হুথিদের পশ্চিমাঞ্চলীয় অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সরকারি বাহিনীর বিমান হামলা; বাব আল-মান্দাবকে ঘিরে বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
সানা/তাইজ | ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইয়েমেনে নতুন করে ভয়াবহ লড়াই শুরু হয়েছে। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে সংঘর্ষে গত কয়েক দিনে ৬০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্র জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে সরকারি বাহিনীর সদস্য, হুথি যোদ্ধা এবং বেসামরিক মানুষও রয়েছেন।
এই সংঘর্ষকে ২০২২ সালের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর দেশটির সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন আবার লড়াই শুরু হলো?
হুথিরা পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ ও হোদেইদাহ এলাকায় নতুন করে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে।
তাদের লক্ষ্য কৌশলগত উচ্চভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। এসব এলাকা থেকে লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে যাতায়াতের পথ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
বাব আল-মান্দাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। লোহিত সাগর দিয়ে ইউরোপ-এশিয়ার একটি বড় অংশের জাহাজ চলাচল করে।
সরকারি বাহিনীর পাল্টা বিমান হামলা
হুথিদের স্থল অভিযান ঠেকাতে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার বিমান হামলা শুরু করেছে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুক্রবার সরকারি যুদ্ধবিমান অন্তত ১৫টি হামলা চালিয়েছে। লক্ষ্য ছিল হুথি অবস্থান, যানবাহন ও সমাবেশ।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সরকারি বাহিনীর বিমান হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।
বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও সামনে
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘর্ষে ২৬ জন সরকারি যোদ্ধা, ৩১ জন হুথি যোদ্ধা এবং তাইজে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ছয়জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
তবে স্থানীয় সংঘাতের ক্ষেত্রে হতাহতের সংখ্যা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে এবং বিভিন্ন পক্ষের দেওয়া হিসাবের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।
তাই প্রতিটি ঘটনার সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
বাব আল-মান্দাব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল। সুয়েজ খাল ব্যবহারকারী বহু জাহাজ এই পথ অতিক্রম করে।
যদি হুথিরা এই অঞ্চলে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে এবং জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে আন্তর্জাতিক শিপিং ব্যয় আবারও বাড়তে পারে।
এটি এর আগে বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল।
ইয়েমেনের পুরোনো মানবিক সংকটও ফিরছে
২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনে চলা গৃহযুদ্ধে ইতোমধ্যে দেড় লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব রয়েছে।
লড়াই কমে যাওয়ায় মানবিক পরিস্থিতি সামান্য স্থিতিশীল হলেও লাখ লাখ মানুষ এখনও খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ওপর নির্ভরশীল।
নতুন করে বড় যুদ্ধ শুরু হলে এই সংকট আবারও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
আঞ্চলিক সমীকরণও জটিল
হুথিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠতার কারণে ইয়েমেনের সংঘাত সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর শক্তির দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকার সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক শক্তির সমর্থন পেয়ে থাকে।
ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধ শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাত নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের নৌবাণিজ্যে কি প্রভাব পড়তে পারে?
বাংলাদেশ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সমুদ্রবাণিজ্যের জন্য আন্তর্জাতিক শিপিং রুটের ওপর নির্ভরশীল।
বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগর অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে জাহাজকে দীর্ঘ বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের বাণিজ্যে নতুন বড় ধরনের বিঘ্নের নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
📊 সংঘাতের বর্তমান চিত্র
- নিহত: ৬০+
- সরকারি বাহিনীর নিহত: ২৬
- হুথি যোদ্ধা নিহত: ৩১
- তাইজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেসামরিক নিহত: ৬
- সরকারি বিমান হামলা: অন্তত ১৫
- গুরুত্বপূর্ণ জলপথ: বাব আল-মান্দাব
🧭 সামনে কী?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে হুথিরা পশ্চিম উপকূলে আরও অগ্রসর হতে পারে কি না এবং সরকারি বাহিনী তাদের ঠেকাতে কতটা সক্ষম হয়।
লড়াই বাব আল-মান্দাবের কাছে পৌঁছালে বিষয়টি শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও বিশ্ববাণিজ্যেও পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: Al Jazeera, The Guardian, Reuters, AFP




