Homeটুডে ওয়ার্ল্ডশিক্ষার্থী আন্দোলন ঘিরে মোদি সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়ছে

শিক্ষার্থী আন্দোলন ঘিরে মোদি সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়ছে

‘পড়ুয়াদের রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো হচ্ছে’—রাজনাথের অভিযোগ; সোনম ওয়াংচুককে অনশন ভাঙার আহ্বান সিজেপির

নয়াদিল্লি | ২২ জুলাই ২০২৬

ভারতের জাতীয় চিকিৎসা ভর্তি পরীক্ষা (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন শুধু শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নয়, বরং দেশটির জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। একদিকে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন বাড়ছে দেশ-বিদেশে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার অভিযোগ করছে, শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষা, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া—তিনটি ইস্যুই এখন একসঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে।

বুধবার সকালে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক শক্তি ছাত্র-যুবকদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। তাঁর ভাষায়, দিল্লিতে চলমান ধারাবাহিক বিক্ষোভ উদ্বেগজনক এবং শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারের এই বক্তব্য স্পষ্ট করে যে, কেন্দ্র আন্দোলনটিকে কেবল শিক্ষাব্যবস্থার সংকট হিসেবে নয়, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও মূল্যায়ন করছে।

অন্যদিকে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠা পরিবেশবাদী সোনম ওয়াংচুককে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছে। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওয়াংচুকের আত্মত্যাগ ইতোমধ্যে একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং তাঁর স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি এখন অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। একই সঙ্গে সিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অনশন শেষ হলেও পরীক্ষা ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন আরও জোরালোভাবে চালিয়ে যাওয়া হবে।

সরকারের সঙ্গে সংলাপ নিয়েও কঠোর অবস্থানে রয়েছে সিজেপি। দলের প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার বাসভবনে আলোচনার আমন্ত্রণ তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, জনগণের আন্দোলনের আলোচনা জনগণের মধ্যেই হতে হবে। তাই যন্তর মন্তর বা এর আশপাশের কোনো নিরপেক্ষ স্থানে সরকার চাইলে আলোচনা করতে পারে, তবে আনুষ্ঠানিক সরকারি বাসভবনে গিয়ে বৈঠকে বসবে না আন্দোলনের প্রতিনিধিরা।

এদিকে ২৫ দিন ধরে অনশন চালিয়ে যাওয়া সোনম ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তবুও যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের উপস্থিতি কমেনি; বরং বুধবার সকাল থেকেই নতুন করে ভিড় বাড়তে দেখা গেছে। আন্দোলনকারীদের একমাত্র দাবি—কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং জাতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার।

ছাত্র আন্দোলন এখন ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও সান হোসে, যুক্তরাজ্যের লন্ডন এবং আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ‘হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস’সহ কয়েকটি অধিকারভিত্তিক সংগঠন সোনম ওয়াংচুকের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ করেছে। সেখান থেকেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার দাবি জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক শহরগুলোতে সংহতি কর্মসূচি এই আন্দোলনের প্রতি বৈশ্বিক মনোযোগ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তাপ কমছে না। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী)সহ বিরোধী দলগুলো আগের চার দফা দাবির সঙ্গে নতুন করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগের দাবিও যুক্ত করেছে। তাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগের দায় রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও নিতে হবে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সংসদে শিক্ষানীতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এখন বিরোধীদের অন্যতম প্রধান দাবি।

আন্দোলনের প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতোমধ্যে আন্দোলনকারীদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন। রাজ্যসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের মুখ্য সচেতক নাদিমুল হক শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়ে নোটিশ দিয়েছেন। তৃণমূলের সাংসদ মহুয়া মৈত্রও আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিচ্ছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, সরকারের জন্য এই আন্দোলন এখন ‘আউট অব সিলেবাস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং শুধু শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।

🌍 ভূরাজনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

ভারতের এই আন্দোলন এখন একটি শিক্ষা-সংক্রান্ত দাবির সীমা অতিক্রম করেছে। এটি ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় সরকারের জবাবদিহি, রাষ্ট্রীয় শক্তির ব্যবহার, তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকারের প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষক আন্দোলনের পর এটি মোদি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় জনমুখী রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী

এই আন্দোলন ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও শিক্ষাবিষয়ক ইস্যু হলেও দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম গণতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা আঞ্চলিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর সরাসরি কোনো নেতিবাচক প্রভাবের তথ্য পাওয়া যায়নি।

🧭 এরপর কী হতে পারে

আন্দোলনকারীরা আপাতত যন্তর মন্তর ছাড়ছেন না। সরকার সংলাপের ইঙ্গিত দিলেও উভয় পক্ষের অবস্থান এখনো দূরত্বপূর্ণ। সংসদের চলমান অধিবেশন, আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচি—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক দিন ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

📌 তথ্যসূত্র

আনন্দবাজার পত্রিকা, পিটিআই (PTI), এএনআই (ANI), আন্দোলনকারী সিজেপির বিবৃতি, রাজনাথ সিংয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments