জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিবাদ থেকে দেশজুড়ে বিক্ষোভ; প্যারিস, বোর্দো, মার্সেই, লিওঁসহ বিভিন্ন শহরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও দোকান লুট, পরিস্থিতি সামাল দিতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে পুলিশ
প্যারিস | ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির একাধিক বড় শহরে ব্যাপক বিক্ষোভের আড়ালে দোকানপাটে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার, ১৭ অক্টোবর, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খারাপ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আয়োজিত বিক্ষোভের একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। হামলার শিকার হয় নামী বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের বিপণিবিতান, ইলেকট্রনিকস ও মোবাইল ফোনের দোকান, সুপারমার্কেট এবং ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
লুটপাটের লক্ষ্যবস্তু হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল অ্যাপল, লুই ভিতোঁ, হার্মেস, রোলেক্স, ডিওরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের দোকান। বোর্দো শহরে অ্যাপল স্টোর লুটের খবর পাওয়া গেছে। প্যারিসের বিভিন্ন বিপণিবিতানে হামলার পাশাপাশি সুপারমার্কেট ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সহিংসতার ঘটনায় দেশজুড়ে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। বিক্ষোভের সময় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যুর খবরও জানিয়েছে পুলিশ। সহিংসতার পর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং লুটপাট ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার অঙ্গীকার করেছেন।
কীভাবে শুরু হলো এই বিক্ষোভ?
ফ্রান্সে সাম্প্রতিক আন্দোলনের পেছনে রয়েছে কয়েকটি অসন্তোষের সমন্বয়। একদিকে জ্বালানি, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে শিক্ষার্থীদের একাধিক প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছিল। সেই আন্দোলনের সঙ্গে শ্রমিক সংগঠন, বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী এবং ২০১৮ সালে আলোচিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীও যুক্ত হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আহ্বানের ভিত্তিতে ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য, মজুরি, পেনশন এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষকে একটি বৃহত্তর কর্মসূচির আওতায় আনা।
আন্দোলনের ব্যাপ্তি ছিল উল্লেখযোগ্য। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সেদিন দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিভিন্ন মিছিলে অংশ নেন। আয়োজকদের হিসাবে সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৮ লাখ। প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বহু মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল ও সমাবেশে অংশ নিলেও কিছু বিচ্ছিন্ন ও সংগঠিত গোষ্ঠীর তৎপরতায় পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। দেশজুড়ে অংশগ্রহণকারীদের সবাই দোকান লুট বা ভাঙচুরে জড়িত ছিলেন না। বরং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পাশাপাশি সহিংস গোষ্ঠীর তৎপরতা আন্দোলনের মূল দাবিগুলোকে আড়াল করে দেয়।
অ্যাপল, লুই ভিতোঁ, হার্মেসসহ কোন কোন দোকানে হামলা হয়েছে?
সহিংসতার সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যগুলোর একটি ছিল নামী ব্র্যান্ডের দোকানগুলোতে ভাঙচুর ও লুটপাট। বোর্দোর ব্যস্ত রু সাঁ-কাত্রিন শপিং সড়কে অ্যাপল স্টোরে লুটপাটের খবর প্রকাশিত হয়েছে। একই শহরে লুই ভিতোঁসহ অন্য দোকানেও হামলা হয়। দোকানের কাচ ভেঙে এবং প্রবেশপথের ধাতব শাটার ক্ষতিগ্রস্ত করে ভেতরে ঢুকে পণ্য নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
প্যারিসের অভিজাত কেনাকাটার এলাকাগুলোতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। লুই ভিতোঁ, হার্মেস, বারবেরি ও ডিওর-সংশ্লিষ্ট বিপণিবিতানের পাশাপাশি কেনজো, সালোমন, আর্ক’টেরিক্স, লাকোস্তে এবং সেলিনের মতো ব্র্যান্ডের দোকান ভাঙচুর বা লুটপাটের শিকার হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। কিছু দোকান কর্তৃপক্ষ আগেই নিরাপত্তার কারণে বন্ধ করে দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত বিপণিবিতানের কয়েকটি পরবর্তী দিনেও বন্ধ ছিল; কোথাও ভাঙা কাচের জায়গায় কাঠের পাটাতন বসিয়ে প্রবেশপথ বন্ধ করা হয়।
তবে লুটপাট শুধু দামি পণ্য বিক্রির দোকানে সীমাবদ্ধ ছিল না। মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিকসের দোকান, সুপারমার্কেট, ছোট মুদি দোকান, ক্যাফে এবং স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও আক্রান্ত হয়েছে। প্যারিসের কয়েকটি এলাকায় ফোনের দোকান থেকে আইফোন, স্যামসাং ফোন, কম্পিউটার, ম্যাকবুক ও নগদ অর্থ চুরি হওয়ার বিবরণ প্রকাশ করেছেন দোকানমালিকেরা।
কারফুর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের প্রায় ৫০টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২০টিতে লুটপাট চালানো হয়। মেরামত ও অন্যান্য ক্ষতির আর্থিক মূল্য কয়েক কোটি ইউরো ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ফরাসি বাণিজ্য ও বিতরণ ফেডারেশনের হিসাবে, দেশজুড়ে প্রায় দেড় হাজার দোকান ও খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানে সংখ্যাটি সব দোকান লুট হওয়ার নয়; ক্ষতিগ্রস্ত, ভাঙচুরের শিকার বা লুট হওয়া বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে গণনা করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার সঙ্গে এইচঅ্যান্ডএমসহ আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডের নামও ছড়িয়েছে। তবে নির্ভরযোগ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে এইচঅ্যান্ডএমের নির্দিষ্ট কোনো শাখা লুট হওয়ার তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
প্যারিসের বাইরে কী ঘটেছে?
