বিশ্ব ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই সভ্যতার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলো সামনে চলে আসে। অ্যাডলফ হিটলার সেই তালিকার শীর্ষে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিনি শুধু একটি রাষ্ট্রের নেতা ছিলেন না; তিনি এমন এক রাজনৈতিক মতাদর্শের মুখ হয়ে উঠেছিলেন, যার ফলাফল ছিল কোটি মানুষের মৃত্যু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে ইতিহাসের ভয়াবহতম অপরাধগুলোর একটি।
হিটলারের গল্প কোনো সাফল্যের গল্প নয়; এটি দেখায় কীভাবে রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক হতাশা, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং ব্যক্তিপূজার সমন্বয়ে একটি সমাজ ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যেতে পারে।
জন্ম ও পরিবার: সীমান্ত শহরের এক শিশু
অ্যাডলফ হিটলারের জন্ম ১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের ব্রাউনাউ অ্যাম ইন শহরে।
তাঁর বাবা অ্যালয়স হিটলার ছিলেন কাস্টমস কর্মকর্তা। কঠোর ও কর্তৃত্বপরায়ণ মানুষ হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। মা ক্লারা হিটলার ছিলেন শান্ত ও স্নেহশীল।
শৈশবে হিটলারের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক খুব একটা ভালো ছিল না। বাবা চাইতেন ছেলে সরকারি চাকরিজীবী হোক; কিন্তু হিটলারের আগ্রহ ছিল চিত্রকলা ও শিল্পকলায়।
এই দ্বন্দ্ব তাঁর মানসিক গঠনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল বলে অনেক গবেষক মনে করেন।
কৈশোর ও ব্যর্থ শিল্পী হওয়ার অধ্যায়
কৈশোরে তিনি পরিবারসহ লিঞ্জ শহরে চলে যান।
স্কুলজীবনে তাঁর ফলাফল খুব ভালো ছিল না। বিশেষ করে গণিত ও আনুষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ ছিল।
তাঁর স্বপ্ন ছিল শিল্পী হওয়া।
১৯০৭ সালে তিনি Academy of Fine Arts Vienna–এ ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেন।
তিনি ব্যর্থ হন।
পরের বছর আবার আবেদন করেও প্রত্যাখ্যাত হন।
ভিয়েনায় পরবর্তী কয়েক বছর তাঁর জীবন দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও হতাশায় কাটে। তিনি পোস্টকার্ড ও ছোট ছবি এঁকে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই সময় ভিয়েনার রাজনৈতিক পরিবেশে থাকা উগ্র জাতীয়তাবাদ, ইহুদিবিদ্বেষ এবং বর্ণবাদী ধারণাগুলো তাঁর চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: সৈনিক হিটলার
১৯১৪ সালে World War I শুরু হলে তিনি জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
যুদ্ধের সময় তিনি বার্তাবাহক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সাহসিকতার জন্য পদকও পান।
কিন্তু জার্মানির পরাজয় তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে।
যুদ্ধ শেষে জার্মান সমাজে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং জাতীয় অপমানের যে পরিবেশ তৈরি হয়, হিটলার সেটিকে নিজের রাজনৈতিক উত্থানের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন।
রাজনীতিতে প্রবেশ ও নাৎসি দলের জন্ম
১৯১৯ সালে তিনি একটি ছোট রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।
পরে সেটি হয়ে ওঠে National Socialist German Workers’ Party।
হিটলারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর বক্তৃতা।
তিনি জনতার হতাশা, ক্ষোভ ও ক্ষতবিক্ষত জাতীয়তাবোধকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে সক্ষম হন।
তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসত—
জার্মানির পরাজয়ের জন্য ইহুদি, কমিউনিস্ট এবং বিদেশি শক্তিকে দায়ী করার ধারণা।
কারাগার ও “মাইন কাম্পফ”
১৯২৩ সালে ক্ষমতা দখলের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
সেখানে তিনি লেখেন তাঁর রাজনৈতিক বই—
Mein Kampf
এই বইয়ে তিনি তাঁর বর্ণবাদী, জাতীয়তাবাদী ও সম্প্রসারণবাদী ধারণা তুলে ধরেন।
পরবর্তীতে এগুলোই নাৎসি রাষ্ট্রের নীতিতে পরিণত হয়।
ক্ষমতার শীর্ষে আরোহন
১৯৩৩ সালে হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হন।
এরপর খুব দ্রুত তিনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দিতে শুরু করেন।
বিরোধী দল নিষিদ্ধ হয়।
সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের গ্রেপ্তার করা হয়।
জার্মানি ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
যুদ্ধ ও সম্প্রসারণবাদ
হিটলার বিশ্বাস করতেন জার্মান জাতির জন্য আরও ভূখণ্ড প্রয়োজন।
এই নীতি অনুসরণ করে তিনি ইউরোপে আগ্রাসন শুরু করেন।
১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়—
World War II
প্রথম দিকে জার্মানির দ্রুত সামরিক সাফল্য তাঁকে অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হয়েছিল।
কিন্তু সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
হলোকাস্ট: মানব ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়
হিটলারের শাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ অংশ ছিল—
Holocaust
ইহুদি জনগোষ্ঠী ছাড়াও রোমা জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, রাজনৈতিক বিরোধী, সমকামী ব্যক্তি এবং অন্যান্য অনেক মানুষকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।
প্রায় ছয় মিলিয়ন ইহুদি নিহত হন।
মানব ইতিহাসে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যাগুলোর একটি এটি।
ব্যক্তিগত জীবন
হিটলার ব্যক্তিগত জীবনকে অনেকটাই গোপন রাখতেন।
দীর্ঘদিন তাঁর সম্পর্ক ছিল Eva Braun–এর সঙ্গে।
১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসে মৃত্যুর মাত্র এক দিন আগে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
পতন ও মৃত্যু
১৯৪৫ সালের শুরুতে জার্মানি প্রায় পরাজিত।
সোভিয়েত বাহিনী বার্লিনে প্রবেশ করে।
৩০ এপ্রিল ১৯৪৫ সালে বার্লিনের বাঙ্কারে হিটলার আত্মহত্যা করেন।
তাঁর মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই নাৎসি জার্মানির পতন ঘটে।
ইতিহাসের শিক্ষা
অ্যাডলফ হিটলারের জীবন শুধু একজন স্বৈরশাসকের জীবনী নয়; এটি গণতন্ত্রের দুর্বলতা, রাজনৈতিক চরমপন্থা এবং ঘৃণার রাজনীতির ভয়াবহ পরিণতির উদাহরণ।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—
একজন মানুষ একা ইতিহাস বদলান না; সমাজ, সংকট, ভয় এবং অন্ধ অনুসরণও ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে।
হিটলারের উত্থান দেখিয়েছে কীভাবে একটি জাতির ক্ষোভকে ব্যবহার করে ক্ষমতা অর্জন করা যায়।
আর তাঁর পতন দেখিয়েছে—ঘৃণার ওপর দাঁড়ানো ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত নিজেকেই ধ্বংস করে।




