তেহরান-ওয়াশিংটন সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি; পর্দার আড়ালে নেতানিয়াহুর ওপর চটেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিবিসি অবলম্বনে: ৯ জুন ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার স্পষ্ট আহ্বান উপেক্ষা করেই গত সপ্তাহান্তে ইরানের ভূখণ্ডে পালটা বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এই আকস্মিক পদক্ষেপ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তীব্র উত্তেজনার পরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে চলে এসেছে।
গত রোববার (৭ জুন) লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরাইলি আগ্রাসনের জবাবে ইসরাইলের মূল ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল তেহরান। এর জবাবে গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর এই প্রথম ইরানের মাটিতে সরাসরি বোমাবর্ষণ করল তেল আবিব। মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ বাহিনীর সাথে ইরানের যুদ্ধ শুরুর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এই অঞ্চলের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যকে কতটা বিপজ্জনক খাদের কিনারে দাঁড় করিয়ে রেখেছে, এই সংঘাত তারই প্রমাণ।
📌 বর্তমান পরিস্থিতির ৩টি মূল চালিকাশক্তি [বিশ্লেষণ]
সাম্প্রতিক এই হামলা-পালটা হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে প্রধানত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে:
- ১. ট্রাম্পের সীমাবদ্ধতা ও নিয়ন্ত্রণহীনতা: ট্রাম্প জনসমক্ষে তাঁর ইসরাইলি মিত্রকে যতটা নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি করেন, বাস্তবে তিনি তা পারছেন না। তেহরান প্রশাসন ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যকার এই স্পষ্ট দূরত্ব ও সমন্বয়হীনতাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে চাইছে।
- ২. ইরানের নতুন সামরিক কৌশল: লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলি হামলার জবাব দিতে ইরান এখন নিজের ভূখণ্ডে পালটা হামলার ঝুঁকি নিতেও দ্বিধাবোধ করছে না। এর মাধ্যমে তারা চলমান মার্কিন-ইরান যুদ্ধের ভাগ্যকে সরাসরি ইসরাইল-হিজবুল্লাহ সংকটের সঙ্গে জুড়ে দিতে চায়।
- ৩. পরমাণু চুক্তিতে দীর্ঘসূত্রতা: ট্রাম্পের বহুকাঙ্ক্ষিত ‘গ্র্যান্ড নিউক্লিয়ার ডিল’ এখনই আলোর মুখ দেখছে না। ইরান বুঝতে পেরেছে যে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের (Mid-term Elections) বছরে ট্রাম্প নতুন কোনো বড় যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে নিজেদের সর্বোচ্চ দাবি আদায়ের চাপ বাড়িয়েছে তেহরান।
🤫 নেপথ্যের নাটক: মুখে সমঝোতা, আড়ালে ক্ষোভ
রোববার ইসরাইলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরপরই ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তিনি নেতানিয়াহুকে ফোন করে পালটা হামলা না চালানোর কঠোর নির্দেশ দেবেন। ট্রাম্পের ভয় ছিল, ইসরাইলের পালটা জবাব তেহরানের সঙ্গে তাঁর ভঙ্গুর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে পুরোপুরি ভেস্তে দিতে পারে। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানে হামলা চালায় ইসরাইল।
নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ আখ্যা ট্রাম্পের! > নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে বৈরুতে বিমান হামলা চালানোর একগুঁয়ে জেদ করায় নেতানিয়াহুর ওপর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। পর্দার আড়ালে নেতানিয়াহুকে তিনি ‘পাগল’ (Crazy) বলেও আখ্যা দেন। ট্রাম্পের আশঙ্কা, নেতানিয়াহুর এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে তাঁর চুক্তি করার প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
সোমবার বিকেলে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে যখন তাঁর কথা হচ্ছিল, ততক্ষণে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো আকাশে উড়াল দিয়ে দিয়েছিল। তবে নেতানিয়াহু তাঁর নির্দেশ অমান্য করেছেন—এমন দাবি অস্বীকার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মঙ্গলবার (৯ জুন) কিছুটা সুর নরম করে বলেন, “আমরা একটি খুব ভালো চুক্তির একেবারে শেষ পর্যায়ে আছি। দুই-তিন দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হতে পারে।”
📊 নেতানিয়াহু কি আসলেই ট্রাম্পকে অমান্য করেছেন?
আপাতদৃষ্টিতে একে অবাধ্যতা মনে হলেও প্রবীণ মার্কিন কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন ভিন্ন।
| কৌশলগত সূচক | পর্দার অন্তরালের বাস্তব পরিস্থিতি |
| সবুজ সংকেত বনাম হলুদ সংকেত | প্রবীণ মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ট্রাম্প মূলত নেতানিয়াহুকে একটি ‘হলুদ বাতি’ (সীমিত সম্মতি) দেখিয়েছিলেন, লাল বাতি নয়। |
| পেন্টাগনের পরোক্ষ সম্পৃক্ততা | মার্কিন পেন্টাগনের সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) রাডার সুবিধা, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথের সমন্বয় ছাড়া ইসরাইলের পক্ষে ইরানের এত গভীরে হামলা চালানো কার্যত অসম্ভব। |
| ডিপ্লোম্যাটিক ট্যাকটিক্স | রোববার রাতে ট্রাম্পের ‘নেতানিয়াহুকে থামানোর’ প্রকাশ্য বার্তাটি ছিল মূলত তেহরানকে শান্ত রাখার একটি কৌশল, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই হামলার দায় থেকে দূরে রাখা যায়। |
📈 আলোচনার টেবিলে কেন সুবিধাজনক অবস্থানে ইরান?
ইরানের জন্য এই হামলা ছিল একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। এই প্রথম ইরান সরাসরি নিজের ওপর হামলার কারণে নয়, বরং মিত্র লেবাননের সুরক্ষায় ইসরাইলের মূল ভূখণ্ডে আঘাত করল। এর মাধ্যমে ইরান দেখে নিল যে, ইসরাইলের পালটা হামলায় মার্কিনিরা সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় কি না। ফলাফল বলছে, সংঘাত শেষে ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত আলোচনার ওপরই জোর দিচ্ছে। ট্রাম্প স্বয়ং বিষয়টিকে হালকা করে বলেছেন—‘দুScenario-ই নিজেদের শখ মিটিয়ে নিয়েছে, এবার আলোচনার সময়।’
এই পরিস্থিতির পর ইরানি নেতৃত্ব আরও আত্মবিশ্বাসী। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মন্তব্য করেছেন:
“এই সামরিক প্রতিরোধ আমেরিকার সাথে আলোচনার টেবিলে আমাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। আমরা যুদ্ধক্ষেত্রও ছাড়িনি, আলোচনার টেবিলও ত্যাগ করিনি।”
💰 দর-কষাকষিতে ইরানের প্রধান ২ দাবি:
১. মার্কিন নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তাদের আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের তেলের রাজস্ব ফেরত দেওয়া।
২. লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলি আগ্রাসনের মাত্রা সুনির্দিষ্টভাবে সীমিত করা।
TODAY TV BD অবলিখন: সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চরম চাপে রয়েছে। তেহরান স্পষ্ট বুঝতে পারছে, ট্রাম্প এখন যুদ্ধের চেয়ে চুক্তি করতেই বেশি আগ্রহী। তবে ট্রাম্প এখনই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বা অর্থ ছাড়ের দাবি নাকচ করে দেওয়ায় চুক্তিটি এখনো ঝুলে রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যকে যেকোনো মুহূর্তে আবারও সরাসরি যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে পারে।