সহিংসতা শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বোর্দো, লিওঁ, মার্সেই, লিমোজ, নঁত, রেন, স্ট্রাসবুর্গ, গ্রেনোবল, নিস ও আরও কয়েকটি শহরে দোকানপাটে হামলা, ভাঙচুর কিংবা অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে।
লিমোজ শহরে উনিশ শতকের ঐতিহাসিক সিটি হল বা নগর ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনে ভবনটির ছাদ ও ঘড়ির টাওয়ার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্সেইয়ে একদল লোক নগর ভবনে ঢুকে পড়ে এবং সেখানে ভাঙচুর চালায়। শহরটির একটি পুলিশ স্টেশনেও হামলার খবর পাওয়া যায়। লিওঁতে পর্যটন দপ্তরের একটি ভবনে আগুন লাগে। বোর্দোতে স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তার সরকারি বাসভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বেশ কয়েকটি দোকানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে বিশেষ পুলিশ ইউনিটও মোতায়েন করা হয়।
এই ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, আন্দোলনের অংশ হিসেবে হওয়া শান্তিপূর্ণ মিছিল এবং সুযোগ বুঝে লুটপাটে নামা গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা অনেক জায়গায় একই সময়ে চলছিল। একদিকে মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছিলেন; অন্যদিকে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি স্থাপনায় হামলা চালায়।
পুলিশ কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছে?
প্যারিসে প্লাস দ্য লা রিপাবলিকসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। একাধিক স্থানে জলকামান, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত গ্রেনেড এবং রাবার প্রজেক্টাইল নিক্ষেপকারী অস্ত্র ব্যবহারের খবর পাওয়া যায়। পুলিশ সদস্যদের ওপর পাথর, আতশবাজি ও অন্যান্য বস্তু ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
তবে পুলিশের প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্যারিসের কয়েকটি এলাকায় মুখোশধারী দল বিভিন্ন সড়কে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তারা কোথাও দোকানের শাটার ভাঙে, কোথাও আগুন ধরায়, আবার অন্য জায়গায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দল সক্রিয় থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরিয়ে নিতে হয়। ফলে কিছু এলাকায় দোকানমালিকেরা অভিযোগ করেছেন, বারবার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাৎক্ষণিক সহায়তা পাননি।
পুলিশ বলেছে, সহিংস গোষ্ঠীগুলো পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চাপ তৈরি করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ তাঁদের মধ্যে উগ্র বামপন্থী কর্মী ও সুযোগসন্ধানী অপরাধীদের দায়ী করেছেন। তবে আন্দোলনের সব অংশগ্রহণকারীকে সহিংসতার জন্য দায়ী করেননি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সমর্থকেরা। তাঁদের বক্তব্য, অপরাধমূলক তৎপরতার কারণে সাধারণ মানুষের ন্যায্য দাবিগুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে।
পুলিশের দমনপদ্ধতি নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে। সাঁত-এতিয়েন শহরে এক তরুণ বিক্ষোভকারী হাত হারিয়েছেন। মুলুজ শহরে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীর চোখ হারানোর ঘটনায়ও তদন্ত শুরু হয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশি দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র ব্যবহারের নিয়ম ও তার জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কতজন গ্রেপ্তার, কতটা ক্ষয়ক্ষতি?
