হেনলি পাসপোর্ট সূচকে তিন ধাপ উন্নতি হলেও কমেছে ভিসা-অন-অ্যারাইভাল সুবিধা; আন্তর্জাতিক ভ্রমণে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | TODAY TV BD
বাংলাদেশে কোনো কিছুতে বিশৃঙ্খলা বা অব্যবস্থার কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই ব্যঙ্গ করে বলা হয়—‘দেশটা উগান্ডা হয়ে গেছে।’ কিন্তু আন্তর্জাতিক ভ্রমণ স্বাধীনতার সূচকে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বিশ্বের অন্যতম গ্রহণযোগ্য হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স অনুযায়ী, পাসপোর্টের শক্তি ও ভ্রমণ সুবিধার দিক থেকে বাংলাদেশ এখনও উগান্ডার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, উগান্ডার নাগরিকরা বিশ্বের ৬৫টি দেশে ভিসামুক্ত বা ভিসা-অন-অ্যারাইভাল সুবিধায় প্রবেশ করতে পারেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সেই সুযোগ রয়েছে মাত্র ৩৫টি দেশে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সুবিধার ক্ষেত্রে উগান্ডার নাগরিকরা বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সুযোগ ভোগ করছেন।
র্যাংকিং বেড়েছে, কিন্তু কমেছে ভ্রমণ সুবিধা
হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান এবার ৯৭তম, যা আগের সংস্করণের তুলনায় তিন ধাপ উন্নতি। তবে এই উন্নতির পেছনে ইতিবাচক কোনো বাস্তব পরিবর্তন নেই। বরং বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের সংখ্যা আরও কমেছে।
২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশি নাগরিকরা ৩৭টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই অথবা অন-অ্যারাইভাল ভিসায় প্রবেশ করতে পারতেন। সর্বশেষ হালনাগাদে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫-এ। অর্থাৎ অল্প কয়েক মাসের ব্যবধানে দুটি দেশ এই সুবিধা প্রত্যাহার করেছে।
ধারাবাহিক অবনমনের ইঙ্গিত
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এটি কোনো সাময়িক পরিবর্তন নয়; বরং গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সুবিধা সংকুচিত হচ্ছে।
২০২৪ সালের শুরুতে বাংলাদেশি পাসপোর্টে ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা ছিল ৪২টি দেশে। ২০২৫ সালের শুরুতে তা কমে হয় ৩৯টি। ২০২৬ সালের শুরুতে নেমে আসে ৩৭-এ এবং সর্বশেষ সূচকে তা আরও কমে ৩৫টি দেশে দাঁড়িয়েছে।
অর্থাৎ মাত্র আড়াই বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ ৭টি ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল গন্তব্য হারিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সক্ষমতার ক্ষেত্রে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শীর্ষে সিঙ্গাপুর, তলানিতে আফগানিস্তান
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের অবস্থান এবারও ধরে রেখেছে সিঙ্গাপুর। দেশটির নাগরিকরা বিশ্বের ১৯২টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের সুযোগ পান।
তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জাপান, আর পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ। বিপরীতে তালিকার একেবারে নিচে রয়েছে আফগানিস্তান, যার নাগরিকরা মাত্র ২২টি দেশে ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা পান।
কীভাবে তৈরি হয় এই সূচক
লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক নাগরিকত্ব ও বিনিয়োগ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান Henley & Partners আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (IATA)-এর ভ্রমণ তথ্যভান্ডারের ওপর ভিত্তি করে এই সূচক তৈরি করে।
বিশ্বের ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট এবং ২২৭টি ভ্রমণ গন্তব্য বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করা হয়, কোনো দেশের নাগরিক কতটি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই অথবা ভিসা-অন-অ্যারাইভাল সুবিধায় প্রবেশ করতে পারেন। সেই সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয় পাসপোর্টের বৈশ্বিক অবস্থান।
কেন কমছে বাংলাদেশের ভ্রমণ স্বাধীনতা?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দেশের পাসপোর্টের শক্তি কেবল ভ্রমণের সুযোগ নয়; এটি সেই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক আস্থা এবং বৈদেশিক নীতির কার্যকারিতারও প্রতিফলন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়মিত অভিবাসন, ভিসার অপব্যবহার, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমঝোতার ঘাটতি এবং নতুন ভিসা অব্যাহতি চুক্তির অভাব—এসব কারণ একটি দেশের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণে নাগরিকদের জন্য সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে যেসব দেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে সক্ষম হয়, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জন করে এবং নতুন ভিসা অব্যাহতি চুক্তি সম্পাদন করে, তাদের নাগরিকদের জন্য বৈশ্বিক ভ্রমণ অনেক বেশি সহজ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে ভিসামুক্ত গন্তব্য কমে যাওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতে কূটনৈতিক উদ্যোগ, বৈদেশিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক আস্থার বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র: Henley Passport Index (Henley & Partners), IATA Travel Information Database, প্রথম আলো




