জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দীর্ঘ বৈঠক; তেহরানের শর্তে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার ও সম্পদ ছাড়ার দাবি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও কূটনৈতিক যোগাযোগ হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষ দীর্ঘ সময় আলোচনা করে। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্স ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে এটিকে কয়েক মাসের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে বারবার যাতায়াত করে আলোচনা এগিয়ে নিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য পরে সাংবাদিকদের বলেন, মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানের প্রতিনিধিদের প্রায় তিন ঘণ্টার “খুব ভালো” বৈঠক হয়েছে। পরে হোয়াইট হাউস স্পষ্ট করে যে ট্রাম্প নিজে ওই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন না।
হরমুজ এখন আলোচনার কেন্দ্রে
ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালীর স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা। আল জাজিরার প্রতিবেদনে ইরানি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, তেহরান মার্কিন নৌ অবরোধ শিথিল, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড় এবং যুদ্ধের অবসানের সঙ্গে হরমুজ পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টিকে যুক্ত করছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, একজন ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং বন্দর অবরোধ তুলে নিলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ দিয়ে চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে তেহরান বিবেচনা করতে পারে। তবে এটি এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা নয়।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের বড় একটি অংশ চলাচল করে। যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় তেল, গ্যাস ও জাহাজভাড়ার বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে নৌপথটি স্বাভাবিক হওয়া শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও।
একদিকে আলোচনা, অন্যদিকে হুমকি
আলোচনা শুরুর খবর এলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে কঠোর ভাষাও দেখা গেছে। ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হলে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের কথা বলেন। একই বক্তব্যে তিনি কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনার কথাও জানান।
ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা কঠোর বক্তব্য এসেছে। তেহরান জানিয়েছে, সামরিক চাপ অব্যাহত থাকলে তারা প্রতিরোধ করবে। ফলে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হলেও যুদ্ধবিরতির জন্য প্রয়োজনীয় আস্থার ঘাটতি এখনো বড় বাধা।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সক্রিয়তা
কাতার ও ওমানসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ আলোচনার পথ খোলা রাখতে সক্রিয় হয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানির সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বৈঠক হয়েছে। সেখানে উত্তেজনা কমানো, নৌ চলাচল নিরাপদ রাখা এবং আলোচনার পরিবেশ তৈরির বিষয় উঠে এসেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোর ধারণা নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে প্রস্তাবটির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
সামনে কী
দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ আবার শুরু হওয়াকে কূটনৈতিক সম্ভাবনার একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হলেও এখনো কোনো যুদ্ধবিরতি, স্থায়ী চুক্তি কিংবা হরমুজ খোলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। বরং আলোচনার পাশাপাশি সামরিক চাপ ও কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্যও চলছে।
তাই আগামী কয়েক দিনে মূল নজর থাকবে তিনটি বিষয়ে—হরমুজে নৌ চলাচল, যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায় এবং দুই পক্ষের শর্তের মধ্যে বাস্তব কোনো সমঝোতা তৈরি হয় কি না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক তেলের দাম, জাহাজ চলাচল এবং এশিয়া-ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স; অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস; এএফপি; আল জাজিরা; ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।