ফরাসি কর্তৃপক্ষের ১৮ অক্টোবরের হালনাগাদ হিসাবে, দেশজুড়ে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাজধানী প্যারিস অঞ্চলেই গ্রেপ্তার হন ৮৫৫ জন। প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে ৫৫৭ জন তখনও পুলিশি হেফাজতে ছিলেন।
আহতদের মধ্যে পুলিশের সদস্য ছাড়াও সাধারণ মানুষ রয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভের সময় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে; এ ঘটনায় তদন্ত চলছে। একই সঙ্গে দোকানপাট, গাড়ি ও সরকারি স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব এখনো নির্ধারিত হয়নি।
কারফুরের মতো বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ছোট মোবাইল ফোনের দোকান—সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই এই সহিংসতার আর্থিক বোঝা বহন করছে। বহু দোকানমালিকের জন্য ক্ষতির পরিমাণ শুধু ভাঙা কাচ বা মেরামতের খরচ নয়; চুরি হয়ে যাওয়া পণ্য, বন্ধ থাকা দোকানের আয়হানি এবং কর্মীদের কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও তৈরি হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মাখোঁ কী বলেছেন?
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে লুটপাট ও ভাঙচুরের তীব্র নিন্দা জানান। তাঁর বক্তব্য, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা নাগরিকদের ন্যায্য উদ্বেগ রয়েছে; কিন্তু সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ধ্বংস করার কোনো বৈধতা নেই। যারা দোকান লুট করেছে, তাদের ক্ষয়ক্ষতির দায় নিতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মাখোঁ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেননি। তবে সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে স্থানীয় পর্যায়ে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা প্রশাসনকে প্রয়োগ করতে বলেছেন।
অন্যদিকে বিরোধী রাজনীতিকেরা সরকারের নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তাঁদের প্রশ্ন, এত বড় কর্মসূচিতে সহিংসতার ঝুঁকি আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিল কি না এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পর্যাপ্তসংখ্যায় মোতায়েন করা হয়েছিল কি না। ফলে এখন ফ্রান্সে বিতর্কের দুটি দিক রয়েছে: একদিকে লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের দাবি, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অসন্তোষের কারণ এবং পুলিশের প্রস্তুতি নিয়ে জবাবদিহি।
১৯ অক্টোবর পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়িয়ে?
সোমবারের মধ্যে প্যারিসের অনেক এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর সামনে কাঠের পাটাতন বসানো হয়েছে, ভাঙা কাচ সরানো হচ্ছে এবং কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আবার খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে লুটপাটের শিকার যেসব দোকানে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি বন্ধ রয়েছে।
রোববারও প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন। সেখানে আবারও উত্তেজনা তৈরি হলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। অর্থাৎ শনিবারের বড় সহিংসতার পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সরকার এখন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা, অপরাধীদের শনাক্তকরণ ও গ্রেপ্তার এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচির নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের মূল দাবিগুলো—জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষাব্যবস্থার মান ও জনসেবার অবস্থা—নিয়ে রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার চাপও বাড়ছে।
প্রতিবাদের আড়ালে লুটপাট: ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষও
ফ্রান্সের এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, সামাজিক অসন্তোষ থেকে বড় আন্দোলন তৈরি হলেও তার সব অংশগ্রহণকারীর উদ্দেশ্য এক নয়। যারা মজুরি, শিক্ষা বা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নেমেছিলেন, তাঁদের দাবি আর মুখোশ পরে দোকানের কাচ ভেঙে পণ্য লুট করা ব্যক্তিদের অপরাধকে এক করে দেখা যায় না।
লুই ভিতোঁ বা অ্যাপল স্টোরের মতো বহুজাতিক ব্র্যান্ডের দোকান আক্রান্ত হওয়া আন্তর্জাতিক সংবাদে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ছোট ব্যবসা, ফোনের দোকান, সুপারমার্কেট ও স্থানীয় উদ্যোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকের জন্য একটি দোকানই পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। ফলে লুটপাটের ক্ষতি কেবল বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব বা বীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং ছোট ব্যবসার টিকে থাকার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফ্রান্সের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ: সহিংসতা ও লুটপাটের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে সেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের মোকাবিলা করা, যা বিপুলসংখ্যক মানুষকে বিক্ষোভে অংশ নিতে উৎসাহিত করেছে। কেবল গ্রেপ্তার বাড়িয়ে পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হতে পারে; কিন্তু জনজীবনের ব্যয়, শিক্ষাব্যবস্থা ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে মানুষের অসন্তোষের উত্তর না মিললে রাজনৈতিক অস্থিরতা ফের মাথাচাড়া দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, এএফপি, লে মঁদ, ইউরোনিউজ, ভোগ বিজনেস, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস




