বিধানসভা ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর রণক্ষেত্র উত্তর ২৪ পরগণা ও বীরভূম; ওসিসহ গুলিবিদ্ধ ৩ পুলিশ সদস্য, প্রাণহানি অন্তত ৪ জনের।
কলকাতা | বুধবার, ৬ মে ২০২৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয়ের পর রাজ্যজুড়ে ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। ফলাফল ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও গোলাগুলিতে অন্তত চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে উত্তর ২৪ পরগণার সন্দেশখালিতে এক ওসিসহ তিন পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
নিরাপত্তার চাদরেও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নজরদারির মধ্যেই বীরভূমের নানুর থানার সন্তোষপুর গ্রামে তৃণমূল কংগ্রেসের বুথ সভাপতি আবির শেখকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে, হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর এবং নিউ টাউনে পৃথক ঘটনায় দুইজন বিজেপি কর্মী নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দলটি। কলকাতার বেলেঘাটায় এক তৃণমূল এজেন্টের রহস্যজনক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
নিউ মার্কেটে ‘বুলডোজার’ বিতর্ক ও ডেরেকের তোপ
কলকাতার কেন্দ্রস্থল নিউ মার্কেট (হগ মার্কেট) এলাকায় বিজেপির বিজয় মিছিল থেকে বুলডোজার দিয়ে একটি মাংসের দোকান ও একটি কাপড়ের দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার ভিডিও পোস্ট করে একে ‘বিজেপির জয়ের উদ্যাপন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সন্ধ্যায় ডিজে বাজিয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে মিছিলটি যাওয়ার সময় অতর্কিতে বুলডোজার চালিয়ে দোকান ভাঙা হয়। ঘটনার সময় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ ও প্রশাসনের কড়া অবস্থান
কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বিজয় মিছিলের অনুমতি থাকলেও তাতে বুলডোজার ব্যবহারের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন,
“আইন হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যারা বুলডোজার ভাড়া দিয়েছেন এবং যারা এই ভাঙচুরের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
সন্দেশখালির ন্যাজাটে সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ ন্যাজাট থানার ওসি ভরত প্রসূন কর বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পুরো এলাকায় বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী টহল দিচ্ছে।
🔎 বিশ্লেষণ: উত্তর ভারতীয় রাজনীতির ছায়া কি বাংলায়?
পশ্চিমবঙ্গে এতদিন রাজনৈতিক সংঘর্ষ মূলত বোমাবাজি ও মারধরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এবার ‘বুলডোজার’ সংস্কৃতির প্রবেশ গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের ধাঁচে অপরাধ দমনের নামে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় জনাকীর্ণ বাজারে বুলডোজার চালানোকে বিশ্লেষকরা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত নিউ মার্কেট এলাকায় এই ঘটনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে বিরোধী দলগুলো।
📊 তথ্যচিত্র: সহিংসতার খতিয়ান (৬ মে পর্যন্ত)
- মোট প্রাণহানি: ৪ জন (নিশ্চিতকৃত)।
- আহত পুলিশ সদস্য: ৩ জন (ওসিসহ)।
- ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা: সন্দেশখালি, বীরভূম, বেলেঘাটা, উদয়নারায়ণপুর এবং কলকাতা নিউ মার্কেট।
- নিরাপত্তা বাহিনী: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় বাহিনীর মেয়াদ আরও ২ মাস বাড়ানো হয়েছে।
💬 রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেন,
“বিজেপির কোনো কর্মী যদি সহিংসতায় জড়িত থাকে, তবে তাকে সরাসরি দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। তবে আমাদের আশঙ্কা, তৃণমূলের কর্মীরা বিজেপির পতাকা হাতে নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে দলের বদনাম করার চেষ্টা করছে।”
উপসংহার
নির্বাচন পরবর্তী এই সহিংসতা পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত সরকারের জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ইতিমধ্যেই অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতেও এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং কলকাতার বুকে বুলডোজার চালানোর ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, দৈনিক ইত্তেফাক, ও প্রথম আলো (৬ মে ২০২৬) এবং কলকাতা পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তি।
বিশেষ নোট: প্রতিবেদনটি চলমান ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। পরিস্থিতির পরিবর্তনে তথ্যের পরিমার্জন প্রয়োজন হতে পারে।



