।

১৩ দিন ধরে বিশ্ব কার্যত পারমাণবিক যুদ্ধের কাউন্টডাউনে দাঁড়িয়ে ছিল।

শেষ পর্যন্ত গোপন সমঝোতা হয়—

সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সরাবে।

বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক থেকে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র সরাবে এবং কিউবায় আর সরাসরি হামলা করবে না।

বিশ্ব যুদ্ধ এড়ালেও ফিদেল ক্ষুব্ধ হন।

কারণ তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে ওয়াশিংটন ও মস্কো আলোচনা করলেও তাঁকে আলোচনায় রাখা হয়নি।

সিআইএর গোপন যুদ্ধ: হত্যাচেষ্টা

ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা নিয়ে বহু কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা শত শত পরিকল্পনা করেছিল।

এসবের মধ্যে ছিল—

বিষাক্ত সিগার

বিষ মেশানো খাবার

বিস্ফোরক শামুক

ডাইভিং স্যুটে জীবাণু

মাফিয়া-নিয়ন্ত্রিত হত্যাচক্র

ফিদেল পরবর্তীতে হাস্যরস করে বলেছিলেন:

“হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে থাকার অলিম্পিক হলে আমি স্বর্ণপদক জিততাম।”

অর্থনৈতিক অবরোধ: দীর্ঘ যুদ্ধ

১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর পূর্ণ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে।

এই অবরোধ শুধু সাময়িক শাস্তি ছিল না; এটি পরিণত হয় ইতিহাসের দীর্ঘতম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোর একটিতে।

কিউবার অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মুখে পড়ে।

ওষুধ, প্রযুক্তি, শিল্পযন্ত্র—সবকিছুতেই সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়।

ফিদেল এই অবরোধকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেন।

তিনি বারবার জনগণকে বলেন:

“আমরা দরিদ্র হতে পারি, কিন্তু আমরা স্বাধীন।”

আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় প্রক্সি সংঘাত

ফিদেল কিউবার বিপ্লবকে শুধু নিজের দেশে সীমাবদ্ধ রাখেননি।

তিনি অ্যাঙ্গোলা, ইথিওপিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন বিপ্লবী আন্দোলনে সহায়তা দিতে শুরু করেন।

হাজার হাজার কিউবান সৈন্য আফ্রিকায় যুদ্ধ করে।

যুক্তরাষ্ট্র এটিকে সোভিয়েত সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে দেখেছিল।

ফলে সংঘাত কেবল ক্যারিবিয়ান অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

সোভিয়েত পতনের পর নতুন সংকট

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ে।

কিউবা হঠাৎই তার প্রধান অর্থনৈতিক মিত্র হারায়।

দেশে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়।

এ সময়কে কিউবা “স্পেশাল পিরিয়ড” নামে অভিহিত করে।

বিদ্যুৎ নেই।

খাদ্য সংকট।

পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

অনেকে ধারণা করেছিলেন—ফিদেলের পতন সময়ের ব্যাপার।

কিন্তু তিনি টিকে যান।

ওবামার যুগ: বরফ গলতে শুরু

২০১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Barack Obama এবং ফিদেলের ভাই Raúl Castro সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন।

অর্ধশতাব্দীর বৈরিতার পর দুই দেশ দূতাবাস পুনরায় চালু করে।

ওবামা হাভানা সফরও করেন।

বিশ্ব ভেবেছিল নতুন যুগ শুরু হচ্ছে।

কিন্তু পরবর্তী মার্কিন প্রশাসন আবার কঠোর নীতি গ্রহণ করে।

সংঘাতের উত্তরাধিকার

ফিদেল–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতার অসম লড়াই সব সময় সামরিক শক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

একদিকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র।

অন্যদিকে ছোট্ট একটি দ্বীপ রাষ্ট্র।

তবুও ফিদেল কাস্ত্রো প্রায় পাঁচ দশক ধরে আমেরিকার রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করে টিকে ছিলেন।

সমর্থকদের চোখে তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক।

সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন একনায়ক।

কিন্তু একটি সত্য অস্বীকার করা কঠিন—

ফিদেল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত শুধু কিউবার ইতিহাস নয়; এটি পুরো শীতল যুদ্ধের অন্যতম শক্তিশালী নাটকীয় অধ্যায়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments