বিশ্ব ইতিহাসে এমন কিছু নেতা আছেন, যাঁদের নেতৃত্ব শুধু একটি দেশ নয়, পুরো বিশ্বের গতিপথ বদলে দিয়েছে। ফ্রাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট—সংক্ষেপে এফডিআর—তেমনই একজন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যিনি চারবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি এমন সময়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, যখন আমেরিকা ইতিহাসের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে ডুবে ছিল। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও তিনিই ছিলেন পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম প্রধান মুখ।
তবে তাঁর গল্প শুধু ক্ষমতার গল্প নয়; এটি শারীরিক সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সংকটের মধ্যে নেতৃত্বের গল্পও।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি: অভিজাত পরিবারে বেড়ে ওঠা
ফ্রাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্টের জন্ম ১৮৮২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিউইয়র্কের হাইড পার্কে।
তিনি জন্মেছিলেন ধনী ও প্রভাবশালী এক পরিবারে।
তাঁর বাবা জেমস রুজভেল্ট ছিলেন জমিদার ও ব্যবসায়ী। মা সারা ডেলানো রুজভেল্ট ছিলেন সমাজের পরিচিত ব্যক্তিত্ব।
শৈশবে তিনি সাধারণ শিশুদের মতো বড় হননি। বেশির ভাগ শিক্ষা শুরু হয়েছিল ব্যক্তিগত শিক্ষকের মাধ্যমে। পরিবার তাঁকে ইউরোপেও নিয়ে যেত।
এই ভ্রমণ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে আন্তর্জাতিক করে তোলে।
শিক্ষাজীবন: অভিজাত শিক্ষা থেকে রাজনৈতিক দর্শন
রুজভেল্ট পড়াশোনা করেন Harvard University–এ।
সেখানে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আগ্রহ বাড়ে।
হার্ভার্ডে পড়ার সময় ছাত্রপত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
পরে তিনি Columbia Law School–এ আইন পড়তে যান।
যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ডিগ্রি সম্পন্ন করেননি, আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইন পেশায় প্রবেশ করেন।
বিবাহ ও ব্যক্তিগত জীবন
১৯০৫ সালে তিনি বিয়ে করেন Eleanor Roosevelt–কে।
এলেনর শুধু তাঁর স্ত্রী ছিলেন না; তিনি পরে আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী ফার্স্ট লেডিদের একজন হয়ে ওঠেন।
তাঁদের ছয় সন্তান ছিল।
দুজনের সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে গেলেও রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব শেষ পর্যন্ত দৃঢ় ছিল।
এলেনর পরবর্তীকালে মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বড় কণ্ঠে পরিণত হন।
রাজনীতিতে প্রবেশ: দ্রুত উত্থান
১৯১০ সালে তিনি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেটে নির্বাচিত হন।
তাঁর নামের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত ছিল আরেক বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবার—
Theodore Roosevelt
যদিও থিওডোর ছিলেন তাঁর দূর সম্পর্কের আত্মীয়।
রুজভেল্ট দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
পরে তিনি নৌবাহিনীর সহকারী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান।
জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত: পোলিও
১৯২১ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে।
তিনি পোলিওতে আক্রান্ত হন।
ধীরে ধীরে তাঁর শরীরের নিচের অংশ প্রায় অচল হয়ে যায়।
অনেকেই মনে করেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক জীবন শেষ।
কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দ্বিতীয় জীবন।
দীর্ঘ পুনর্বাসন, মানসিক দৃঢ়তা এবং অসাধারণ ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে তিনি নিজেকে আবার জনজীবনে ফিরিয়ে আনেন।
তিনি হুইলচেয়ার ব্যবহার করতেন, যদিও সে সময় জনসমক্ষে তাঁর শারীরিক দুর্বলতা যতটা সম্ভব আড়ালে রাখা হতো।
ক্ষমতায় আরোহন: মহামন্দার সময়ে এক নতুন নেতা
১৯৩২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে ছিল।
Great Depression–এর ফলে—
• ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল
• লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার
• শিল্প উৎপাদন ভেঙে পড়েছিল
• মানুষ ক্ষুধা ও হতাশায় ডুবে ছিল
এই পরিস্থিতিতে রুজভেল্ট প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন।
তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতিশ্রুতি ছিল—
“The only thing we have to fear is fear itself.”
এই একটি বাক্য পুরো আমেরিকার মানসিক অবস্থাকে বদলে দিয়েছিল।
নিউ ডিল: অর্থনীতি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা
ক্ষমতায় এসেই তিনি চালু করেন—
New Deal
এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল—
- কর্মসংস্থান সৃষ্টি
- ব্যাংক সংস্কার
- কৃষি পুনর্গঠন
- সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা
- অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
হাজার হাজার রাস্তা, সেতু, বাঁধ ও সরকারি প্রকল্প শুরু হয়।
নিউ ডিল আমেরিকার অর্থনৈতিক কাঠামো স্থায়ীভাবে বদলে দেয়।
সমর্থকদের কাছে তিনি অর্থনীতির উদ্ধারকর্তা।
সমালোচকদের কাছে তিনি রাষ্ট্রের ক্ষমতা অতিরিক্ত বাড়িয়েছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: যুদ্ধকালীন নেতা
১৯৩৯ সালে শুরু হয়—
World War II
শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি।
কিন্তু ১৯৪১ সালে Attack on Pearl Harbor–এর পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
রুজভেল্ট জার্মানি, ইতালি ও জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
তিনি পশ্চিমা মিত্রজোটের প্রধান স্থপতিদের একজন হয়ে ওঠেন।
চার্চিল ও স্টালিনের সঙ্গে সম্পর্ক
যুদ্ধের সময় তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোর একটি ছিল—
Winston Churchill
এবং
Joseph Stalin–এর সঙ্গে।
এই তিন নেতা মিলে যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণ করেন।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ধারণাও তাঁর নেতৃত্বে শক্ত ভিত্তি পায়।
চারবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার ইতিহাস
রুজভেল্টই একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি—
১৯৩২
১৯৩৬
১৯৪০
১৯৪৪
—মোট চারবার নির্বাচিত হন।
তাঁর পর যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধান পরিবর্তন করে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ দুইবারে সীমাবদ্ধ করা হয়।
মৃত্যু
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছু আগে, ১৯৪৫ সালের ১২ এপ্রিল তিনি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা যান।
তাঁর মৃত্যুর সময় বিশ্বযুদ্ধের শেষ অধ্যায় চলছিল।
তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন Harry S. Truman।
উত্তরাধিকার: এক মানুষ, দুই যুদ্ধ
ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট দুটি যুদ্ধ লড়েছিলেন—
একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধ,
আরেকটি ছিল বিশ্বযুদ্ধ।
প্রথমটিতে তিনি বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়েছেন।
দ্বিতীয়টিতে ফ্যাসিবাদ ও সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।
তাঁর সমর্থকরা বলেন—
তিনি আধুনিক আমেরিকার স্থপতি।
সমালোচকেরা বলেন—
তিনি ফেডারেল সরকারের ক্ষমতা অতিরিক্ত বিস্তৃত করেছিলেন।
কিন্তু ইতিহাসের আদালতে একটি বিষয় নিয়ে তেমন বিতর্ক নেই—
বিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজন ছিলেন ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট।
তিনি শুধু সংকট সামলাননি।
তিনি সংকটের মধ্যেই নেতৃত্বের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছিলেন।




