Homeটুডে টেকবিআরটিসির বহরে ১০০ ইলেকট্রিক বাস: পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন নাকি নতুন আর্থিক পরীক্ষা?

বিআরটিসির বহরে ১০০ ইলেকট্রিক বাস: পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন নাকি নতুন আর্থিক পরীক্ষা?

৪০০ কোটি টাকার স্বল্পসুদী ঋণে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ই-বাস যুগ; পাশে আছে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বহরে প্রথমবারের মতো ১০০টি ইলেকট্রিক বাস যুক্ত হতে যাচ্ছে। বাস কেনা, চার্জিং স্টেশন স্থাপন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ৪০০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। ঋণটি ১ শতাংশ সুদে, দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছরে পরিশোধ করতে হবে বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে। এই উদ্যোগকে সরকার পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক গণপরিবহন করিডোর তৈরির অংশ হিসেবে দেখছে।

বিআরটিসির জন্য ইলেকট্রিক বাস আনার আলোচনা নতুন নয়, তবে এবারই প্রথম সেটি অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে এগোচ্ছে। একই সময়ে ঢাকায় আরেকটি পৃথক পরিকল্পনায় ৪০০ ইলেকট্রিক বাস চালুর প্রস্তুতিও চলছে, যা দেখায় যে দেশের নগর পরিবহন নীতিতে বিদ্যুৎচালিত বাস এখন কাগজের পরিকল্পনা থেকে বাস্তব রূপে ঢুকছে। (The Financial Express)

কেন এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশে শহুরে বাসব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো যান, জ্বালানি নির্ভরতা, ধোঁয়া, শব্দদূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত রুট ব্যবস্থার চাপ বহন করছে। বিআরটিসির বহরে ১০০ ইলেকট্রিক বাস যোগ হলে সেটি শুধু একটি নতুন যানবাহন কেনা হবে না; বরং বাস অপারেশন, চার্জিং অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ মডেল এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার নতুন পরীক্ষা হয়ে উঠবে।

এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রায়ত্ত এই অপারেটর আদৌ কি নতুন বহরের আর্থিক বোঝা সামলে নিজস্ব আয় দিয়ে ঋণ শোধ করতে পারবে?

আশপাশের দেশগুলো কী করছে

ভারতে ইলেকট্রিক বাস এখন নীতিগত অগ্রাধিকারের বড় অংশ। দেশটির PM-eBus Sewa স্কিমের লক্ষ্য ১০,০০০ ইলেকট্রিক বাস স্থাপন, আর WRI-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ভারতে সড়কে ১০,০০০-এর বেশি ইলেকট্রিক বাস চলছে; ২০২৪ সালের শেষ দিকে আরও ১৪,০০০ বাস কেনার একটি বড় উদ্যোগ অনুমোদিত হয়।

নেপালও দ্রুত ই-মোবিলিটির দিকে যাচ্ছে। GGGI-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটি ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি পরিবহন বহরের ২০ শতাংশ বৈদ্যুতিক করার লক্ষ্য নিয়েছিল। একই সঙ্গে রেডিও নেপালের খবরে বলা হয়, সরকারি বাজেটে সজহা যাত্রা লিমিটেডের জন্য আরও ১০০ ইলেকট্রিক বাস বরাদ্দের ঘোষণা আসে।

ভুটান ছোট বাজার হলেও নীতিগতভাবে ইলেকট্রিক যানবাহনে এগিয়ে আছে। দেশটির সড়ক পরিবহন দপ্তর ৪৫টি ইলেকট্রিক বাস কেনার চুক্তি করেছে, যেগুলো ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চলাচলে আসার কথা। ভুটানের সরকার পরিবহন খাতে ডিজেল নির্ভরতা কমিয়ে নির্গমন হ্রাসের কৌশল নিচ্ছে।

চীন এখনো বিশ্বব্যাপী ইলেকট্রিক বাসের সবচেয়ে বড় বাজার ও মানদণ্ড। ITDP-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশটির মোট বাসের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৬ লাখ ৮২ হাজার ৫০০, যার ৬৯ শতাংশ পুরোপুরি ইলেকট্রিক এবং আরও ১১ শতাংশ হাইব্রিড। WRI আরও জানিয়েছে, বিশ্বে চলমান ইলেকট্রিক বাসের প্রায় ৯০ শতাংশই চীনে।

ইলেকট্রিক বাস কি সত্যিই সাশ্রয়ী?

