তিন দিনের সফরে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা প্রেসিডেন্ট; বৃহস্পতিবার মূল বৈঠক, সামনে ১১ মাসের বাণিজ্য-সমঝোতা ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার প্রশ্ন
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ওয়াশিংটনের কাছে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে স্বাগত জানাবেন। শির এই সফর প্রায় তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে তার প্রথম সফর। ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে দুই নেতার মূল বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতি ও দুই পরাশক্তির এই বৈঠক এমন সময়ে হচ্ছে, যখন দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, বিরল খনিজ, তাইওয়ান এবং ইরান ইস্যুতে মতপার্থক্য রয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশই সম্পর্ক পুরোপুরি সংঘাতের দিকে না নিয়ে একটি স্থিতিশীল কাঠামোর মধ্যে রাখার প্রয়োজন দেখছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১ মাসের বাণিজ্য-সমঝোতা নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকায় নতুন করে শুল্ক ও বাণিজ্য-চুক্তির আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাণিজ্য থেকে প্রযুক্তি
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় বিরোধের একটি হলো শুল্ক ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ। যুক্তরাষ্ট্র উন্নত প্রযুক্তির কিছু সরঞ্জাম ও চিপ চীনে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রেখেছে। চীন পাল্টা বিরল খনিজ, বিশেষ করে প্রযুক্তি ও শিল্পে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সরবরাহকে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বানিয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের আলোচনায় নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে শুল্ক কমানোর বিষয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে। মাদক পাচার ঠেকাতে সহযোগিতা এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। দুই দেশের মধ্যে আটক থাকা কিছু মার্কিন নাগরিকের বিষয়ও ট্রাম্প তুলতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে জানানো হয়েছে।
তাইওয়ান বড় প্রশ্ন
তাইওয়ান ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে মনে করে। ওয়াশিংটন তাইওয়ানের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত থাকলেও চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিকভাবে সতর্ক অবস্থান নেয়।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শি জিনপিং বৈঠকে তাইওয়ান নিয়ে চীনের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারেন। অন্যদিকে ট্রাম্প চীনের আপত্তি সত্ত্বেও প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের অবস্থান ধরে রাখতে চাইতে পারেন। ফলে বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে কিছু সমঝোতা হলেও তাইওয়ান বিষয়ে বড় অগ্রগতি পাওয়া কঠিন হতে পারে।
ইরানও আলোচনায়
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধও বৈঠকের বাইরে থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থির। চীন বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি আমদানিকারক এবং ইরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই ওয়াশিংটন-তেহরান সংকট সামলাতে চীনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতায় রয়েছে। তবে এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশই যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন অনুভব করছে। রয়টার্স জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার পর্যায়ে পৌঁছানো এআই-সম্পর্কিত বড় ঘটনার তথ্য বিনিময়ের একটি ব্যবস্থা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন
চীনা প্রেসিডেন্টকে ঘিরে হোয়াইট হাউস এবার বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজন করেছে। সামরিক সম্মান প্রদর্শন, রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে। নৈশভোজে অ্যাপল, এনভিডিয়া ও ওপেনএআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এই সফরের মূল পরীক্ষা অবশ্য আনুষ্ঠানিকতার বাইরে। দুই দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সম্পর্ক কতটা স্থিতিশীল রাখা যায় এবং বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন দফা এড়াতে কতটা সমঝোতা সম্ভব হয়, ২৪ সেপ্টেম্বরের বৈঠকেই তার কিছুটা ইঙ্গিত মিলতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স; চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; হোয়াইট হাউস; অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।