অপারেশনাল দিক থেকে ইলেকট্রিক বাসের বড় সুবিধা হলো জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক benchmarking গবেষণা বলছে, ১২ মিটার একটি ডিজেল বাসের তুলনায় ইলেকট্রিক বাসের শক্তি ব্যয় গড়ে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ০.১২ ডলার, যেখানে ডিজেল বাসে তা প্রায় ০.৫০ ডলার। একই গবেষণায় বলা হয়েছে, ই-বাসের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সাধারণত ক্রয়মূল্যের প্রায় ৫ শতাংশের মতো হয়ে থাকে।

তবে সব জায়গায় ই-বাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে সস্তা হয়ে যায় না। কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক কেনা-খরচ ডিজেল বাসের তুলনায় ১.২ থেকে ১.৫ গুণ বা তারও বেশি হতে পারে, আর পুরো লাইফসাইকেল খরচ নির্ভর করে ব্যাটারি, চার্জিং, রুটের দৈর্ঘ্য, বিদ্যুৎদর ও ব্যবহারমাত্রার ওপর। অর্থাৎ ই-বাসে সাশ্রয় আসে মূলত “সঠিক ব্যবহার” হলে, শুধু “কেনা” হলেই নয়।

বিআরটিসি কি ঋণ শোধ করতে পারবে?

হিসাবটা সহজ করে ধরলে, ৪০০ কোটি টাকা ১ শতাংশ সুদে ২০ বছরে, এবং দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষে বাকি ১৮ বছরে সমান কিস্তিতে শোধ করলে বছরে আনুমানিক ২৪.৪ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ ১০০ বাসের ওপর ভাগ করলে প্রতিটি বাসকে গড়ে বছরে প্রায় ২৪.৪ লাখ টাকা ঋণপরিশোধের সমান আয় তৈরি করতে হবে। এটি কেবল ঋণ কিস্তির হিসাব; এর সঙ্গে ড্রাইভার, কন্ডাক্টর, চার্জিং, ডিপো, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় আলাদা।

এই অবস্থায় বিআরটিসির সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—বাসগুলো কতটা ব্যস্ত রুটে চলবে, টিকিট আয়ের আদায় কতটা দক্ষ হবে, এবং চার্জিং ও রক্ষণাবেক্ষণে কতটা অচল সময় কমানো যাবে। যদি উচ্চ যাত্রীসংখ্যার রুটে নিয়মিত চলাচল নিশ্চিত করা যায়, তাহলে কম জ্বালানি ব্যয় ও কম রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ঋণ শোধে সহায়ক হবে। কিন্তু খালি চলাচল, রুট-শৃঙ্খলার অভাব বা চার্জিং ডিপোর জটিলতা থাকলে এই মডেল চাপের মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের জন্য বার্তাটা কী

বাংলাদেশে ইলেকট্রিক বাস চালু হওয়া নিঃসন্দেহে পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনার জন্য ইতিবাচক। কিন্তু এটিকে সফল করতে হলে শুধু বাস কেনা যথেষ্ট নয়; দরকার রুটভিত্তিক পরিকল্পনা, চার্জিং অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ শৃঙ্খলা, রাজস্ব আদায়ের স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল পরিবহন নীতি। ভারত, নেপাল, ভুটান বা চীনের অভিজ্ঞতা বলে—ই-বাস কেবল গাড়ি নয়, এটি একটি পুরো ইকোসিস্টেম।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই মূল প্রশ্ন এখন আর “ইলেকট্রিক বাস আসবে কি না” নয়; প্রশ্ন হলো, “এসে গেলে সেটি টিকবে কি না এবং নিজস্ব আয় দিয়ে দাঁড়াতে পারবে কি না।” সেটাই হবে বিআরটিসি ও সরকারের এই নতুন উদ্যোগের প্রকৃত পরীক্ষা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments